The Challenge of Leadership(নেতৃত্বের চ্যালেন্জ) Episode 2-পর্ব ২

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : হযরত উমর (রাঃ) এর রাজ্যশাসন ও জনহিতকর উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড ।

ইসলামের ইতিহাসে আমিরুল মোমিনীন উপাধিতে ভূষিত প্রথম খলিফা হলেন হযরত উমর (রাঃ)।তিনি আল- ফারুক উপাধি পান স্বয়ং নবী মুহাম্মদ(সা:)’ র কাছ থেকে।খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রাঃ) একজন দিগ্বিজয়ী বীর,ন্যায়পরায়ণ শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক।
ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ইবনে কুহাফার (রাঃ) ইনতেকালের আগেই হযরত উমর (রাঃ) সর্বসম্মতিক্রমে খলিফা নির্বাচিত হন।তাঁর শাসনকাল এখনো দুনিয়ার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে স্বীকৃত।দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে কাইসার ও কিসরার বিরাট রাষ্ট্রদ্বয় মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হয়।তাঁর যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ ১০৩৬টি শহর বিজিত হয়।ইসলামী হুকুমতের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্টা মুলত তাঁর যুগেই হয়।সরকার বা রাষ্ট্রের সকল শাখা তাঁর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে।তাঁর শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে আছে।
এই সেই শাসক যিনি তাঁর প্রজা সাধারণের অবস্থা দেখার জন্য রাতের আধাঁরে মহল্লায় মহল্লায় ছুটে বেড়াতেন।খেলাফতকালীন একটি রাতও তিনি বিছানায় শুয়েন নি।নিজে পিঠে করে খাদ্যের বস্তা অভুক্তদের বাড়ী পৌঁছে দিতেন।দুধ বিক্রেতা সত্যবাদিনী যুবতীকে নিজের পুত্রবধু হিসেবে বরণ করে নিয়েছেন।খৃস্টান শাসকের আমন্ত্রণে জেরুজালেম যাওয়ার সময় উটের রাখালকে পর্যায়ক্রমে উটের পিঠে উটিয়ে নিজে রাখাল হিসেবে উটের রশি টেনে নিয়ে এগিয়ে গেছেন।এমন সাম্যবাদী শাসক পৃথিবীর বিরল ইতিহাস।
অর্ধ দুনিয়ার বাদশাহ হয়েও নিজের রুটি রুজির জন্য ব্যবসা ও কৃষিকাজ করেছেন।বসবাস করতেন জীর্ণ শীর্ণ কুঠিরে।খেজুরপাতার প্রাসাদ ছিল তাঁর।মৃত্যুর আগে সেই জরাজীর্ণ ঘর বিক্রি করে বায়তুলমাল থেকে গৃহীত ন্যুনতম ভাতার সমুদয় পরিশোধ করেন।
হযরত উমর (রাঃ) ছিলেন অসম্ভব মর্যাদা সম্পন্ন ব্যাক্তি।রাসুল (সাঃ) বলেছেন, তাঁর পরে নবী কেউ হলে ওমরই হতেন।আল্লাহ ও রাসুলের কাছে তাঁর মর্যাদা ছিল অতি উচ্চে।ওমরের মতের সমর্থনেই কুরআনের আয়াতও নাজিল হয়েছে।হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, নবীর পরে উম্মতের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যক্তি আবু বকর(রা:), তারপর ওমর(রা:)।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন ,”ওমরের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের বিজয়।তাঁর হিজরত আল্লাহর সাহায্য এবং তাঁর খেলাফত আল্লাহর রহমত।”রাসুল (সাঃ) ইসলামের শক্তির জন্য ঈমান আনতে ওমরের(রাঃ) জন্য আল্লাহর কাছে দোয়াও করেছেন।
