গোলজার আহমদ হেলাল: নেতৃত্বকে চ্যালেন্জ গ্রহণ করতে হয়। চ্যালেন্জ নিতে হয়।এটা আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত।খেলাফতে রাশেদার যুগে আমিরুল মোমিনীন,খলিফাতুল মুসলিমীনগণ এরই আলোকে কাজ করেছেন।চ্যালেন্জের মধ্যেই প্রকৃতপক্ষে কাজের হক আদায় হয়।দাবী অনুসারে কাজ করা সম্ভবপর হয়ে উঠে।রাসুলে করীম (সা:) মক্কার ঘরে ঘরে গিয়েছেন,জনে জনে মদীনাবাসীর কাছে মেসেজ দিয়েছেন।মিশন হিসেবেই কাজ করেছেন।পরক্ষণেই মক্কা বিজয় হয়েছে। দুনিয়ার চারিদিকে দ্বীনের পয়গাম পৌঁছেছে।তাঁরই ধারাবাহিকতায় রাসুলের খলিফাগণ বিশ্বব্যাপী মুসলিম সালতানাত কে বিস্তৃত করেছিলেন।আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা:) আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছেন।তিনি তাঁর এই কাজে কোন রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদান কিংবা কোন রাষ্ট্রশক্তিকে সাহায্যকারী বানিয়ে দেবার প্রার্থনাও করেছেন মহান মাবুদের কাছে।সমাজপতি,গোত্রপতি,প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গকেও চেয়েছেন।পাশাপাশি সমাজের সর্বশ্রেণী ও পেশার মানুষকে একত্রিত করেছেন।সাধারণ জনমানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে মহান মিশনের যাত্রায় সকল ধরনের মানুষের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন।আরবের সর্বাপেক্ষা উত্তম ও প্রতিভা সম্পন্ন মানুষগুলো তাঁর আদর্শানুগামী হয়েছিল।ফলে আরবদেশে নবী মুহাম্মদের (সাঃ) অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ হয়েছিল এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর সর্বগ্রাসী প্রভাব সিন্ধু নদ থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের বেলাভূমি পর্যন্ত -দুনিয়ার একটি বিরাট অংশের উপর বিস্তার লাভ করেছিল।তারঁই সার্থক উত্তরসুরী অর্ধপৃথিবীর শাসক উমরের মতো ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে দরিদ্র জনসাধারনের খাবার নিজেই পৌঁছিয়ে দিতেন।তিনি বলতেন ফোরাত নদীর তীরে যদি কোনও কুকুরও না খেয়ে মারা যায় ,তা আমাকে জবাবদিহী করতে হবে।শাসিতের প্রতি একজন শাসকের এই ছিল দায়িত্ব।যুগ যুগ থেকে মুসলমানরা পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদ শাসন করেছে দোর্দন্ড প্রতাপে।স্পেনের মুসলিম সভ্যতা,তুরস্কের খেলাফত,ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন ,দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মুসলিম সাম্রাজ্য।
আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই চলছে।এ লড়াইয়ে তারাই জিতবে যারা চ্যালেন্জ নিতে পারবে।জায়নবাদীগোষ্ঠীর যড়যন্ত্র ও চক্রান্তে তুরস্কের নেতৃত্বাধীন উসমানীয়া খেলাফত ধ্বংস হয়েছিল ১৯২৪ সালে।য়াহুদীরা তাদের প্রটোকল অনুসারে মুসলিম ও আরব জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে মুসলিম সালতানাতকে ছিন্নভিন্ন করে খেলাফতের নিবু নিবু শেষ প্রদীপকে নিশ্চিহ্ন করে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।তুরস্ক পরিণত হয় ইউরোপের রুগ্ন দেশে।কিন্তু সেই তুরস্ক এখন মুসলিম বিশ্বে মুসলমানদের আশার আলো।বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা ও তৃণমুল থেকে বেড়ে উঠা রাজনীতিবিদ এরদোয়ানের দু:সাহসী চ্যালেন্জের দ্বারা তা সম্ভব হয়ে উঠে।এরদোয়ানরা সিদ্ধান্ত নিলেন ২০০১ সালে।তাদের চ্যালেন্জ ছিল ১.তুরস্কের প্রতিটি বাড়ীর দরজায় আমরা পৌঁছব।২.