৪৭-এ ভারতের স্বার্থে ভাগবাটোয়ারা, ইতিহাস চর্চার তাগিদ মাহমুদুর রহমানের

by News Room

দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় ভারতের স্বার্থে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। তিনি শনিবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স আয়োজিত ‘সিলেট গণভোট ও মুসলিম ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। ড. রহমান উল্লেখ করেন, করিমগঞ্জকে তখনকার সময়ে শতকরা ষাট ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে সিলেটের সাথে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায়। তিনি আরও বলেন, বামপন্থিরা ঐতিহাসিকভাবে ভারতের দালাল এবং ১৯৪৭ সাল থেকেই বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতিবিদরা বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান বামপন্থীরাও বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারা সবাই ভারতের দালাল।

ড. মাহমুদুর রহমান নিজেকে বাঙালি ও মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেন এবং বলেন, মুসলমান তার ধর্ম ও গোষ্ঠিগতভাবে তিনি বাঙালি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাঙালি ও মুসলমানদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, বাঙালি মুসলমানের এই পরিচয়টি সাহসিকতার সাথে প্রতিষ্ঠা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, এই ব্যর্থতার কারণ অনেক দীর্ঘ এবং সে বিষয়ে অন্য দিন আলোচনা করবেন। তিনি তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, স্বাধীনতা ঠিকিয়ে রাখতে হলে সাংস্কৃতিকভাবে জিততে হবে। তিনি দাবি করেন, স্বাধীনতার পর থেকেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে এবং এর মোকাবেলার একমাত্র উপায় ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে ইতিহাস চর্চা করা। তিনি কায় কাউসকে ইতিহাস চর্চার সঠিক কাজ করে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন। ড. রহমান সিলেটের পূর্বপুরুষদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, যারা গণভোটে ভোট দিয়ে সিলেটকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তাদের প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, পাকিস্তানে না আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হতো না।

তিনি ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার সম্পর্কে বলেন, তাকে শীর্ষ ইতিহাসবিদ ধরা হলেও তিনি ছিলেন আপাদমস্তক ইসলামবিদ্বেষী। ড. রহমানের মতে, মজুমদার মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা লিখে তাদের খাটো করার চেষ্টা করেছেন এবং সেই ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, হিন্দু ও ব্রিটিশদের তুলনায় মুসলমানরা ইতিহাস চর্চায় পিছিয়ে রয়েছেন। তাই তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে এবং ইতিহাস চর্চা বাড়াতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতা ধরে রাখতে হলে নিজেদের ইতিহাস নিজেদেরই লিখতে হবে। ইতিহাস চর্চাকে তিনি বাঙালি মুসলমানের পরিচয় ও স্বাধীনতা রক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। ড. রহমান আরও বলেন, সেকুলাররা বাঙালি ও মুসলমানদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে বিরোধ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে বাঙালি মুসলমানদের পরিচয় সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বাঙালি মুসলমানদের রেনেসাঁর জন্য সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান।

