রিমা বেগম পপি;–স্বপ্ন কখনও বাস্তব হয়, আর আবার কখনও কল্পনাই থেকে যায়। হাতে গুনা কয়েকটা স্বপ্নই সত্য হয়। কিন্তু এ কোন স্বপ্ন দেখল মাহি। যা এখন সে সত্যি করতে পারছে না। মাহি কলেজে পড়ে অনার্সে, বাবা-মা-ভাই বোন নিয়ে এক সুখের পরিবার মাহির। সারাদিন কাটত কলেজে, কোচিং আর বসন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে।
খুবই হাসি খুশিতে দিন কাটত মাহির। মাহির পাশের বাসায় একটা মেয়ে ছিল নাম সূচনা। সূচনা আই.এ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। তবে সূচনা এস.এস.সি পরীক্ষার পর থেকে বেশি পরিচিত হয় দুই পরিবারের মাঝে। যেহেতু একদম কাছাকাছি বাসা ছিল তাই দুজনই দুজনের বাড়িতে আসা যাওয়া করত। সূচনা যে মাহির ছোট তা তারা ভূলে গেল। একদম যেন বন্ধুর মত তাদের কর্থাবার্তা। কে বড় কে ছোট কেউই তা পাত্তা দেয় না। দুজনই দুজনকে নাম ধরে ডাকত। মাহি সব সময় সূচনাকে রাগাতো। বলতো তোর নামের অর্থ হলো তুই কিছু শুরু করছিস। আরে বল না কি তুই শুরু করতে যাচ্ছিস। মাহির মা কিছু নতুন রান্না শিখলে সূচনাকে ডেকে খাওয়াতেন। তেমনি সূচনার মাও ছিলেন। মাহি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবার সময় সূচনাকেও সঙ্গে নিত। দিনে প্রায় পাঁচ-ছয় বার তাদের দেখা হতো ঝগড়া হতো। একদিন মাহির বাসায় মাহির কিছু বন্ধু এলো। সূচনা তখন মাহির সাথেই ছিল।
মাহি ও তার বন্ধুরা পড়তে বসে গেল আর সূচনা তখন মাহির মার সাথে গল্প করছে। মাহির এক বন্ধু রাহাত মাহিকে বলল, এই মাহি তুই কি সূচনাকে ভালবাসিস। তখন মাহি ক্ষেপে বলল, পাগল না কি ওকে আমি ভালবাসবো। কি দুষ্ট একটা মেয়ে। রাহাত শুন সূচনা আমার ভালো বন্ধু এর চেয়ে বেশি কিছু না বুঝলি। তখন রাহাত বলল মাহি তাহলে আমাকে একটু সাহায্য করস না বন্ধু।
সূচনাকে আমার ভালো লাগে ওকে আমি ভালবেসে ফেলেছি। প্লিজ, বন্ধু আমার হয়ে ওকে প্রস্তাবটা দেয় না, দেখ কি বলে সূচনা। আরে বাবা আমি এসবে নেই মাহি বলল। তখন রাহাত বলল ঠিক আছে সূচনা মোবাইল নাম্বারটা দে, মাহি বলল সূচনা মোবাইল ব্যবহার করে না। ওতো সারাদিন আমার সাথেই থাকে। ঠিক আছে তুই কাল আমার মোবাইলে ফোন দিস আমি ওর সাথে কথা বলিয়ে দেব।
পরের দিন রাহাত মাহির মোবাইলে ফোন করল, মাহি সূচনাকে মোবাইলটা ধরতে বলে চলে গেল। তখন সূচনা বলল, হ্যালো মাহিতো একটু বাইরে গেছে। তখন রাহাত বলল আমি মাহিকে নয় তোমাকে চাই সূচনা। রাহাতের কথা শুনে সূচনা চমকে উঠল। শেষে রাহাতকে বলল মাহি এলে আপনাকে ফোন দেবে এখন রাখি বলে ফোনটা কেটে দিল। ফোন কাটলে কি হবে সূচনার কথাতো, রাহাতের মনে গেঁথে গেছে। রাহাত যে করেই হোক সূচনাকে বিয়ে করতে চায়। মাহির ঘরে এলেই মাহিকে সূচনার কথা জিজ্ঞাসা করে রাহাত। মাহি এখন কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। রাহাত সূচনার প্রতি দূর্বল হওয়াতে মাহি যেন কিছুটা হিংসা করছে।
রাহাত সূচনাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালো। সূচনার মা-বাবা রাজি হয়ে গেলেন। আর সূচনাকে জিজ্ঞাসা করলেন ওম মত আছে কিনা। বিয়ের পর রাহাত সূচনাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাবে। সূচনা যেহেুত কাউকে পছন্দ করে না তাই সূচনাও রাজি হয়ে গেল। সূচনার বিয়ের জন্য সূচনা এখন আর তেমন মাহিদের বাড়িতে আসে না। খুবই কম দেখা হয় তাদের। সূচনা ও মাহির মনটা খুবই অস্থির। দুজন এর মনেই যেন একটা অশান্তি। কিছুই বুঝতে পারছে না তারা। কি এক শূন্যতা যেন তাদের মাঝে কাজ করছে। আজ বাদে কাল সূচনার বিয়ে। মাহির চিন্তায় শুধু সূচনা। এক সঙ্গে কত মজা করেছে বেড়াতে গিয়েছে। কত ঝগড়া সবকিছুই যেন মাহির চোখের সামনে ভাসছে। ঠিক তেমনি সূচনাও। আজ সূচনার গায়ে হলুদ। সবাই কত মজা করছে।
