গোলজার আহমদ হেলাল :: হযরত উমর (রাঃ) এর রাজ্যশাসন ও জনহিতকর উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড:০৯(নয়)
ইসলামী ধারা ও ইনসাফে গােটা মানবজাতি খুঁজে পায় কল্যাণের দিকদর্শন । এজন্যে শরি’আতের সর্বাধিক বিষয়ে জ্ঞাত ও প্রজ্ঞাবান হবেন খলিফা । এসবের পরিপন্থীর এখতিয়ার খলিফার নেই । তিনি যতই বিচক্ষণ হােন না কেন । যেহেতু তিনি আইন – কানুনের বিধানদাতা নন । তার উপর হক , শরী’আতের বিধানসমূহ জারি রাখবেন । বিশ্বাসী আমানতদারীর সাথে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন খলিফার জন্যে ফরজ । খলিফা নিজের এবং নিজ পরিবারের জন্য অতিরিক্ত ধনসম্পদ থেকে বিরত থাকবেন । অর্থাৎ বিলাসবিহীন জীবন – যাপন করবেন । এক কথায় ন্যায় বিচারই ইসলামী রাষ্ট্রনীতির প্রাণসত্তা এবং তার প্রতিনিধিত্ব ।
ইতিহাসে হযরত উমর (রা:) এক কিংবদন্তী রাষ্ট্র নায়ক। প্রবল প্রতাপের সহিত তিনি বিশ্ব শাসন করেছেন। অর্ধেক পৃথিবীর একক নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তিনি। তাঁর রাজ্য শাসন ও জনসংহতিমুলক কর্মকান্ড ছিল সর্বজন বিদিত। বিশ্ব শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে বাদশাহ তালুতের হাত থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হযরত দাউদ (আ:) ও পরবর্তীতে তাঁর ছেলে হযরত সুলায়মান (আ:)প্রবল পরাক্রমশালী ভাবে দুনিয়া শাসন করেছেন।সাবার রাণী ও আনুগত্য স্বীকার করেছেন। সেকান্দার বাদশাহ, বাদশাহ যূলকারনাইন দুনিয়ার এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্ত ঘুরেছেন। কিন্তু পদ্ধতিগত ও সাংগঠনিক সিস্টেম বা ব্যবস্থাপনা পাই আমরা উমর (রা:)এর শাসনকালে বিশদ ভাবে।
উমর ( রা . ) – এর রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান
গণতন্ত্রের সফলতার জন্য লিখিত সংবিধান অত্যাবশ্যক । কেননা লিখিত সংবিধান ছাড়া মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভবপর নয় । ইসলামিক রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান বলতে কুরআন ও হাদীসকে বুঝায় ।
এএইচরে প্রদানে ‘ Comparative Political institutions ‘ গ্রন্থে বলা হয়েছে : “ যে রাষ্ট্রে তার নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালায় এবং জনগণের মানবিক চাহিদা পুরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা করে থাকে , তাকে কল্যাণ রাষ্ট্র বলা হয় । ”
কল্যাণ রাষ্ট্রের পরিচয় প্রদানে ‘ আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানে দু’জন মনীষীর মতামত উল্লেখ করা হয়েছে । Arthur Selsinger -এর মতে : Welfare state is a system wherein government agrees to Underwrite certain level of employment , income , education , medical aid , Social Security and housing for all its Citizens . ” ‘ – cette pasiet GTA একটি ব্যবস্থা যেখানে সকল নাগরিকের চাকুরী , আয় , শিক্ষা , স্বাস্থ্য , সামাজিক নিরাপত্তা ও বাসস্থানের সুযােগ – সুবিধা প্রদানে সম্মত হয় ।
কল্যাণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে G.D.H. Cole – বলেন : Welfare state is a society in which an assured minimum standard of living and opportunity becomes the Possession of every Citizen.- অর্থাৎ কল্যাণ রাষ্ট্র এমন সমাজ হবে যে রাষ্ট্রে নিশ্চিতভাবে জীবন – যাত্রার ন্যূনতম মান – মর্যাদা ও সকল সুযােগ – সুবিধা প্রতিটি নাগরিক ভােগ করতে পারে ।
সুতরাং , যে সরকার আল্লাহ তা’আলার কুরআন ও রাসূলুল্লাহ ( সা . ) – এর কর্মপদ্ধতি বর্ণনানুযায়ী সরকার পদ্ধতি পরিচালনা করে এবং যে রাষ্ট্রে নিশ্চিতভাবে সকল শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রার মান – মর্যাদা ও সকল সুযােগ সুবিধা দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক ভােগ করতে পারে তাকে কল্যাণকর ইসলামী রাষ্ট্র বলা হয় । আর উমর ( রা . ) শাসন সংস্কার করে ( ১৩-২৩হি . / ৬৩৪- ৬৪৪ খ্রি . ) একটি কল্যাণকর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গরূপ বাস্তবায়ন করেন ।
