১৯৭১ থেকে বর্তমান

by News Room

এবনে গোলাম সামাদ:মানুষ ভুল করে। তার ভুল করার একটি কারণ হলো, খণ্ডিত সত্যকে অখণ্ড করে দেখা। আরেক কথায়, সামগ্রিক সত্যকে জানতে না পারা। ১৯৭১-এর ইতিহাস সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না। যা জানি, তাকে এখনো বলা চলে না প্রতুল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমি ছিলাম কলকাতায়। এ সময় পাক-ভারত যুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছুটা আলোচনার সুযোগ হয়েছিল বগুড়ার খ্যাতনামা ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের সাথে। তিনিও এ সময় আমারই মতো অবস্থান করছিলেন কলকাতা শহরে। গাজীউল হক বললেন, পাক সেনারা হারল। কেননা, তারা পেতে পারেনি দেশবাসীর সমর্থন। অন্য দিকে ভারতীয় সৈন্যরা জিতল। এর কারণ, বাংলাদেশের বিরাটসংখ্যক মানুষ দিয়েছে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা। যুদ্ধে জেতা বা হারা বহুলভাবে নির্ভর করে শত্রু-সৈন্য কোথায় কিভাবে অবস্থান করছে, সে সম্বন্ধে সংবাদ জ্ঞাত হওয়ার ওপর। বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় সৈন্যদের দিয়েছে এই সংবাদ। কিন্তু পাক বাহিনী থেকেছে ভারতীয় সৈন্যের অবস্থান সম্পর্কে বিশেষভাবে সংবাদবিহীন হয়ে, যা যুদ্ধের জয় পরাজয়কে করেছে নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশে আসলে কোনো উন্নত রণকৌশল দেখাতে সম হয়নি। যুদ্ধ হয়েছে কার্যত অতিপরিচিত গতানুগতিক ধারায়।
আমি অবশ্য এ সময় ভাবছিলাম এবং এখনো ভাবি অনেকটা ভিন্নভাবে। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, যুদ্ধটা আসলে শেষ হলো না। স্থগিত হলো মাত্র। ভবিষ্যতে আরো যুদ্ধ হতে পারে। যুদ্ধ স্থগিত হওয়ার একটা প্রধান কারণ হলো, ভারতের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড সামরিক চাপ। যাকে কোনোভাবেই প্রতিরোধ করার মতা ভারতের তখন ছিল না। ভিয়েতনাম উপসাগর থেকে মার্কিন নৌবহর এসে পৌঁছেছিল চট্টগ্রামের উপকূলে; যাতে ছিল ডেস্ট্রয়ার। আর ছিল পরমাণু শক্তিচালিত বিমান ও মেরিনবাহী বিখ্যাত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজ’। এ সময় ভারতের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশেষ চুক্তি ছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী শেষ পর্যন্ত সামরিক দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ভরসা রাখতে সম হতে পারেননি। থামিয়েছিলেন যুদ্ধ। এটা হলো ১৯৭১-এর যুদ্ধের নেপথ্যকাহিনী, যা নিয়ে এখন যথেষ্ট আলোচনা করা হয় না। আর তাই ১৯৭১-এর যুদ্ধের প্রকৃত চেহারা থেকে যেতে চায় আমাদের কাছে কুয়াশাঢাকা হয়ে। মনে হয়, যুদ্ধ কেবল হয়েছিল পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে। কিন্তু এই যুদ্ধকে বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা হয় না সে সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির পটভূমিতে। সেটা ছিল ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। সোভিয়েত ইউনিয়ন চাচ্ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল এর ঘোরবিরোধী। এ ছাড়া ১৯৫৪ সালের ১৯ মে স্বারিত হয়েছিল পাক-মার্কিন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি। পেশোয়ারের কাছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল পাকিস্তান। এর বিনিময়ে সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ৪০ হাজার সৈন্যের ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয়েছিল। সেই থেকেই পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে উঠতে থাকে আরো নানাভাবে সামরিক সহযোগিতা। ১৯৭১ সালে তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়েছিলেন খুবই শক্তিশালী নৌবহর। ভারত নৌশক্তিতে ছিল খুবই দুর্বল। ভারতের সমুদ্র সৈকত হলো প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার। এই সৈকত এখনো যথেষ্ট সুরতি নয়। ভারতকে তাই থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল যুদ্ধে। ১৯৭১-এর যুদ্ধের ইতিহাসে এটা হলো একটি বিশেষ উল্লেখ্য ঘটনা। কিন্তু এই বিষয়ে এখন যথেষ্ট আলোচনা করা হয় না।