অথচ মাহি মনমরা হয়ে বসে আছে। মনে মনে ভাবছে যে, কেন সূচনার জন্য এত অশান্তি তার। সূচনার বিয়ে। কনেকে নিয়ে সবাই পার্লারে চলে গেলেন। মাহি ওদের পার্লারে ছেড়ে আসলো। যখন কনে সেজে লাল শাড়ি পড়ে মাথায় টিকলি দিয়ে সূচনা সেন্টারে আসলো। মাহির মনের ভেতর প্রচন্ড ঝড় বইতে লাগল। সূচনাও মাহির দিকে তাকালো। এদিকে রাহাতও এসে গেল সেন্টারে মাহিকে রাহাত বলল যে, যা না দোস্ত তোর মোবাইলে সূচনার একটা ছবি তুলে আন। দেখি আমার রাজল²ীকে কেমন লাগছে। এ কথা শোনার পর মাহি সূচনার কাছে যায়। সূচনার ছবি তুলে। আর মনে মনে চিন্তা করে এইতো কয়েকদিন আগে সূচনা মাহির সাথে কত ঝগড়া করেছে। তখন মাহি বুঝতে পারে নি সূচনা এতো বড় হয়ে গেছে। সেলোয়ার কামিজ পড়ে কি ছোট্টা টাইনা লাগতো, অথচ আজ লাল শাড়িতে যেন তাকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। মাহির চোখের কোণে এ চিলটি পানি দেখা গেল, তারপর মাহি রাহাতের কাছে ছুটে গিয়ে সূচনার ছবি দেখালো। ছবি দেখে সেকি অপরূপ রূপের বর্ণনা দিচ্ছে রাহাত মাহির কাছে। তারপর কাজী সাহেব এসে ওদের বিয়ে পড়াতে লাগলেন।
সূচনা কবুল বলার পর মাহির হৃদয়টা যেন ভেঙে গেল। এখন মানি বুঝতে পারছে সূচনাকে সে ভালবাসে। সূচনার জন্য এতোদিন সে মনমরা হয়ে বসেছিল। কিন্তু যখন মাহি বুঝতে পারল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তখন সূচনা তার বন্ধুর স্ত্রী হয়ে গেছে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রাহাতও কবুল বলে সূচনার হয়ে গেল। মাহির চোখের জল আর ধরে রাখতে পারছে না। মাহি বাথরুমে গিয়ে কাঁদতে লাগল। মনে মনে চিন্তা করল সূচনাতো অনকে বছর আগ থেকে আমাকে চেনে। আমিও তাকে চিনি। তবে কেন বুঝতে পারলাম না যে আমি সূচনাকে ভালবাসি। আসলে মানুষ কাছে থাকলে তার মর্ম বুঝতে পারি না। দূরে চলে গেলেই বুঝতে পারি।
আমি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এই ভেবে মাহি মুখ ধুয়ে সবার সামনে চলে এলো।
সূচনা বুঝতে পারলো মাহির কিছু হয়েছে। কিন্তু এতো ভিড়ে কি করে মাহির সাথে কথা বলবে। যখন দেখল মাহি কাঁদছে তখন আর সূচনা বসে থাকতে পারলো না। উঠে বাথরুমে যাবার কথা বলে মাহির কাছে গেল। মাহি বলল, সূচনা আমি হেরে গেছি। নিজের সাথে আর যুদ্ধ করতে পারছি না। সূচনা বলল কি হয়েছে মাহি আমাকে বলল। মাহি বলল সূচনা আমি তোমাকে ভালবাসি। অনেক ভালবাসি।
সূচনা এ কথা শোনার পর মাটিতে বসে পড়ে। চোখের সামনে পুরনো সব ম্মৃতি ভেসে উঠে তার। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কেন এ কথা আমাকে আরো আগে বললে না? আর যখন এতদিন বলোনি তাহলে আজ কেন বলতে গেলে শেষ মুহুর্তে। মনের ভেতর অনেক কষ্ট নিয়ে সূচনা চলে গেল। তারপর কনে বিদায় হলো। অথচ মাহিকে একবারও দেখা গেল না।
সূচনা আপনজন ছেড়ে যাবার কষ্ট একদিকে, আর অন্যদিকে মাহিকে ভূলে যাবে কি করে। যাবার আগে সূচনা মাহিকে দেখতে চায়। কিন্তু মাহি এলো না। কনের গাড়ি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। আর মাহি তখন জমাট বাঁধা কষ্ট নিয়ে অনেক দূর থেকে সূচনাকে দেখল।
মাহি বাসায় এলো। কিন্তু কি করবে এখন সে? চারিদিকে সূচনার দেওয়া স্মৃতি, যেদিকে তাকায় শুধু সূচনার কথা মনে পড়ে। মাহির না পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা। সূচনা। দুই নদীর মাঝখানে। কি করতে পারত সে সময় সূচনা? বিয়েতো হয়ে গেছে।
সূচনার মনেও মাহিকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল, কিন্তু প্রকাশ করতে পারে নি। আর মাহি প্রকাশ না করেও দুঃখ পেয়েছে আর যখন প্রকাশ করেছে তখন আর বেশি কষ্ট তাকে আকড়ে ধরেছে। আসলে এই জীবন যখন কেউ কাছে থাকে আমরা থাকে নিয়ে ভাবি না।
যখন দূরে চলে যায় তখন আর ভাবনার শেষ থাকে না। সূচনা কি সুখি হবে রাহাতকে নিয়ে? আর যদি সুখি হয় তাহলে কি মাহিকে ভূলতে পারবে? এরই নাম ভালবাসা। একটু একটু করে মনের বাসা বাঁধে।
