গোলজার আহমদ হেলাল : প্রকৃত অর্থে ২০০৮ সাল থেকেই জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হই।জীবন সংগ্রামের ১০ম বৎসর অতিবাহিত করছি।আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের মূল্যায়ন এখনও আমি সফল হই নি।তবে এ কথা সত্য একেবারে বিফলেও যাই নি।ছাত্রজীবনে অতটা খারাপ ছিলাম না।আমি ছিলাম মুলত গণিতের ছাত্র।স্কুলজীবনে অংকশাস্ত্রে শতকরা ৯৯ এর নিচে কখনও পাই নি।এস এস সি তে স্টার মার্কস,এইচ এস সি তে ১ম বিভাগ(লেটারসহ),অনার্স/মাস্টার্সে ২য় শ্রেণী,এল এল বি(আইন ওবিচার)তে ১ম শ্রেণী,স্কুলে প্রাইমারী/জুনিয়রে স্কলার্শীপসহ নানাবিদ বৃত্তিও পেয়েছি।বি এড ও এম বি এ তেও কিছুদিন পড়াশুনা করেছি।সব মিলিয়ে মোটামুটি ছিলাম।কিন্তু কর্মজীবনে এখন সাংবাদিকতা করছি।কারণ এ পেশার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ও আগ্রহ আছে।তবে জার্নালিজমের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি সেই ১৯৯৮ সালে।লেখালেখি করতাম ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে।মানিক বন্দোপাধ্যায়ের “পদ্মা নদীর মাঝি”,বিভুতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ আর নজরুলের ‘রিক্তের বেদন’ কবি কিংবা লেখক হতে উৎসাহিত করত।
সারা দিন সারা রাত পড়াশুনা করতাম।জীবন ও জগত সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারে নি।আমি যখন ৫ম শ্রেণীতে বৃত্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।তখন রচনা শিখেছিলাম ‘জীবনের লক্ষ্য হতে চাই বিজ্ঞানী’।আমাকে আমার বড় বোনেরা সাইনটিস্থ ও কালপন্ডিত বলে ডাকত।মাধ্যমিক স্কুল জীবনে অংক বিজ্ঞানের দৌরাত্মে সবাই মাতোয়ারা।অংক বিজ্ঞানে ভাল নম্বর পাওয়া মানে ৯ম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়া।আর বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হলেই ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী হওয়া যাবে এ ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া হত।গ্রামের লোকেরা এখনও সাইন্স পড়া মানে ডাক্তার /ইন্জিনিয়ার ছাড়া আর কিছুই বুঝে না।সঙ্গত কারণে আমাদেরও এ ধরনের লক্ষ্য ছিল।বিজ্ঞানী হওয়ার চিন্তাটা এখানে এসে কিছুটা লোপ পেয়ে যায়।ডাক্তার হওয়ার অদম্য বাসনায় ক্লাস নাইন-টেনে কুনোব্যাঙের ব্যবচ্ছেদ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম ঘরে বাইরে।আর ইন্জিনিয়ারিংয়ে আবছা আগ্রহে নিক্তির সাহায্যে বস্তুর ভর পরিমাপের এক্সপেরিমেন্টের কথা এখনও মনে আছে।এস এস সি তে যখন স্টার মার্কস পেলাম তখন মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হল বি সি এস দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হতে হবে।প্রশাসনের বড়কর্তা হতে হবে।এরকম একেক স্টেজে একেক লক্ষ্য সামনে আসত।
দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিকে ভাল ফলাফল থাকার পরও মেডিকেল এডমিশন টেস্ট দিতে পারিনি।যদিও এইচ এস সি ফল পরবর্তীসময় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে কাটিয়ে ছিলাম। এমনি তেঈ সেশনজট ছিল প্রায় ৩ বছর।তারপরও স্ভাভাবিক ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর আরও কিছুদিন (প্রায় ৫ বছর) বিশেষ কারণে ছাত্রজীবন টেনে-টুনে লম্বা করেছি।সেজন্য ল’ পড়েছি,বি এড ও এম বি এ তেও যেতে হয়েছে।১৯৯৮ সালে সাংবাদিকতার উপর প্রশিক্ষণ নিলেও সাংবাদিক হব এ ধারণা তখন জন্মে নি কিংবা সে ধরনের পরিকল্পনা করিনি।
আমার ভাবতে অবাক লাগে যে মেয়েটি আমার পেছনে বসে পরীক্ষা দিয়েছে,আমার চেয়ে নাম্বার যার কম ছিল সে আজ বিসিএস ক্যাডার হয়ে সরকারী কলেজের শিক্ষক,জেসমিন আমার পাশে বসে পরীক্ষা দিয়েছে,এত ভাল নয় তারপর সে ক্যারিয়ার গড়ে ফেলেছে।আমারই বন্ধু টেনে টুনে কোন রকম ল’পাস সে আজ নামকরা উকিল।বিএ থার্ড ডিভিশন,বি এল থার্ড ক্লাস আজ হাই কোর্টের এডভোকেট আমারই প্রিয় বন্ধু।