১৯৭১-এর ইতিহাস পড়লে মনে হয়, সব কিছু ঘটেছিল ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইচ্ছায়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তা ছিল না। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতকে পড়তে হতো দারুণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে। এটাও ছিল দ্রুত যুদ্ধবিরতি হওয়ার একটি বিশেষ কারণ। শোনা যায়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চালানোর জন্য ভারত সরকারকে নাকি করতে হয়েছিল ৭০০ কোটি ভারতীয় মুদ্রার ঘাটতি ব্যয়। অর্থাৎ এই পরিমাণ মুদ্রা ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপিয়ে খরচ করতে হয়েছিল। এর প্রভাব ভারতীয় মুদ্রানীতিতে হতে পেরেছিল খুবই তিকর। ভারত অবশ্য এই তি পুষিয়ে নিতে চেয়েছিল বাংলাদেশের ওপর থেকে। যুদ্ধ শেষ হতে-না-হতেই ১৯৭২ সালের ১০ মে ভারত বাংলাদেশকে বাধ্য করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অবাধ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চালু করতে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যায় প্রচুর সম্পদ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বাণিজ্য সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় ৯ অক্টোবর ১৯৭২। কারণ বাংলাদেশ থেকে উঠতে থাকে এর বিপে বিশেষ প্রতিবাদ। ভারত এর পরেও চায় বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রিত করতে। ফলে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে এক বিরাট দুর্ভি। এতে মারা যায় কম করে ৬৫ হাজার লোক। ইংরেজ আমলে দুর্ভি প্রধানত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে; উত্তরবঙ্গে নয়। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর দুর্ভি ঘটেছিল উত্তরবঙ্গে। তার নজির ইতঃপূর্বে আর পাওয়া যায় না। ১৯৭১-এর যুদ্ধের সাথে ১৯৭৪-এর দুর্ভি থেকেছে বিশেষভাবেই গ্রথিত। কিন্তু এই ঘটনাও এখন আলোচিত নয়। এখনো চলেছে কেবলই সাবেক পাকিস্তান আমলের শোষণবঞ্চনার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা। এটাকে এখন আর কোনোভাবেই বান্তর মনে হয় না। সাবেক পাকিস্তান আমলে আর যা-ই হোক এত বড় দুর্ভি হয়নি।
১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এস অরোরার কাছে। কিন্তু এই আত্মসমর্পণ একেবারেই শর্তহীন ছিল বলে মনে হয় না। কেননা ভারত বন্দী করেছিল প্রায় ৫৩ হাজার সৈন্যকে। এই বন্দী সৈন্যদের বাংলাদেশে না রেখে অতি দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। ১৯৭২ সালে ৩ জুলাই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে স্বারিত হয় বিখ্যাত ‘সিমলা চুক্তি’। ওই চুক্তি অনুসারে বিনা বিচারে এসব বন্দীকে দেয়া হয় মুক্তি। বাংলাদেশ করতে পারে না পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। আসলে বাংলাদেশকে সিমলা সম্মেলনে ডাকাই হয়নি। ওই সম্মেলনে দর্শক হিসেবেও বাংলাদেশের প থেকে ছিলেন না কেউ উপস্থিত। সিমলা থেকে গিয়ে যে যুক্ত ইশতেহার প্রকাশ করা হয়, তাতে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ করা হয়েছে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার এর কোনো প্রতিবাদ করেনি। কেন করেনি সেটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখনো রয়েছে বিশেষভাবে অজ্ঞাত। এটা নিয়েও আলোচনাকে এখন যাওয়া হচ্ছে পত্রপত্রিকায় বিশেষভাবে এড়িয়ে। সিমলা চুক্তি নিয়ে কেউ কোনো বই লিখেছেন বলেও আমি জানি না। বাংলাদেশের কোনো সরকারই এ পর্যন্ত উঠায়নি পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ; যদিও বলা হয়, পাকবাহিনী ১৯৭১-এর যুদ্ধের সময় করেছিল ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী অপরাধ।
অনেক কথাই শুনেছিলাম ১৯৭১-এর যুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পরে। শুনেছিলাম, ভারতের শিখ সেনাপতি জগজিত সিং অরোরা নাকি হয়ে উঠেছিলেন শিখ খালিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। তিনি বাংলাদেশের মতোই নাকি গড়তে চান স্বাধীন শিখ খালিস্তান। এ কথা কত দূর সত্য, তা জানি না। গুজবটা যথেষ্ট রটেছিল। তাই কথাটা বলছি। যে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন, তিনি কঠোরহস্তে দমন করেন শিখদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে। এ জন্য প্রাণ যায় বহু শিখ মুক্তিযোদ্ধার। আর শিখদের হাতে ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী খুন হন দিল্লিতে। একটি বিষয় আমার কাছে খুবই অদ্ভুত লাগে। তা হলো, ১৯৭১-এ যে তিনজন নায়ক বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন (এরা হলেনÑ শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টো) এই তিনজনের কারোই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজিব গান্ধীরও মৃত্যু হয়েছে ঘাতকের হাতে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে বেনজির ভুট্টোর মৃত্যু হয়েছে ঘাতকের হাতে। জানি না, এ রকম মৃত্যু আরো ঘটবে কি না। রাজনীতিতে ঘাতকের হাতে মৃত্যু আশ্চর্যজনক কিছু নয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ পর্যন্ত চারজন প্রেসিডেন্ট মারা গিয়েছেন ঘাতকের হাতে। গ্রেট ব্রিটেনে কোনো প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হয়নি ঘাতকের হাতে। এর কারণ, বিলাতে রয়েছে উদার পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র। বাংলাদেশে অনেকে বলছেন, আগে উন্নয়ন না আগে গণতন্ত্র। কিন্তু উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী নয়। তা যদি হতো, তবে ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলো এত উন্নত কখনোই হতো না।
