গোলজার আহমদ হেলাল : ছাত্র ইউনিয়নের সাথে প্রথম প্রেম হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। এটা দূর্বল প্রেম ছিল, না সবল, তা জানি না। তবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কোন ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথমেই কৃতি ছাত্র সংবর্ধনা পেয়েছিলাম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কাছ থেকে।
আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। ইতোমধ্যেই ম্যক্সিম গোর্কির কালজয়ী গ্রন্থ ‘মা’ থেকে শুরু করে মার্কস বাদের ‘অ আ ক খ’,লেনিন স্স্টালিনের কাহিনী সহ অনেক বই গলধ:করণ হয়েছে। আমি ছিলাম বই পোঁকার দলে। আমার বোন আমাকে ডাকতেন কালপন্ডিত, বিজ্ঞানী ইত্যাদি ইত্যাদি। মজাই লাগত।
ছাত্ররাজনীতি তখনো বুঝিনি। অষ্ঠম শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময় ছাত্র শিবিরের একদল লোক ক্লাসরুমে প্রবেশ করল। আমি ছিলাম ক্লাসের ফার্স্ট বয়। বয়স ও সাইজে সবার চেয়ে ছোট। স্কুলে আসা -যাওয়া, ক্লাস করা আর ফুটবল খেলা ছাড়া দ্বিতীয় কোন কাজ আমার ছিল না। ছাত্র -শিক্ষক, কর্মচারী, ছেলে- মেয়ে সবাই আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করত। ছাত্র শিবিরের ভাইয়েরা শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের সাথে সাথে আমার দুই সহপাঠী সেকেন্ড ও থার্ড বয় আমাকে নিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে যায়। ফলে ছাত্র শিবিরের লোকজন আমাদেরকে পায় নি।
এর কিছু দিন পর জাসদ ছাত্রলীগের ভাইয়েরা আমাকে সিলেট শহরে একটি মিছিলে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমি যাই নি। সেসময়ে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে জাসদ ছাত্রলীগ ছিল প্রভাবশালী একটি ছাত্র সংগঠন। জাসদ করে ছাত্ররা নিজেদেরকে গর্ববোধ করত।এটি ছাত্র রাজনীতিতে তখন ছিল ফ্যাশন। শারীরিক ড্রেস আপ আর চুলের আকর্ষণীয় ডিজাইন জাসদ কর্মীকে লোকজন বেলা-অবেলায় চিহ্নিত করতে পারত। ‘আমি জাসদ করি’ এটা ছিল একটি ফ্যশনেবল উক্তি।মস্কো-পিকিং আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র তত্ত্ব এগুলো ছিল আকর্ষণীয় বুলি।
ছাত্ররাজনীতির পাদপীঠ অনেকটাই ভরপুর ছিল মার্কসীয় অর্থনৈতিক মতবাদ, সাম্রাজ্যবাদ আর সামন্তবাদের পক্ষপাত দোষে দুষ্ট।
বাকশাল এর এক ভাই একবার আমার বাড়ীতে গিয়েছিলেন। বলেছেন আমার ‘মা’কে সে(আমি) যেন কলেজে গিয়ে বাকশাল করে। বাকশাল না কি লোকদের ভাত কাপড় বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়।
নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময় মুজিববাদী ছাত্রলীগের রাজনৈতিক সভায় অংশগ্রহণ করি। দুপুর ১ টায় টিফিনের সময় স্কুলের পার্শ্ববর্তী এক বাড়ীতে প্রায়ই ছাত্রলীগের সভা হত। বন্ধুদের উৎসাহে এ ধরনের কয়েকটি সভায় আমি গিয়েছিলাম। জয় বাংলা শ্লোগান সমৃদ্ধ বক্তব্য সেখানেই শুনতে পাই।
একদিন শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কয়েকজন তরুণ। আবেগময়ী বক্তব্য রাখলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা আমরা শুনলাম। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজের সাংগঠনিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল।
নব্বই এর দশকে ছাত্র রাজনীতির গুণগত মান ও প্রাণ ছিল। স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল দেশব্যাপী তুঙ্গে। সবকটি ছাত্র সংগঠন একসাথে আন্দোলন করত। সেসময়ে গ্রাম এলাকায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তেমন ছিল না। হাই স্কুল গুলোই ছিল নানা আন্দোলনের সূতিকাগার। প্রায়ই মিছিল, মিটিং, হরতাল হত। শহর থেকে কলেজ পড়ুয়া বড় ভাই গণ মফস্বলে গিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম, মিছিল করতেন। আমরা না বুঝেই ছিলাম সে মিছিলের জনতা।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছিল এক গৌরবৌজ্জ্বল অধ্যায়। যে মিছিলের শুরু ছিল শেষ নেই। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”,”জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ”, “রাজাকার, আলবদরদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ” সহ নানা ধরনের শ্লোগানে মুখরিত থাকত। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, লুপ্ত হতে দেব না”, “গোলাম আযম সাঈদী ,বাংলার ——–“গগণবিদারী শ্লোগান শোভা পেত। প্রবল ছাত্র আন্দোলন রাজধানী থেকে মফস্বল, গ্রামে- গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল।
কলেজ আঙ্গিনায় প্রবেশের গলিপথে আবারো দেখা হলো ছাত্র ইউনিয়নের সাথে। “মুক্তিরও মন্দিরও সোপানতলে,কত প্রাণ হল বলি দায়।” এ গানটি গাইতেন প্রাণভরে তৎকালীন এক ছাত্র নেতা। আমার প্রিয় এক স্কুল শিক্ষক আমাকে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মসূচিতে অংশ নিতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আমার প্রিয় এক কলেজ শিক্ষিকা উৎসাহ দিয়েছেন সে সংগঠনের পাঠচক্রে যেতে।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে খালি পায়ে প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, কালো ব্যজ ধারণসহ স্কুলের অপরাপর কর্মসূচি তে আমরা সবাই উৎসাহ অনুপ্রেরণা পেতাম।সেসময়ে স্কুল গুলোতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিতর্ক অনুষ্ঠান ইত্যাদি তে ভরপুর থাকত। মেধা, মনন ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ সাধনের জন্য বিদ্যালয়ের সহ-পাঠক্রম কর্মসূচি সত্যিই প্রেরণার বাতিঘর।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