উমর ( রা . ) – এর রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য :
কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় যে , তখন সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস ( রা . ) কে ইরাকের লােকেরা আমীরুল মু’মিনীন ‘ বলে ডাকতে আরম্ভ করেছিল । প্রথম প্রথম এরূপ কোন উপাধির প্রতি উমর ( রা . ) এর কোনরূপ ধারণা ছিল না । একদা লােবাইদ ইবন রবীআ ও আদী ইবন হাতিম নামক দু’জন ইরাকি খলিফার সাথে সাক্ষাত করার জন্য মদীনায় আগমণ করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী খলিফার নিকট উপস্থিত হওয়ার জন্য আবেদন করলেন । যেহেতু তারা কুফার ।
শাসনকর্তাকে ‘ আমীরুল মু’মিনীন ‘ বলে সম্বােধন করতে অভ্যস্ত হয়েছিল সেহেতু সাক্ষাতের অনুমতি চাইবার সময় বলে পাঠালেন যে , আমীরুল মু’মিনীন ‘ – কে আমাদের আগমনের খবর দিন । আমর ইবনুল আস ঠিক এ সম্বােধনই উমর ( রা . ) – এর নিকট জানালেন । উমর ( রা . ) এরূপ সম্বােধনের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি তা বুঝিয়ে বললেন । সম্বােধনটি উমর ( রা . ) অত্যন্ত পছন্দ হলাে এবং তখন থেকেই খলিফার এ নূতন উপাধিটি জনগণের মধ্যে প্রচার হয়ে যায় । যা কোন প্রকারের দাম্ভিকতা বা অহংকারের জন্য ব্যবহৃত হতাে না।
ইসলামিক কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা : উমর ( রা . ) প্রায় দেড় সহস্র বছর পূর্বে ( ১৩-২৩হি . / ৬৩৪-৬৪৪খ্রি . ) শাসন সংস্কার করে একটা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ মডেল উপস্থাপন করে একটি কল্যাণকর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রের সফলতার অন্যতম পূর্বশর্ত । কেননা ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযােগ পায় । যার ফলে জনসাধারণের রাজনৈতিক জ্ঞান বিকাশ লাভ করে। উমর ( রা . ) – এর শাসনামলে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত । নিম্নে এ সম্পর্কে আলােচনা করা হলাে :
প্রবাসিদের প্রতি সুতীক্ষ্ম দৃষ্টি প্রদান : যেসব মুসলমান বিভিন্ন কার্যব্যাপদেশে দুনিয়ার অন্যান্য দেশ ও জাতির মধ্যে গিয়ে বসবাস করে , তারা যাতে নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র নষ্ট করে ভিন্ন জাতির সাথে মিলে একাকার হয়ে না যায় , সেদিক উমর ( রা . ) – এর সুতীক্ষ্ম দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল । তিনি সমগ্র আরব দেশকে ইসলামের দুশমন লােকদের পংকিলতা হতে সম্পূর্ণ পবিত্র করে তােলেন ।* অমুসলিমরাও মজলিস – উস – শূরার সদস্য : গবেষণায় দেখা যায় মজলিস – উস – শূরাতে জিম্মি বা অমুসলিমদের প্রতিনিধি থাকতো ।উমর (রা:) শাসনকার্য পরিচালনায় খ্রিষ্টান, পারসিক ও ব্রাম্মণদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। ইসলামের এ সব উদারনীতি ও সাম্যবাদ বহু মুসলমানদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে আকৃষ্ট করে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অমুসলিম :ধর্ম ও বর্ণের ব্যবধান ছিল না উমর(রা:) এর কাছে। তিনি মানবিক কারণে দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষকে ভালবাসতেন। সর্বোপরি ভালবাসতেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা:)কে।
যদিও তিনি ছিলেন মুসলিম নেতা। তবুও তার খেলাফতকালে (১৩-২৩হি. /৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.) বেশ কিছু কর্মচারী ছিল ভিন-ধর্মী। সে সময় রাজধানী মদীনার গোরস্থানের হেফাজত ও তত্ত্বাবধানকারী ছিলেন জনৈক খ্রীষ্টান ব্যক্তি। জাতির বাঁচা -মরা, উথ্বান -পতন ও নিরাপত্তার সিংহভাগই গুপ্তচরদের উপর নির্ভরশীল। সে গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তচরের কাজে নিয়োজিত ছিলই অমুসলিম।
লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