কেউ বা পুলিশের বড় কর্তা, কেউ বড় ব্যাংকার, কেউ প্রশাসনের পদস্থ আমলা।অথচ এদের চেয়ে আমার সার্টিফিকেট কখনও দূর্বল ছিল না।মেধা ওপ্রতিভাও কখনও পিছিয়ে ছিল না।
বাংলাদেশের সাবেক এক প্রধান বিচারপতি (প্রধান উপদেষ্ঠাও ছিলেন)তাঁর ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিনগুলি’ বই তে উল্লেখ করেছেন-বিধাতার কোন বিন্দুমাত্র কাজেও বিশাল মহত্ত্ব আছে।আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানে সে গুলো অনুধাবন করা যায় না।তিনি তাঁর জীবনের স্মৃতি টেনে বলেন,”আমি মাস্টার্সে চার নম্বর কম পাওয়ায় ১ম শ্রেণী পাইনি।ফলে সরকারী কলেজের শিক্ষক হতে পারি নি।তাই ভর্তি হই ল’তে।ল’পাস করলাম।আইনজীবি হয়ে আইন ব্যবসায় দক্ষতা অর্জন ও আর্থিক উপার্জন বেশ সময়সাপেক্ষ।এমতাবস্থায় চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকি।আমি রাজশাহী জেলা জজ আদালতে বেঞ্চ সহকারী পদে এপ্লাই করি।যথারীতি ইন্টারভিউ ফেস করি।জজ সাহেব আমাকে বললেন,আপনি মেধাবী ছাত্র।আজকের দরখাস্তকারীদের মধ্যে আপনি সেরা ও কোয়ালিফাইড।কিন্তু আপনাকে আমরা নিয়োগ দেব না।কারণ আপনি মেধাবী ,যে কোন সময় এই ছোট চাকুরী চলে যেতে পারেন।আমি অনেক অনুনয় বিনয় করলাম।বললাম চাকুরীটা আমার খুব প্রয়োজন।জজ সাহেব উল্টো আমাকে বললেন,হাই কোর্টে যান।ওখানে আপনি প্রাকটিস করুন।ভাল হবে।ব্যর্থ হয়ে ওকালতিতে অব্যর্থ প্রচেষ্টা শুরু করি।নিদারুণ কষ্ঠে জীবন যাপন করতে থাকি।পরবর্তীতে বিচারপতি,প্রধান বিচারপতি ও প্রধান উপদেষ্ঠা(সরকার প্রধান)হলাম।আমি ভাবতে পারি না,যদি মাস্টার্সে ১ম শ্রেণী পেতাম।তাহলে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারতাম না।আমার পরীক্ষা ভাল হয়েছিল।চার নম্বর কেন কম পেলাম তা আজো বুঝে উঠতে পারিনি।আসলে এ সবই আআল্লাহর ফায়সালা।‘
সে দিন বন্ধু মাসুদ সহ তার দোকানে বসে আছি।প্রবীণ সাংবাদিক শোয়েব ভাইয়ের সাথে দেখা।২৬ বছর আগে তিনি সাংবাদিকতা করতেন।চাকুরীর ভিন্নতার কারণে এখন আর এ পেশায় নেই।বড় কোম্পানীর মার্কেটিংয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তা তিনি।বিশাল অভিজ্ঞতা তাঁর।অনেক জ্ঞানবান,ভদ্র,মার্জিত ও আভিজাত্যের অধিকারী তিনি।তারঁ কাছ থেকে সেদিন অনেক কিছুই শিখেছি।তিনি তাঁর বন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন ‘অনেক লম্বা বেতনের চাকুরী।নিজে কিছু করো,ছোট হলেও।নিজের কাজে বরকত আছে।‘মাসুদ ভাই তাবলীগের কাজ করেন।কোন জায়গায় বসলেই শেষ দিকে দ্বীনের দাওয়াত দেন।কোন কুন্ঠাবোধ করেন না।সৎ সাহসী ও নামাজী লোক।শোয়েব ভাই বললেন,শরীরে যদিও দাঁড়ি টুপি ,পায়জামা পান্জাবী পরা নেই।কিন্তু সবসময় ভাল কাজ করার চেষ্ঠা করি।খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকি।আল্লাহর রহমতে বিগত ২৬ বছরে অসুস্থতার জন্য একটি প্যারাসিটামলও খাইনি।বছরের পর বছর চাকুরী করছি।১ টাকাও অবৈধভাবে কারো কাছ থেকে গ্রহণ করিনি। আসলে সমাজে এ ধরনের লোক আজ বড় প্রয়োজন।আমি ২০০৮ সালে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করি।শুরুতেই ডেভোলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করি।দেশী বিদেশী ,স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারী সংস্থায় জড়িত হই।আমার ই প্রচেষ্টায় আমার এলাকার কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নিবন্ধন কার্যক্রমসহ আইনগত সকল কার্যাবলী আমি সম্পন্ন করি।কিন্তু এ সকল প্রতিষ্ঠান থেকে আজ সু-কৌশলে আমাকে দূরে রাখা হয়েছে।২০১২ সালে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করে বাদ দেই।একটিমাত্র কারণ এগুলো আছে ভেবে।অথচ এক যুগ পর এখন বুঝলাম এগুলো আমার নয়।সে সময় আমার মেধাকে খাটানো হয়েছে।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক,দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি,সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
