আলমগীর মানিক: সিএইচটি কমিশন বিতর্কে আবারো উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করা অর্গানাইজেশন আর্ন্তজাতিক বিষয়ক কমিশন সংক্ষেপে সিএইচটি কমিশনের সদস্যদের সফরকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এক সপ্তাহের সফরে এলেও মাত্র তিনদিনের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে এসে ব্যাপক হামলার শিকার হয়ে ফিরে যাওয়ার পাশাপাশি জন্ম দিলেন আরো একটি উত্তপ্ত দিনের।
সিএইচটি কমিশন পার্বত্য এলাকায় সফর বার বার সমস্যা সৃষ্টি করলেও এই সংস্থাটি সেটি অনুধাবন না করে অনেকটা একগুয়েমি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এবারো খালি হাতে ফিরতে হলো। সঙ্গে নিয়ে গেলেন একরাশ তিক্ততা। তবে এই সফরের মাধ্যমে তাদের সফলতা অর্জন না হলেও এখানে অধিকতর সফলতা পেয়েছে এখানকার বিভিন্ন সময়ে বিভক্তিতে থাকা বাঙালি সংগঠনগুলো।
এবারই প্রথম একটি অভিন্ন সুরে একই কাতারে এসে এখানকার বাঙালি সংগঠনগুলো ‘বিতর্কিত’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ সিএইচটি কমিশনকে ঠেকাতে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে একজোট হলো এবং তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত অর্জনে সফলতা লাভ করলো, এমনটাই ধারণা বাঙালি সংগঠনগুলোর।
এই সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, সিএইচটি কমিশন, ইটসেলফ, ইজ অ্যাকুইজড। তারা নিজেরাই আসামি। তারা আসার পরপরই উত্তপ্ত হয়ে উঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সিএইচটি কমিশনের আগমন ও এই কমিশনের করণীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পাহাড়ি বাঙালি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতেও রয়েছে ভিন্নতা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সফররত সিএইচটি কমিশন সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন রাঙামাটি জেলার সংসদ সদস্য ও জেএসএস নেতা শ্রী উষাতন তালুকদার।
তিনি বলেন, উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদি হামলাকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। ন্যাক্কারজনক এই হামলার ঘটনায় প্রশাসনের ব্যর্থতা ছিল উল্লেখ করে তিনি সিএইচটি কমিশনের সদস্যদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
অন্যদিকে, পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলনের রাঙামাটি জেলার শীর্ষ নেতা পেয়ার আহম্মদ বলেন, সিএইচটি কমিশন এলে এই পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সম্প্রদায়ের হয়ে কাজ করে আসছে এবং এখানে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। যার ফলে এখানে বাঙালিরা এই কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।
এ সময় তিনি উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন রাঙামাটির বাঘাইহাটের সহিংস ঘটনাকে। তিনি দাবি করেন, এই সহিংস ঘটনা ঘটার পেছনে আজকের সিএইচটি কমিশনের হাত রয়েছে এবং সেটা তাদের দ্বারাই সংগঠিত। এছাড়াও এই কমিশন যতবারই পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে ঠিক ততবারই এখানে বিভিন্ন এলাকায় শান্তিপ্রিয় পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ জুলাইয়ের একটি অনাকাঙ্ক্ষত ঘটনার আবারো জন্ম হলো।
এদিকে বাঙালি সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলনের রাঙামাটি জেলার সভাপতি আল আমিন ইমরান দাবি করেন, একটি মহলের হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে এখানে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে সিএইচটি কমিশন। এই কমিশন এর আগেও এখানে এসে বিভিন্ন সময় বিতর্কিত রিপোর্ট প্রকাশ করে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিদের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠনের একটি অপচেষ্টা চালিয়েছে। তাই এই কমিশনকে এবারে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উপযুক্ত জবাব দিয়ে একেবারে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে এখানকার অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠী।
এদিকে বাঙালি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন দাবি করেন, এবারে রাঙামাটিতে সিএইচটি কমিশনের আসার লক্ষণ যে ভালো ছিল না এটা তাদের কর্মকাণ্ড দেখলেই বুঝা যায়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সুলতানা কামাল, টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান এর মতো লোকেরা যারা নিজেদেরকে সুশীল সমাজ তথা মানবাধিকার কর্মী দাবি করেন, তারা কিভাবে দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি জেলার প্রশাসন যন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলাপ আলোচনা না করে রাতের অন্ধকারে রাঙামাটি প্রবেশ করলেন ?
