গোলজার আহমদ হেলাল : এম সি কলেজ ছাত্রাবাস আমার প্রিয় ঠিকানা,প্রিয় বাড়ী, প্রিয় স্থান।ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় প্রিয় এম সি কলেজ ছাত্রাবাস।নান্দনিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত মনোমুগ্ধকর মনোরম এ ক্যাম্পাসে জীবনের স্বপ্নিল সোনালী সময়ের সুদীর্ঘ প্রায় এক যুগ কাটিয়েছি।
কাকডাকা ভোর,সকালের সোনালী রুদ্দুর, সবুজ ঘাসে কুয়াশা ভেজা শিশির বিন্দু,উষা ও গোধুলী লগ্নে উদয় ও অস্তাচলের অপরুপ দৃশ্য বিমোহিত করত আমাকে ।প্রকৃতি তার নিজ হাতে গড়েছেন স্বর্গীয় এই জ্ঞান-বিজ্ঞান,শিক্ষা ও গবেষণার পীঠস্থান কে।
আমি একাদশ-দ্বাদশ (বিজ্ঞান) শ্রেণী ও গণিত বিভাগে অধ্যয়ন করি এম সি কলেজে।উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে চান্স পেয়েছিলাম।যাই নি।ভর্তি হই এম সি কলেজের গণিত বিভাগে।বি এস সি (সম্মান) ও এম এস সি ডিগ্রী লাভ করি এখান থেকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।১৯ ৯৮ সালের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা হয় ২০০০ সালে আর ‘৯৯ সালের মাস্টার্স এক্সাম হয় ২০০১ সালে।রেজাল্ট প্রকাশ হয় ২০০২/২০০৩ সালে।শিক্ষাবর্ষ ছিল অনার্স ১৯৯৫-৯৬, মাস্টার্স ১৯৯৮-৯৯।আমি একাধারে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৩/০৪ সাল পর্যন্ত এম.সি কলেজ ছাত্রাবাসে ছিলাম।
আমি অনার্স ও মাস্টার্সে অধ্যয়নকালে প্রথম (মুসলিম) ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র হিসেবে কক্ষ নং ১০৯,১০৭ ও ১১৩ তে ছিলাম।আর ইন্টারমিডিয়েটে ছিলাম ৫ ম (পশ্চিমাঞ্চলীয়) ছাত্রাবাসের ৫১৬ নং কক্ষে।
সবুজের প্রান্তর এম সি কলেজ ছাত্রাবাস স্মৃতি বিস্মৃতির এক জাগ্রত অতীত। হৃদয় আংগিনার গহীন কোণে সঞ্চিত আমার অব্যক্ত প্রতিচ্ছবি। এখানে মনের মাধুরী,গভীর মিতালী আর প্রকৃতির সাথে মিশে কবিরা কবিতা লিখে, শিল্পীরা গান গায়।গভীর রাত জেগে জেগে মেধাবীরা জ্ঞান চর্চা করে।রাতজাগা পাখিরা পড়ালেখার পাশাপাশি সৃজনশীল শিল্প-কর্ম ও সংস্কৃতিতেও পিছিয়ে ছিলনা।দেশের উত্তর পুর্বাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ তৎকালীন আসাম প্রদেশের প্রথম সরকারী কলেজ ফ্লাওয়ার অফ দা ইস্ট(প্রাচ্যের পুষ্প) খ্যাত প্রাচীন এ ক্যাম্পাস রাজনীতির লীলাভূমি হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জাতীয় মুক্তির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশ মাতৃকার সকল স্বাধিকার আন্দোলনের এক মহান ক্যাম্পাস এ ছাত্রাবাস।প্রতিথযশা বিজ্ঞানী, লেখক,সাংবাদিক,রাজনীতিবিদ,আমলা, শিক্ষাবিদ,প্রকৌশলী,বিচারক, আইনজীবী, সামরিক ও জনপ্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তা, গবেষক,কুটনৈতিক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক,মন্ত্রী, এমপিসহ রাষ্ট্র’র অনেক নীতি নির্ধারক এখান থেকে বেরিয়ে দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কাজ করছেন।এ ছাত্রাবাস যেন এক রত্নাগর্ভা মা।সোনালি সন্তানের প্রসব কার্যক্রম চলছে অবিরত।থামবে না কোন দিন।
১৯৯২ সালে স্টার মার্কস সহ ১ম বিভাগে এসএসসি পাশ করে অনেক স্বপ্ন ও ইচ্ছা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম এম.সি কলেজে একাদশ বিজ্ঞান শ্রেণীতে।আজ মনে পড়ছে, ২৪ সেপ্টেম্বর’৯২ একাদশ শ্রেণীর উদ্বোধনী ক্লাসের দিন প্রতিপক্ষ দু’টি ছাত্র সংগঠন নবাগত ছাত্রদের সংবর্ধনা ও দলে ভিড়ানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কলেজ কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষনা করে। প্রায় মাস খানেক পর কলেজ আবার খোলে। গ্রাম থেকে শহরে এসে স্বাভাবিকভাবে নতুন পরিবেশের স্পর্শ পাই। পাশাপাশি এম.সি কলেজের মতো একটি নামী-দামী প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করাটাও চাট্টিখানি কথা নয়। বয়সে এবং সাইজে ছোট হওয়ার কারনে সবাই আমাকে স্নেহ করতো। কলেজের বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষিকা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে বেশ কয়েকটি বই উপহার দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের ‘লালসালু’ পড়াতেন। বিশেষ করে ‘লালসালু,’ ‘এম.সি কলেজ স্মৃতি বিস্মৃতির জাগ্রত অতীত,’ ‘সিলেটের মাটি সিলেটের মানুষ’ সহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ দিলেন।