তিনি পুনরায় সিলেটের পূর্বপুরুষদের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শ্রদ্ধা জানান এবং বলেন, ইতিহাস নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখার সুযোগ নেই; ইতিহাস সাহিত্য নয়। সাহিত্যে মনের মাধুরী মেশানো যায়, কিন্তু ইতিহাসে তা চলে না। তাই আমাদের ইতিহাস আমাদেরকেই লিখতে হবে। ড. রহমান ভারতের আরও দুটি অন্যায়ের কথা উল্লেখ করেন: প্রথমত, গুরুদাসপুরকে পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতকে দেওয়া, যা পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিল। তার মতে, গুরুদাসপুর পাকিস্তানকে দিলে কাশ্মীর ইস্যু স্বাধীন হয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, করিমগঞ্জকে পাকিস্তানকে না দেওয়া। তিনি দাবি করেন, ভারতের স্বার্থেই করিমগঞ্জ পাকিস্তানকে দেওয়া হয়নি। তিনি স্বদেশী আন্দোলনকে মূলত মুসলমানবিরোধী আখ্যা দেন এবং বলেন, সেকুলার মিডিয়ার ভয়ে ও মৌলবাদী বা হিন্দুবিদ্বেষী বলা হবে এই আশঙ্কায় এই ইতিহাসের চর্চা কম হয়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনাকে বাংলার বিরোধিতা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন কলকাতার বাবুরা সবসময় নিজেদের স্বার্থ দেখেছে, নিজেদের সংস্কৃতি মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সেটা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ড. রহমান বলেন, আজ থেকে হাজার বছর আগে বাংলা নামে কোনো অঞ্চল ছিল না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ছিল। বাংলার গঠনকারী হিসেবে মুসলিম শাসক শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ও বাদশাহ আকবরের কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, হিন্দুরা হাজার বছরেও বাংলা গঠন করতে পারেনি, যেমন নিহার রঞ্জন রায় বলেছেন। তাই আবহমান বাংলার ধারণা খুঁজতে হলে মুসলমানদের কাছ থেকে শিখতে হবে। কলকাতা থেকে বাংলার ধারণা ধার করে আনার প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর মোহাম্মাদ আবু তাহেরের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন লেখক-গবেষক ডা. ফাহমিদ-উর-রহমান। তিনি বলেন, ইতিহাসে সিলেট গণভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসকে খণ্ড খণ্ড না দেখে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। তার মতে, সিলেট গণভোট ইতিহাস থেকে হারিয়ে গিয়েছিল এবং কায় কাউস তা তুলে ধরেছেন। জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে দাঁড় করাতে নিজেদের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ডা. রহমান দাবি করেন, দ্বিজাতি তত্ত্বের ধারণা আসলে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার থেকে এসেছে, অথচ এর দোষ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর উপর চাপানো হয়। তিনি বলেন, এখনও কলকাতার আধিপত্যবাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি এবং নিজেদের ইতিহাস চর্চা না করলে এর থেকে বেরুনো যাবে না। কলকাতার বয়ানই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি আরও বলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে জাতি গঠিত হবে না। ১৯৪৭ সালকে বৈধতা দিতে হবে এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ২৩ বছরের ইতিহাসকে ইতিহাস না বলে ফিকশন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, এই ফিকশন থেকে মুক্তির প্রয়োজন এবং ঢাকা হবে নতুন রেনেসাঁর কেন্দ্র।

বিশেষ অতিথি হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৪৭ সালকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলা বইয়ে পরিকল্পিতভাবে শেখানো হয় ‘দেশভাগ’, অথচ তা দেশভাগ ছিল না, ভারত থেকে ভাগ হওয়াও নয়, বরং তা ছিল নিজেদের ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা। তার মতে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা অনিবার্য ছিল এবং সেটাই প্রকৃত ইতিহাস। ১৯৪৭ না হলে ১৯৭১ হতো না। তিনি সিলেট গণভোটকে একটি ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, ষড়যন্ত্র করেই করিমগঞ্জ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ড. ইসলাম বলেন, মুসলমানরা ভারত ভাগ চায়নি, বরং ভারত প্রতিষ্ঠা ও শাসন করেছে। অথচ আওয়ামী লীগের বর্ণনা অনুযায়ী শেখানো হয় মুসলমানরাই ভারত ভাগের জন্য দায়ী। তিনি উল্লেখ করেন ভারতীয় লেখকরাও বলেছেন হিন্দুরাই ভারত ভাগ চেয়েছিল।

সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ও বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ডা. রাবেয়া খাতুন, শিক্ষাবিদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ এবং সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আলোকিত সিলেটের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক গোলজার আহমদ হেলাল। সেমিনারে কায় কাউস রচিত ‘ইতিহাসের ছিন্নপত্র/ঐতিহাসিক সিলেট গণভোট : পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সংগ্রাম’ শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। দোয়া পরিচালনা করেন ইবনে সিনা হাসপাতাল সিলেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাওলানা হাবিবুর রহমান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন।

উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক সিলেট গণভোটের ৭৮তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স এই “সিলেট গণভোট : মুসলিম ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদীদের আলোকে” শীর্ষক সেমিনার ও কায় কাউসের ঐতিহাসিক সিলেট গণভোট পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সংগ্রাম স্মরণিকার প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

You may also like

Leave a Comment