তুরস্কের এমন কোন মানুষ থাকবে না যার সাথে আমরা হ্যান্ডশেক করব না।তারা কর্মসুচী নিলেন:ক.কারো জন্ম হলেই সেখানে গিয়ে অভিনন্দন জানাতে হবে।খ.কারো মৃত্যু হলে জানাজায় যেতে হবে।গ.মানুষের বিয়ে-সাদী,খাতনা অনুষ্ঠানে যেতে হবে।ঘ.অসুস্থ হলে খোঁজ নিতে হবে,সেবা করতে হবে।ঙ.অভাবী ও দরিদ্রদের খুঁজে খুঁজে বের করে সাহায্য করতে হবে।কঠিন চ্যালেন্জ ।সফল হয়েছেন।ফলে এরদোয়ান হলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠায় এরদোয়ান ও তাঁর দল এ কে পার্টি (Justice & Development Party) বিশ্ববাসীর জন্য এক অনবদ্য ইতিহাস।মুসলমান ও দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ও নেতৃত্বের জন্য এক অনুকরণীয় অনুপ্রেরণার অনুপম মাইলস্টোন।
নেতৃত্বের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা হলো-যিনি সাধারণ জনমানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। আমাদের প্রিয় নবী ও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসুরী খলিফাগণ জনসাধারণের মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেলিলেন।মুসা (আ:) ফেরাউনের কাছে গিয়েছেন।আহবান করেছেন দ্বীনের প্রতি।সে গ্রহণ করেনি।কিন্তু ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছে।ফলে বনী ইসরাঈল জাতিকে উদ্ধার করেছেন।আল্লাহ যখন নবী মুসা কে পাঠালেন ফেরাউনের কাছে,তখন তিনি বলেছিলেন হয় সে তোমার কথা শুনবে অথবা ভীত হবে।মুসা(আ:) যাওয়ার সময় তিনি তাঁর ভাই হারুনকে চেয়েছিলেন।আল্লাহর নবী ইউসুফ (আ:) মিশরের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দুর্ভিক্ষ ও দুর্যোগপুর্ণ সমাজকে বদলিয়েছিলেন।সুতরাং এটাই অনুসরণীয় হওয়া উচিত।
পৃথিবীতে এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ চলছে।অবাধ তথ্য প্রবাহ ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে মানুষ আর মেশিনের মধ্যে এখন যুদ্ধ চলছে।এ যুদ্ধে অবশ্যই মানুষকে জয়ী হতে হবে।নতুবা মানবসভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য।একদিকে ধুমকেতুর মতো প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির দরুন মানুষ বিশ্ব জয় করছে।অপরদিকে উল্কাপিন্ডের মতো পতন ঘটছে ভালবাসার,মনুষত্ববোধ ও মানবতার।কারো ঘরে শান্তি নেই।চলছে হাহাকার।ডিজিটালাইজেশনের এ যুগে মেশিনের সহায়তায় মানুষ অনেক কাজ করছে।।প্রযুক্তির উন্নয়ন অভিশাপ নয়,আশীর্বাদ।কিন্তু এর ফলে যদি মানুষে মানুষে সম্পর্কের ছেদ ঘটে কিংবা আমাদের নির্লিপ্ততায় যদি ভালবাসা ও মমত্ববোধের উপর যন্ত্রই আঘাত হানে বা দানবীয় যন্ত্রের কাছে স্নেহ,ভালবাসা,মমত্ববোধের পরাজর ঘটে।তাহলে সভ্যতার বিনাশ অনিবার্য।প্রতিটি শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার সময় সভ্যতারও রুপান্তর ঘটে।সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ,সমাজ ও রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়।এ বিষয় অনুধাবন করে সঠিক সিদ্ধান্ত ও কর্মসুচী প্রণয়ন নেতৃত্বের মৌলিক দায়িত্ব।আমাদের মনে রাখতে হবে,সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এক জাতি। তার নাম মানবজাতি।মানবজাতিই সর্বোত্তম জাতি।এখানে কোন ভেদাভেদ নাই।দলীয় পরিচয় নেই।দল -মতের উর্ধ্বে উঠে মানবজাতির কল্যাণসাধনই হয়ে উঠুক প্রতিটি জাতি-গোষ্ঠীর গৃহীত কর্মকান্ড।ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠুক এ ধরা।
লেখক , গোলজার আহমদ হেলাল ।
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