শেষোক্ত দুটো গ্রন্থ থেকে এম.সি কলেজ সম্পর্কে অনেক জানলাম। সেদিন ২৪ সেপ্টেম্বর’৯২ যখন দুটি ছাত্রসংগঠন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তখন দেখলাম কলেজ অধ্যক্ষসহ সিনিয়র শিক্ষকবৃন্দ প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করেছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে। এইচ এস সি পাশ করার পর এম.সি কলেজেই আবার ভর্তি হই। গণিত বিভাগে। ইন্টারমিডিয়েট থেকেই ছাত্রাবাসে থাকতাম। প্রায় সুদীর্ঘ ১০/১১ বৎসর ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত, ঘটনা-দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি এই আমি ।
আমরা জনি, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ সিলেট এম.সি কলেজ। ১৮৯২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সিলেটের জমিদার রাজা গিরিশ চন্দ্র সেন নিজ মাতামহ মুরারী চাঁদ রায়ের নামে ইহা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সিলেটেরই আরেক কৃতি সন্তান তৎকালীন আসাম সরকারের শিক্ষামন্ত্রী সৈয়দ আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া ১৯১২ সালে এটি সরকারী ১ম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত করেন। পরবর্তীতে ইহা বর্তমান ক্যাম্পাস টিলাগড়স্থ থ্যকারে টিলায় স্থানান্তর হয়। ইংরেজ গভর্ণর স্যার উইলিয়াম মরিচ এক্ষত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ প্রতিষ্ঠান অনেক জ্ঞানী-গুনী ও কীর্তিমান মানুষের জন্ম দিয়েছে যারা সমাজ ও বিশ্বে অবদান রাখছেন। এ ছাত্রাবাসেই অধ্যয়ন করে তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে গৌরবোজ্জল ভূমিকা রাখছেন।
শুধু তাই নয় অনেক ঐতিহাসিক মহাপুরুষদের পদধুলি পড়েছে এখানে। পাকিস্তানের জনক কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পন্ডিত ও আইনজ্ঞ জওহরলাল নেহেরু, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক গুনী ব্যক্তিরা এখানে এসেছেন।
জিন্নাহ সাহেব নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত মনোমুগ্ধকর এ ক্যাম্পাস ভ্রমণ করে একে ‘Flower of the East’ বা ‘প্রাচ্যের পুস্প’ বলে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ২১ কার্তিক সিলেট সফরে এলে দীর্ঘক্ষণ ছাত্রাবাসে কাটান। তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন “স্বদেশের পুঞ্জীভ‚ত লজ্জা দূর করবার ভার তোমাদের উপর। তোমরা আকাংখাকে বড় করবে। সাধনাকে সত্য করবে।” ১০২ বছর আগে তিনি যেখানে এসেছিলেন, এটি ঐতিহ্যমন্ডিত নান্দনিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত (সেমি পাকা আসাম টাইপ বাংলা প্যাটার্নের ঘর) বিশ্বের বুকে এ ধরনের সবচেয়ে বড় স্থাপনা। যাহা World Heritage বা বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক।
জ্ঞান-বিজ্ঞান আর মানুষ গড়ার অন্যতম সূতিকাগার শতবর্ষের ঐতিহ্যে লালিত ইতিহাসের প্রাচীণতম এ প্রতিষ্ঠানটি শুধু সিলেটবাসীর নয় গোটা উপমহাদেশের গর্ব ও ঐতিহ্যের স্মারক। যুগ যুগ ধরে এ প্রতিষ্ঠানটি অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রাম আর এতদঅঞ্চলসহ গোটা উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মনুষত্ব বিকাশের কেন্দ্রভূমি হিসেবে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
শুধু তাই নয় এম.সি কলেজের ছাত্রাবাসের সাথে জড়িয়ে আছে এ কলেজের হাজার হাজার সাবেক ও বর্তমান ছাত্র-শিক্ষকের হৃদয়ের অবেগ-অনুভূতি। জড়িয়ে আছে প্রকৃতি প্রেমিক অসংখ্য দর্শনার্থী, পর্যটক ও সাধারণ জনগনের হৃদয় নিংড়ানো ভালাবাসা।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক-দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি,সিলেট অনলাইন প্রেস ক্লাব।
২১শে জুন ২০২১ইংরেজী
