তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া :
গতকাল “কিডনি টাচিং” বাস ভ্রমণের অভিজ্ঞতা :
গতকাল মহাখালী থেকে এমন একটা লক্কর ঝক্কর গাড়িতে উঠছিলাম মনে হয় ঘোড়ার গাড়ি এর আগে যাবে। আর বাস পাচ্ছিলাম না তাই এই কিডনী টাচিং গাড়িতে উঠছিলাম। কিডনি নড়াইয়া ফেলছে তাই এই নাম ।
যাই হোক, ভাগ্য ভালো কার জামাই কার প্রেমিক জানি না তার সাথে সাথে রাস্তা পার হইছি বলে বাসটা পাইছি নয়তো রাস্তার ওপারেই রাত পার হইয়া যাইতো। ব্যস্ত রাস্তা পার হওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা আল্লাহ ছেলেদের দিছে, আলহামদুলিল্লাহ।
বাসে উঠতেই দেখি এক হেডফোন বিক্রেতা mi এর রিয়েল হেডফোন বেচতেছে পঞ্চাশ টাকায়৷ তো এই সুযোগ তো হাতছাড়া করা যায় না। কিনতে গিয়ে দেখি এক কানে শোনা যায় না। তো হেতি কইলো আমার ফোনেই নাকি সমস্যা। আমিও একমত পোষণ করে কইলাম, জি ভাই আমার mi ফোন মনে অয় নকল।
হেল্পার টাকা নিতে আসছে। আমি দুইশো টাকা সাধছি। সে বলে, আপনি তো আড়াইশো বইলা উঠলেন। এবার জিহ্বায় কামড় দিয়া কইলাম, ভাই মুখ ফসকে ভুলে বলছি। আসার সময় আমি দুইশো দিয়া আসছি। মনে ছিল না। হেল্পার হাসতে হাসতে আড়াইশোই নিল।
নিজের ফান্দে আটকা।
আমার পাশের সিটে বসছে এক ক্যাঙ্গারু ভাই। ঘুমের তালে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে। বাড়ি ভাবছে মনে হয়। মুনি ঋষিদের মত দুই ঠ্যাং ভাজ কইরা সিটে বসছে৷
এরপর পড়লো আশুলিয়ার ভয়াবহ জ্যাম।
সামনের সিটের এক তেজী বুড়া আঙ্কেল জ্যাম পড়লেই হাকডাক ছাড়তেছে, ‘ঐ তাত্তারি গাড়ি টান দে সকাল হয়া গেলো গা।’
পলিটিক্যাল পাওয়ার ওয়ালা ভাইয়া ক্যাওক্যাও করতেছে, আরেকটা গাড়ি তোর আগে গেলে খবর আছে। ওদিকে অর্ধশত গাড়ি আগে চলে গেছে। পোলাপানরা গরমের ঠ্যালায় ক্যাওক্যাও করতেছে, মায়েরা রাগের মাথায় থাপ্রাইতেছে৷ পোলাপানের বাপরে বকা দিতেছে।
সিট না থাকা সত্ত্বেও হেল্পার ভাই ঠেইলা মানুষ তুলতেছে। প্রচুর সিট ফাঁকা এই লোভ দেখাইছে। মহিলারা উঠে হাওকাও শুরু করছে, সিট নাই তুললি ক্যান? চিনোস আমারে ?
আমার পেছনের সিটে বসছে এক যুগল। সম্ভবত নতুন বিয়ে হইছে। তো জামাই একটু একটু পর বউরে তুলুতুলু করতেছে, তুমি কি বমি করবা? একটু বমি করলে ভাল্লাগবে৷ বউরে বাতাস খাওয়াইতে গিয়া আমার জানালা বন্ধ কইরা দিছে।
রাগের ঠেলায় বলতে মন চাইছিল, বমি এলে আপনার কোলে গিয়ে করবে তুলুতুলু করা লাগবে না৷ চুপ থাকেন মিয়া।
ডান সারির এক ভাই কানে হেডফোন গুঁজে জোরে জোরে গান গাইতেছে। মনে হয় শিল্পীর সাথে গান গাওয়ার চেষ্টা করতেছে। মনটা চাইছিল হেডফোন টান দিয়া খুইলা তার গলা তারে শোনাই।
সেই ক্যাঙ্গারু ভাইয়ের দেখাদেখি আমিও ঠ্যাং তুইলা বসছিলাম। তো একটু পর দেহি জুতা নাই। গাড়ির নাড়াচাড়ায় কই গেছে জানি না৷ সামনের সিটের আঙ্কেলকে ডাক দিলাম,আঙ্কেল আপনার ওদিকে জুতা গেছে? বেডা অবাক! আমিও অবাক কী কইলাম এইডা!
ওদিকে আমার মা অস্থির হইয়া ফোন দিতেছে, শয়তানেরা ক্যামনে গাড়ি চালায় এত সময় লাগে ক্যান?
মন চাইছিল বলি, আজ যে জ্যামে পড়ছি মনে হয় কাল সকালে বাস পৌঁছাবে। ওদিকে তেজী বুড়া আঙ্কেল বলতেই আছে, তাত্তারি গাড়ি টান দে সকাল হয়া গেল গা।
এক আপু জামাই কিংবা বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করতেছে।
অন্যদিকে সিনএনজি আর আমাদের বাস ড্রাইভারের সাথে ঝগড়া লাগছে। বাস ড্রাইভার তেজ দেখায়া বলছে,চিনোস আমারে মধুপুর থাকি। সিএনজিওয়ালা মুখ ভেঙাইয়া বলছে, মধুপুরের সব মানুষ হান্দার। তুইও হান্দারের পোলা।
এই জ্যামের ভীড়ে রমরমা ব্যবসা করতেছে ঠান্ডা পানিওয়ালা, জুসওয়ালা। ঝগড়াওয়ালারা পানি,জুস বেশি নিছে।
মাত্র এক/ দেড় ঘণ্টার জন্য ঢাকা গিয়ে আবার ফেরত আসার কিডনি টাচিং অভিজ্ঞতা হয়েছে।
জ্যাম না থাকলে যেখানে টাংগাইল থেকে ঢাকা যেতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে সেখানে আমার যেতে সময় লেগেছে সাত ঘণ্টা আর আসতে সময় লেগেছে আট ঘণ্টা। চাঁনখারপুল থেকে মহাখালী পর্যন্ত যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা। যাক আসতে যে পেরেছি এইতো অনেক।
কিডনি টাচিং এই বাসরে লাল সালাম।
লেখক:সাবেক শিক্ষার্থী -উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