এ থেকেই বুঝা যায় এই পার্বত্য বিষয়ক তথাকথিত আর্ন্তজাতিক কমিশন এর আসল উদ্দেশ্য কি? তারা আসলে এখানে বাঙালি ও পাহাড়িদের সুহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান চান না। তারা একটি কুচক্রিমহলের ভাড়াটে হয়ে কাজ করছেন।
অন্যদিকে পাহাড়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে, পার্বত্য বিষয়ক আর্ন্তজাতিক কমিশন। এই কমিশনের কর্মকাণ্ডে এখানকার পাহাড়ি-বাঙালি উভয় পক্ষই লাভবান হবে বলে মনে করেন এখানকার পাহাড়ি সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
তারা মনে করেন, পার্বত্য কমিশন একটি পক্ষের হয়ে কাজ করছে এমন অভিযোগ বিশেষ একটি মহল এখানকার বাঙালিদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে তাই তারা ভূল বুঝে পার্বত্য কমিশন সম্পর্কে বিভ্রান্তিতে ভূগছে এবং যার ফলে ঘটছে এতো সব বিশৃংখলা। এখানকার পাহাড়ি রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে পাহাড়ে সৃষ্ট সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান যারা চায়না তারাই এখানে নিজেদের স্বার্থ জিইয়ে রাখতে বিভিন্ন সময় এসব হামলা চালায়।
এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশনের সম্মানিত সদস্যদের ওপর বাঙালিদের উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক নৃশংসভাবে হামলা করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা।
এই ঘটনা অত্যন্ত উদ্যোগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন চায় না এবং যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জিইয়ে রেখে নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে তারাই এ হামলা চালিয়েছে বলে জনসংহতি সমিতি মনে করে।
এছাড়া সিএইচটি কমিশনের সদস্যদের ওপর হামলা ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন, ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা। তার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, সফরকারি দলের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো দোষ চাপাতে চাইছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থার একটি শক্তিশালী মহলের ইন্ধন ছাড়া উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীসমূহের পক্ষে এ ধরনের হামলা সম্ভব হতো না, তা বুঝতে কারোরই বাকি থাকে না।
কমিশনের ওপর হামলা ওই ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী অশুভ তৎপরতায় লিপ্ত, এদের সঙ্গে সরকার-প্রশাসনের ভিতরকার আরো অনেক রাঘব বোয়াল জড়িত।
অপরদিকে, রাঙামাটিতে থাকাকালীন সময়ে পর্যটন মোটেলে সংবাদ কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে সিএইচটি কমিশনের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিশন (সিএইচটি কমিশন) এর কো-চেয়ারম্যান মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, কমিশনের ঘোষিত লক্ষ্য এবং কর্মসূচি রয়েছে সেটা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সরেজমিনে বিচার বিবেচনায় রেখে, কমিশনের মূল লক্ষ্য ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছে, সেটা কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে, কতখানি বাস্তবায়ন হয়নি, না হওয়ার কারণগুলো কী, কোথায় গিয়ে ঠেকে আছে, চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গেলে সেটা কোথায়, কিভাবে তড়িৎ গতিতে কাজগুলো করিয়ে নেয়া যায় সে সমস্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা।
তিনি বলেন, আমরা প্রতিবার যখন এখানে এসেছি, সমঅধিকারের সঙ্গে বা অন্য কোনো বাঙালি কোন সংগঠন বা বাঙালি আদিবাসী মিলিত কোনো দল থাকে, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলি এবং সে অনুযায়ী আমরা পরামর্শ এবং সুপারিশমালা তৈরী করি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসন কোনোভাবে আমাদেরকে সহযোগিতা করতে চায়নি।
রাঙামাটি আসার সময় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে কিনা জানতে চাওয়া হলে সুলতানা কামাল বলেন, আমরা কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। বাংলাদেশের ভেতরে আমাদের কি কোনো পাসপোর্ট ভিসার প্রয়োজন আছে।
কমিশনের সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কমিশনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এখানে যে শান্তি চুক্তিটা হয়েছে এটার বাস্তবায়ন চাই। কারন এটা সরকারেরও ঘোষিত লক্ষ্য। এটাকে কেন্দ্র করে একধরনের বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে। সেটাই আমাদের জন্য দুঃখজনক।
সিএইচটি কমিশনের অপর সদস্য ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এখানে আসা এবং অন্য নাগরিকের সঙ্গে কথা বলা আমার অধিকার। এবং সে অধিকারের প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে এখানে যারা প্রশাসনে আছেন তাদের কিন্তু একটা সাংবিধানিক দায়িত্ব আছে যাতে আমরা সে অধিকার প্রয়োগ করতে পারি। সে অধিকার প্রয়োগ না করে তারা আমাদেরকে বলছে আপনার আসছেন কেন। সকাল থেকে এখানে লোকজন ঢুকছে পুলিশ পাহারা থাকা সত্বেও। আমাদের এখন প্রশ্ন পুলিশ কেন এভাবে তাদেরকে আসতে দিচ্ছে? কে তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে সেটা আমরাও জানতে চাই।’
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন) -এর ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ২ জুলাই বুধবার বিকালে ৭ম বারের মতো পার্বত্য খাগড়াছড়ি সফরে এসেছিলেন। সেখানে তাদেরকে বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যায়িত করে মানববন্ধনের পাশাপাশি তাদের গাড়ি বহরে জুতা নিক্ষেপ করে সেখানকার বিক্ষুব্ধ বাঙালি অধিবাসিরা।
এরপরদিনই জেলার প্রশাসনযন্ত্রকে কোনো প্রকার সাংগঠনিক বার্তা প্রদান না করে রাতের অন্ধকারে রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করে সকালে উত্তেজিত জনতার রোষানলে পড়ে ব্যাপক হামলার শিকার হন সিএইচটি কমিশন এর সদস্যরা। যাদের মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জান, সংবিধান প্রণেতা ড. কামালের তনয়া ব্যারিস্টার সারা হোসেনের মতো ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
সিএইচটি কমিশন দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি, মানবাধিকার লংঘনের বিষয় সমূহ গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করে আসছে এবং এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এই পর্যন্ত টানা ছয়বার তারা পাহাড়ে এসে ঘুরে গেলেও এবারই প্রথম বিক্ষুব্ধ বাঙালি সম্প্রদায়ের রোষানলে পড়ে একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ পাহারায় ফিরে যেতে বাধ্য হলো।