১৯৭১-এর পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী এক নয়। ১৯৭১-এর পৃথিবী ছিল প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের শীর্ষে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আরেক ভাগের শীর্ষে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে তার অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতির কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এর জন্য খরচ করতে হয়নি একটি গুলিও। কিন্তু এখন বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা শোনা যাচ্ছে অনেকের মুখে; যদিও বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বলবৎ আছে (যত দূর জানি) স্ট্যাটাস অব ফোর্স এগ্রিমেন্ট। যার বলে যেকোনোসংখ্যক মার্কিন সৈন্য বাংলাদেশে আসতে পারবেন যেকোনো সময় ভিসা ছাড়াই। জানি না, এখন কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এতটা সমালোচনা উঠতে পারছে। আমরা এখন আর ১৯৭১-এর রাজনৈতিক বিশ্বে বাস করছি না। রাজনৈতিক দিক থেকে এখন এসে দাঁড়িয়েছি একটি প্রায় ভিন্ন পৃথিবীতে। এর কথা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়েই নির্ধারিত হতে হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি।
যখন এই লেখা আমি লিখছিলাম, তখন ১৬ ডিসেম্বর উপলে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল একটি ছাত্রমিছিল। তারা গান গাইছিল, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’। এই গানটি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে কলকাতায়। গানটি রচিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রচার দফতর থেকে। এই গানের সাথে আমাদের কোনো ঐতিহাসিক যোগাযোগ ছিল না। ১৯৭১-এ বাংলাদেশে একটি গান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেটা হলোÑ ‘জয়বাংলা বাংলার জয়’। এই গানটির রচক ছিলেন বাংলাদেশেরই একজন। আর গানটি রচিত হয়েছিল ঢাকায়। কিন্তু এই গানটি এখন আর আগের মতো গীত হয় না। আমি মনে করি, আমাদের দেশে আমাদের তৈরি করা গানই অধিক গীত হওয়া উচিত। বাংলাদেশ হওয়ার পরপরই একটি গান রচিত হয়েছিল, যার প্রথম স্তবক ছিল এ রকমÑ
এই পদ্মা এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে
আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়
এ আমার দেশ এ আমার প্রেম…
কত আনন্দ বেদনা মিলন বিরহ সঙ্কটে।
গানটি আমার ভালো লেগেছিল। গানটির রচক ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। তার সঙ্গীত রচনায় ছিল বিশেষ দতা। কিন্তু এই গানও আর বিশেষ গীত হয় না। কোনো রাজনীতিশাস্ত্রবিদ বলেছেন, কোনো দেশের গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনার আগে কারা সে দেশের দেশপ্রেম নিয়ে গান রচনা করছে, ভাবতে হবে তাদের নিয়ে। কারণ তারাই সৃষ্টি করে চলে একটা জাতির মনমানসিকতা।
বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা আন্দাজ করা সহজ নয়। বাংলাদেশের দুটো বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই দু’টি দলই হলো মতার অভিলাষী। কিন্তু দু’টি দলের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য কিছুটা আছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, আগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও তার পরে হলো উদার গণতন্ত্র। কিন্তু বিএনপি উদার গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পরস্পরের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করে না। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে বাঙালি জাতীয়তাবাদে। অন্য দিকে, বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে। এই দুই জাতীয়তাবাদের ব্যঞ্জনা এক নয়। জাতি শেষ পর্যন্ত একটি মানসিক বাস্তবতা যার ভিত্তি হলো মানুষের মনোভাব (Psychological make-up)। বাংলা যাদের মাতৃভাষা, তাদের প্রায় ৬০ ভাগ থাকে বর্তমান বাংলাদেশে। আর বাদবাকি শতকরা ৪০ ভাগ থাকে ভারতে। বাংলাদেশের বাংলাভাষীদের মনমানসিকতা আর পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের মনমানসিকতা ঠিক এক খাতে প্রবহমান নয়। বর্তমানে পশ্চিমবাংলায় হিন্দিবিরোধী মনোভাবের উদ্ভব হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে যে, পশ্চিমবঙ্গ ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা পৃথক ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাচ্ছে, তা বলা যায় না। ভাষা অবশ্যই জাতিসত্তার অন্যতম মূল উপাদান, কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়। এক একটি জাতি গড়ে ওঠে ইতিহাসের ধারায়, নানা ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। আমরাও গড়ে উঠছি।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

উৎসঃ   নয়া দিগন্ত

 

You may also like

Leave a Comment