শুধু রক্ত আর রক্ত। গাজায় বইছে রক্তের নহর। হায়েনারূপী ইহুদিদের নির্মমতায় ক্ষতবিক্ষত নিথর হয়ে যাওয়া নিষ্পাপ শিশুর রক্ত। অসহায় মহিলা ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার রক্ত। রক্ত আর রক্ত। ধূসর ধুলাও রক্তে রঞ্জিত। চারদিকে ভয়ঙ্কর-বীভৎস দৃশ্য। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মানুষের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহ। গুলিবিদ্ধ গুরুতর আহত নিষ্পাপ শিশুর বিলাপ, স্বজনদের বুকফাটা চিৎকার, আহাজারিতে ভারী হয়ে গেছে বাতাস। ওপরে স্তম্ভিত আকাশ থেকেও যেন অশ্রু ঝরছে। তবুও খুনের নেশায় উন্মত্ত নির্দয় ইহুদিবাদীদের হাত কাঁপছে না। মানুষ নামের অযোগ্য-অধম পশুগুলো অবলীলাক্রমে চালিয়ে যাচ্ছে হত্যাযজ্ঞ। ধ্বংসযজ্ঞ। প্রাণভয়ে জ্ঞানশূন্য আদম সন্তানদের আশ্রয়ের খোঁজে দিগ্বিদিক ছোটাছুুটি এবং ব্যথায় কাতর আহতদের আর্তনাদ হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করছে। শিশু সন্তানের লাশ নিয়ে শোকে মুহ্যমান দুঃখিনী মায়ের বুকফাটা চিৎকার-আহাজারিতে আল্লাহর আরশও যেন কেঁপে উঠছে। ট্যাংকের গোলা, বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত শেল আর হিংস্র পদাতিক বাহিনীর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে ২০ জুলাই রবিবার একদিনেই প্রাণ হারান ১৫০ জন ফিলিস্তিনি। বাড়িঘর, আত্দীয়-স্বজন হারিয়ে হাজার হাজার মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ৬৭টি স্কুলে গড়া আশ্রয়কেন্দ্রে। হাসপাতালে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কয়েক হাজার সম্বলহীন অসহায় মানুষ। হাসপাতালও নিরাপদ নয়। ওরা হাসপাতালেও ট্যাংকের গোলা নিক্ষেপ করে পাঁচজনকে হত্যা ও কমপক্ষে ৭০ জনকে আহত করেছেন। ওরা বেশ কয়েকটি মসজিদেও গোলা নিক্ষেপ করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। নিহতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। ২১ জুলাই সোমবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় একই পরিবারের ৯ জন নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে সাতটিই শিশু। আগের দিন রবিবার গাজার দক্ষিণাঞ্চলে খান ইউনিস ও রাফাহ এলাকায় দুটি পরিবারের ৩০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। পূর্বাঞ্চলীয় শেজাইয়া আবাসিক এলাকাটি ইসরায়েলি বাহিনীর গোলার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। শেজাইয়া এখন একটি বিরান ভূমি। ইসরায়েলের অব্যাহত আক্রমণের ফলে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, মৃতদেহ দাফন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কবরস্থানে নতুন কাউকে দাফন করার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। কবর খননের লোকও পাওয়া যাচ্ছে না। স্থল ও বিমান হামলার তীব্রতা বাড়তে থাকায় জানাজা ছাড়াই অনেক লাশ দাফন করতে হচ্ছে। মানবতা বিপন্ন। ইসরায়েলিদের নৃশংসতায় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে গাজায়। ইসরায়েলের বর্বর সামরিক বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডবের বীভৎসতা ও হিংস্রতার সঠিক বর্ণনা প্রদান আমার মতো একজন খুদে কলমপেষা মানুষের পক্ষে আসলেই দুষ্কর।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত ও টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত রিপোর্ট অনুযায়ী নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে নারী ও শিশু। এ পর্যন্ত রক্তপিপাসু ইহুদিবাদীদের নৃশংসতায় নিহতদের এক-চতুর্থাংশই নিষ্পাপ শিশু এবং অর্ধেক অবলা নারী। অন্যরা প্রায় সবাই বেসামরিক পুরুষ। ঘৃণ্য জঘন্য ইসরায়েলিদের হামলায় নিহত প্রায় ৮ শতাধিক ব্যক্তির মধ্যে ৫০ জনও হামাস সদস্য নয়। একটি সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত মাত্র ২৭ জন সৈন্যসহ ২৯ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। জবরদখল করে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড দখল করা ইহুদিরা জাতি হিসেবে ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করতেই নানা অজুহাতে এমন পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং সেটাই বর্বর ইহুদিবাদীদের একমাত্র লক্ষ্য। আর সে ঘৃণ্য উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই ওরা বেছে নিয়েছে নিরীহ ফিলিস্তিন শিশুদের নিধন। উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। ছোট্ট সোনামণিদের ওপর বীভৎস শারীরিক-মানসিক অত্যাচার চালিয়ে তাদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে মানসিকভাবে শেষ করে দেওয়া। যাতে বড় হয়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না পায়। গাজায় প্রায় ১৭ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করে। এটাই ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড় শহর। সে কারণেই গাজা ইসরায়েলিদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। প্রায় তিন দশক ইসরায়েলের দখলে ছিল গাজা। ১৯৯৩ সালে গাজার প্রশাসনিক ভার ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত হয়। কিন্তু ২০০৬ সালেই গাজা অবরুদ্ধ হয়। অবরুদ্ধ হওয়ার পর থেকেই গাজায় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল বাহিনী। ২০০৮ ও ২০১২ সালেও ইসরায়েল গাজায় বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। শিশু-মহিলাসহ শত শত ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। ইসরায়েলের এক সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে গাজার সব ফিলিস্তিনি মায়েদের হত্যার কথা বলেই ফেলেছেন। উদ্দেশ্য পানির মতো পরিষ্কার। যাতে গাজায় সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য কোনো নারী বেঁচে না থাকেন। কি জঘন্য মানসিকতা। কি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। কসাই আর কাকে বলে! এমন পরিকল্পিত গণহত্যা চালালেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি মোটেই ওখানে পড়ছে না। ভাবতেও অবাক লাগে যে, একটি জাতি ধ্বংস করার জন্য যেখানে পরিকল্পিত আগ্রাসন চালানো হচ্ছে সেদিকে কারও নজর নেই। গাজায় প্রতিদিন মানবতা-মানবাধিকার পদদলিত হচ্ছে। সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় নেই। অথচ ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডবি্লউ) বাংলাদেশে র্যাব বিলুপ্ত করে দেওয়ার দাবি তুলেছে। গত ২৩ জুলাই এ পত্রিকার সহযোগী বাংলা জাতীয় দৈনিকটি গত ১৩ জুলাই তাদের সম্পাদকীয়তে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মুখোশ খুলে দিয়ে একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছেন।
পবিত্র রমজান মাসে জায়নবাদীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড বিশ্বব্যাপী তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি নেতা হিটলার যেভাবে ইহুদিদের হত্যা করেছিল তারও চেয়ে বেশি উন্মত্ততা নিয়ে আজকের আধুনিক বিশ্বে ইসরায়েলের ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে। মনে হচ্ছে, এই ঘৃণ্য জায়নবাদীদের ওপর এখন নিন্দিত নাৎসিবাদের প্রেতাত্দা ভর করেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় হিটলার কেন ইহুদিবাদী পশুগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলল না। হিটলার নাকি বলেছিলেন, ‘আমি সব ইহুদিকে মারতে পারতাম, কিন্তু কিছু ইহুদি বাঁচিয়ে রেখেছি… যাতে পরে দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারে কেন ইহুদিদের আমি মেরেছিলাম।’ হের হিটলার তোমার কথা সত্যি হয়ে থাকলে, এখন ঠিকই তামাম দুনিয়ার মানুষ, বিশেষ করে নিজ ভূমিতে পরবাসী অসহায় ফিলিস্তিনিরা মর্মে মর্মে তা বুঝতে পারছে, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তোমার মন্তব্যের মর্মকথা। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও পশ্চিমা বিশ্ব এবং ওই শক্তির কক্ষপুটে অবস্থানকারী জাতিসংঘ একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পশ্চিমা শক্তির প্রত্যক্ষ সমর্থনে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্যালফোর ঘোষণা বলে ১৯৪৮ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল নামক ইহুদি রাষ্ট্রটির পত্তন ঘটে। ঘোষণায় অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ না হওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও ফিলিস্তিনিরা অব্যাহতভাবে ইহুদিদের বর্বরতা ও পৈশাচিক অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রনায়ক ও লেখক আর্থার জেমস ব্যালফোর ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিদের হাতে লাখ লাখ ইহুদি প্রাণ হারায়। এর মধ্যে ভাগ্যক্রমে যারা বেঁচে যায় তারা ইউরোপের অনেক দেশের সাহায্য-সহযোগিতায় বিশ্বের নানা স্থান থেকে ফিলিস্তিনে জড়ো হতে থাকে। তারা ফিলিস্তিনিদের ওই ভূখণ্ড থেকে উৎখাত করা শুরু করে। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তখন পাশর্্ববর্তী মিসর, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। ইহুদিদের সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে অনেক ফিলিস্তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও পাড়ি জমায়। মূল ভূখণ্ডের মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগের মতো যেটুকু জমি এখনো ইহুদিরা গ্রাস করতে পারেনি তাতে কোনো মতে মাথা গুঁজে ফিলিস্তিনিরা পড়ে আছে। ফিলিস্তিনিদের দুঃখকষ্ট ঘৃণ্য, চতুর ও নিষ্ঠুর ইহুদিদের এতটুকু টলাতে পারেনি। তারপরও যুগ যুগ ধরে কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে অসহায় ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের নিজ ভূমিতে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখযোগ্য, ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের মাত্র এক বছরের মধ্যেই ৮০ ভাগেরও বেশি জমি দখল করে নেয় দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী। ১৯৬৭ সালে ৫ জুন আরব দেশগুলোর সঙ্গে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধে ইসরায়েল গাজা, পূর্ব জেরুজালেমসহ ওয়েস্ট ব্যাংক এবং লেবাননের গোলান হাইটসও দখল করে নেয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সালে দখল হওয়ার আগ পর্যন্ত গাজা মিসরের প্রশাসনিক ও পূর্ব জেরুজালেমসহ ওয়েস্ট ব্যাংক জর্ডানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির পর অধিকৃত এলাকার কিছু অংশ প্যালেস্টাইন অথরিটির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের কিছু অধিকার পেলেও ইসরায়েলের ওপর পশ্চিমা শক্তির মদদ থাকায় ফিলিস্তিন নামের রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটতে পারেনি। এটা যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনবাসীর জন্য সোনার হরিণ হয়েই থাকল।
বিশ্বের বিবেকবান মানুষ গাজায় ইসরায়েলের এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ-বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। বাংলাদেশেও প্রতিদিন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও প্রতিবাদ করেছে। ওখানে একটি প্রতিনিধি দলও পাঠানোর কথা বলেছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. এ. কে আবুল মোমেন গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর অবিলম্বে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। পবিত্র রমজান মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্বে মুসলমানরা পালন করবে খুশির ঈদ। ঈদের আগেও কি ফিলিস্তিনবাসীর জন্য কোনো সুখবর আসবে না? বন্ধ কি হবে না তাদের ওপর পৈশাচিক তাণ্ডব? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ পশ্চিমা বিশ্বের অন্য মোড়লদের মনে কি একটুও মানবতাবোধ জাগবে না। তারা কি নির্বিকার বসে থাকবে। ইহুদি ছাড়া বিশ্বের সব ধর্মের মানবিকতা বোধসম্পন্ন মানুষ অবিলম্বে ফিলিস্তিনিদের ওপর এই হত্যাযজ্ঞের অবসান চায়। শিশু-নারী-পুরুষসহ অগণিত দুর্ভাগা ফিলিস্তিনবাসীর অপরিসীম দুর্ভোগ তাদের বিবেককে জাগ্রত করবে বলে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিবেকবান মানুষ বিশ্বাস করতে চায়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