হযরত উমরের(রাঃ)’র্ দশ বৎসরকালীন শাসনামলে ইসলামী খেলাফত চরম উৎকর্ষ ও অদৃষ্ঠপূর্ব অগ্রগতি লাভ করে।এই সময়ে খেলাফতের বিকশিতরুপ বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ঠ করে।মুষ্ঠিমেয় মরুবাসী অতি অল্প সময়ের মধ্যে যে বিপ্লব সৃষ্টি করিয়াছিল, ইতিহাস উহার দৃষ্টানত পেশ করিতে অক্ষম। হযরত উমর(রাঃ )এর খেলাথতকালে পাক ভারত উপমহাদেশের সীমান্ত হতে মিশর ও সিরিয়া পর্যন্ত সমগ্র এলাকায় খেলাফত বিস্তৃত ছিল।এ সময় যেসব দেশ ও শহর নগরের উপর ইসলামের পতাকা উত্তোলিত হয় সেসব স্থানে জুলুম,নিষ্পেষণ ও নির্যাতনের একটি দৃষ্ঠান্তও খুঁজে পাওয়া যাবে না।উমরের খেলাফতকে অপুর্ব রহমত বলিয়া মনে করে লোকজন এর বিকাশ ও বর্ষিত হবার জন্য প্রার্থনা করত।সিরিয়া বিজয়ের ব্যাপারে সিরিয়ার অমুসলিম জনগন মুসলমানদের পক্ষে স্বত: প্রবৃত্ত হইয়া সংবাদ সংগ্রহ ও খোঁজ খবর এবং ইরাক বিজয়ের সময় ইরাকের অনারব জনতা ইসলামী সেনাদের স্বতপ্রণোদিত হয়ে পুল নির্মাণ ও প্রতিপক্ষের গোপন তথ্যাদি সংগ্রহ করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে প্রস্তুত হইবার সুযোগ দেয়।
উমর ফারুক (রাঃ) এর দেশ জয় ও রাজ্যধিকারের সহিত আলেকজান্ডার দি গ্রেট ,চেংগিজ খান ও তৈমুর লং এর মত রক্তপাতকারীদের কোন তুলনাই হতে পারে না।উমর রাঃ যে সুবিশাল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করেছিলেন ,সুবিচার-ইনসাফ,সহনশীলতা,সাম্য -ভ্রাতৃত্ব,উদারতা ও সহানুভূতির মত মহৎ গুণাবলী
তাতে পুর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়েছিল।বিশ্ব ইতিহাসে ফারুকী খেলাফত যথার্থই এক স্বর্ণযুগ ও মানবতার প্রকৃত কল্যাণের যুগ বলে অভিহিত হয়েছে।বস্তুত: একটি আধুনিক উন্নত রাষ্ট্রের যতগুলি দিক ও বিভাগ থাকা প্রয়োজন হযরত উমর (রাঃ) এর রাষ্ট্র শাসনে তার সব কয়টিই বিদ্যমান ছিল।
হযরত উমরের(রাঃ) খেলাফত ছিল পুর্ণমাত্রায় একটি গণ অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র।গণ অধিকার সম্মত রাষ্ট্র বলিতে সেই ধরনের রাষ্ট্র-সরকার বুঝায় যেখানে প্রতিটি নাগরিকই তার যাবতীয় অধিকারেরে সুযোগ লাভ করতে পারে।যেখানে প্রত্যেকেই নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে ও অন্যদের জানাতে পারে।উমরের(রাঃ) রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ সকল বৈশিষ্ঠ পুরা মাত্রায় কার্যকর ছিল।প্রতিটি নাগরিক পুর্ণ স্বাধীনতা ভোগ সহকারে নিজ নিজ অধিকার দাবী করতে পারত।
ইসলামের কালজয়ী এ নেতা তিন স্তর বিশিষ্ট মজলিসে শুরা কিংবা পরামর্শ সভার মাধ্যমে দেশ চালাতেন।প্রথম স্তর গুরুত্বপুর্ণ সাহাবীদের নিয়ে,দ্বিতীয় স্তরে (সাধরণ মজলিস) আনসার মুহাজির সকল সাহাবী ও গোত্রীয় সরদারগণ যোগদান করতেন।এছাড়া আরেকটি ছিল মজলিসে খাস।যেখানে কেবলমাত্র মুহাজির সাহাবীগণ থাকতেন।
খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর হযরত উমর (রাঃ) তাঁর ভাষণে স্পষ্ঠ ভাষায় বলেছেন,”তোমাদের ধন সম্পদে আমার অধিকার ততটুকু যতটুকু অধিকার স্বীকৃত হয় এতিমের মালে উহার মুতাওয়াল্লীর জন্য।আমি যদি ধনী ও স্বচ্ছল অবস্থায় থাকি ,তবে আমি কিছুই গ্রহণ করব না আর যদি গরীব হই ,তবে প্রচলিত নিয়ামানুযায়ী জরুরী পরিমাণ গ্রহণ করব।” তিনি আরো বলেন ,আমার উপর তোমাদের কতকগুলি অধিকার রয়েছে,আমার নিকট হতে তা আদায় করা তোমাদের কর্তব্য।প্রথমত দেশের রাজস্ব এবং গনিমতের মাল যেন অযথা ব্যয় না হতে পারে।দ্বিতীয়ত তোমাদের জীবিকার মানোন্নয়ন ও সীমান্ত সংরক্ষণ আমার কর্তব্য।আমার প্রতি তোমাদের এ অধিকার রয়েছে,আমি তোমাদের কখনও বিপদে নিক্ষেপ করব না।অপর এক ভাষণে তিনি বলেছেন,’তোমাদের কেহ আমাকে নীতিবিচ্যুত দেখতে পেলে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।উপস্থিত শ্রোতাদের একজন বলিল,’আল্লাহর শপথ।তোমার মধ্যে কোন নীতিবিচ্যুত দেখলে এই তীব্র ধারালো তরবারী দ্বারা উহাকে ঠিক করে নেব।’এ ভাষণগুলো শুধুমাত্র আকর্ষণীয় কিংবা তোজোদীপ তেজোদীপ্ত শ্লোগান নয় ইহা খেলাফতের মেনিফেস্টো বা নীতিমালা।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment