জীবন বড়ই কঠিন। এই কঠিন জীবনকে যে সুন্দরভাবে গড়তে পেরেছে সেই সার্থক হয়েছে। আর যে সুন্দরভাবে গড়াতে পারে নি সেই অস্থিরতায় ভুগছে। আপনারা হয়তো ভাবছেন হঠাৎ এই জীবন নিয়ে কেন এতো মাথা ব্যথা। আসলে আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এই সুন্দর চোখ দিয়ে অনেক জিনিস দেখেছি। অনেক কিছু উপলব্ধি করে বুঝতে পেরেছি জীবনটাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কঠিন এবং সরল।
আদিকাল থেকে আজ অবধি মানুষ বসবাস করে আসছে। এই বসবাসের পেছনে রয়েছে একটা মধুর সম্পর্ক। এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই কেউ হচ্ছে মা, বাবা, ভাই, বোন ও আত্মীয়-স্বজন। ছোটবেলা থেকে আমরা দেখে আসছি আমাদের নানা-নানী, দাদা-দাদী, বড় মা, মা-বাব ইত্যাদিকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে সংসার করতে। দীর্ঘ ষাট থেকে সত্তর বছর তারা দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। এই জীবনে যেমন দুঃখ ছিল তেমনি সুখও ছিল। হাসি-আনন্দ, দুঃখ বেদনায় তারা এই দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন। কখনও কাউকে বুঝতে দেন নি তারা ঝগড়া করছেন। ঝগড়া করলেও আবার নিজেরাই মিটিয়েছেন। আবার যখন এই দাম্পত্যের জুটি থেকে ছুটি নিয়ে পরপারে চলে গেলে সেই মানুষটি একাই কেঁদে গেছেন। আর আগের সকল স্মৃতি মনে করছেন। তখনকার মানুষই ছিলেন আলাদা।
আর এখনকার যুগে কেউ এক বছরও সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পারছেন না। কোন কারণে ঝগড়া হলেই কেউ না কেউ ডিভোর্স দিয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ নতুনভাবে সংসার করছেন। ভুলে যান আগের ফেলে আসা সেই স্মৃতিগুলোকে।আমি আমার পাশের বাসা এক দাদুকে দেখেছি। যত দেখি ততই অবাক লাগে। দাদু আর দাদী দীর্ঘ সত্তর বছর সংসার করেছেন। ওনার চার ছেলে, চার মেয়ে। অনেক ভালো জায়গায় সবাইকে বিয়েও দিয়েছেন। দাদুর এক ছেলে দাদী আর দাদাকে হজ্বে পাঠিয়েছেন। হজ্জ্ব থেকে ফিরে দুজনই আবার দেশের বাইরে চলে গেলেন। ছেলে মেয়েদের কাছে কিছু দিন থাকবেন বলে। কিন্তুু সেখানে গিয়ে দাদী মারা যান। তখন দাদুকে আগে আগে দেশে পাঠানো হয়। আর তার একদিন পরে দাদীর লাশ কফিনে করে আসে। এই একদিন যে দাদুর কিভাবে কেটেছে দাদুই জানেন। দাদীর লাশ সবাইকে দেখানো শেষে দাফন করার জন্য যখন বাড়ি থেকে বের করা হয় ঠিক সেই সময়ই দাদু অজ্ঞান হয়ে যান। প্রায় মরণাপন্ন অবস্থা। দাদু দাদীর জানাজার নামাজেও শরীক হতে পারেন নি। তারপর থেকে দাদু আজো দাদীর জন্য কেঁদে যাচ্ছেন। প্রায় চার বছর হয়ে গেছে তবুও দাদীর কথা মনে করে দাদু কাঁদছেন। দাদী কত ভাগ্যবতী ছিলেন ভেবে দেখুন।
আর এখনকার সময় সামান্য কিছু নিয়ে ঝগড়া হলে সবাই আলাদা হয়ে যান। ঝগড়ার মীমাংসা না করে। আলাদা বসবাস করেন। এই আলাদা হওয়ার ফলে তাদের সন্তানেরাও আলাদা হয়ে যায়। কেউ যান বাবার সাথে। কেউ মায়ের সাথে। এভাবে করে ভেঙ্গে যায় একটা পরিবার, কেউ বঞ্চিত হয় মায়ের আদর থেকে। আবার কেউ বাবার আদর থেকে এর প্রভাব পড়ে সন্তানদের উপর। ফলে সন্তানেরা আলাদা মনোভাব নিয়ে বড় হচ্ছে। তাছাড়া সন্তানেরাও এই ঘটনার জন্য নানাভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও সন্তানেরা ছোট থেকে যে শিক্ষা পেয়ে বড় হয়েছে ঠিক তেমনি তাদের বেলাও সে রকমটা করে। এÍ একমাত্র কারণ হল মা-বাবর ঝগড়া। তারা যদি ঝগড়া না করত তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। আর ঝগড়া করলেও তারা যদি এইভাবে আলাদা না হয়ে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে পারতেন তাহলে হয়তো সন্তানদের এইভাবে থাকতে হতো না। কোন সন্তান চায় মা-বাবার কাছ থেকে আলাদা থাকতে। সন্তানরা মা-বাবা ছাড়া বাঁচতে পারে ঠিকই। কিন্তুু সেই বাঁচাকে বাঁচা বলে না। একমাত্র সেই বুঝবে যে এমনটি বেঁচে আছে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা বড়ই সুন্দর। আর এই সুন্দর সম্পর্কটা গড়ে তুলতে পারলেই সার্থকতা। আর যে পারে না সেই বোকা। গড়তে পারলে সুন্দর সম্পর্কটা অনেক যুগ ধরে পার করা যায়। যদি গড়ার মত গড়তে পারে। আমার এ লেখাটা তাদের জন্য যারা সামান্য কিছু নিয়ে ঝগড়া করে আলাদা বেঁচে আছেন। কিছু শিখার আছে আমাদের। তারা আমাদের জন্য অনেক কিছুরেখেও গেছেন। তাই সম্পর্কটাকে বেঁধে রাখতে হবে। যাতে আগের যুগের মানুষের মত আগামী প্রজন্মও আমাদের কাছ থেকে নতুন কিছু শিখতে পারে। গর্ব করে বলতে পারে এ যুগের কথা। সুন্দর জীবন ও সুন্দর সম্পর্কের কথা।
সম্পর্ক – রিমা বেগম পপি
233
