সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর

by News Room

ডেস্ক রিপোর্ট :৪ দিনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার শেষ হলো। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। গত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে রশিতে ঝুলিয়ে তাদের দ- কার্যকর করা হয়। এরপর নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মরদেহ র‌্যাব-পুলিশ কড়া পাহারায় তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। ফাঁসি কার্যকরের আগে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশজুড়ে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। এর আগে গতকাল দুপুরে দুই যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। সব ধরনের প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ৮টার পর তাদের প্রাণভিক্ষার আবেদনের ফাইল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি তাদের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দিলে ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয়        কারাগারে পৌঁছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণকে দমাতে মুজাহিদের নেতৃত্বে গঠিত আলবদর বাহিনী মানবতাবিরোধী কর্মকা-ের নেতৃত্ব দেয়। সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের পর হত্যা এবং বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসির রায় দেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাউজানে কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় হিন্দু বসতিতে গণহত্যা এবং হাটহাজারীর এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের চার অভিযোগে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হলো সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।
গত বুধবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- দেওয়া রায় বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। পাশাপাশি মৃত্যুদ-ের চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে তাদের করা আবেদন খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ।গত ৩০ সেপ্টেম্বর ওই দুজনের আপিল খারিজ করে ফাঁসি বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রকাশ করা পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেন। ওইদিনই লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যুপরোয়ানা পৌঁছানো হয়। পরবর্তীকালে ফাঁসির চূড়ান্ত রায় পড়ে শোনানো হয় তাদের। গত ১৪ অক্টোবর রিভিউ আবেদন করার পর থেকে দুই যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু পরোয়ানা স্থগিত ছিল। বুধবার রিভিউ খারিজ হওয়ায় ফের সচল হয়েছে এ পরোয়ানা।
কারা সূত্র জানায়, পরিবারের সদস্যরা যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে আসার পর পরই দুজনকে গোসল করানো হয়। এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মসজিদের ইমাম মনির হোসেন দুই যুদ্ধাপরাধীকে তওবা পড়ান। ফাঁসি কার্যকর করার কিছুক্ষণ আগে ফাঁসির সেলেই কালো রঙের যমটুপি দিয়ে মাথা থেকে গলা পর্যন্ত ঢেকে দেওয়া হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের। এরপর একজন জল্লাদ গিয়ে দুজনকে সেল থেকে নিয়ে যান ফাঁসির মঞ্চে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন আইজি প্রিজন্স, ডিআইজি প্রিজন্স, এআইজি প্রিজন্স, সিনিয়র জেল সুপার, জেলার, ঢাকার জেলা প্রশাসক, ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের প্রতিনিধি।
এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির তার হাতে ধরা লাল রঙের একটি রুমাল মাটিতে ফেলে দেন। মুহূর্তের মধ্যে প্রধান জল্লাদ ফাঁসিমঞ্চের লোহার তৈরি লিভার (হাতল) টেনে দেন। এতে পায়ের তলা থেকে কাঠ সরে ফাঁসি কার্যকর হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের। ফাঁসি কার্যকরের পর আধা ঘণ্টা করে দুজনের মরদেহ ফাঁসির মঞ্চেই ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরপর মরদেহ নামিয়ে ময়নাতদন্ত করতে সিভিল সার্জন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং মুজাহিদের মরদেহের হাত ও পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি  জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সে সময় প্রধান জল্লাদের ভূমিকা পালন করেছিলেন ১৪৩ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি শাহজাহান ভূঁইয়া। তাকে সহায়তা করেন আরও ৫ জল্লাদ। গত বছরের ১১ এপ্রিল রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একই ফাঁসির মঞ্চে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সে সময় প্রধান জল্লাদের ভূমিকা পালন করেন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি রাজু। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের দায়িত্বও তিনি এবং জল্লাদ শাহজাহান পালন করেন বলে কারা সূত্র জানায়। তাদের সহায়তা করেন জল্লাদ ইকবাল, মাসুদ, আবুল, মোক্তার ও হযরত।আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সন্ধ্যার ৭টার দিকে তার গুলশানের বাসভবনে সাংবাদিকদের বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রাণভিক্ষার যে আবেদন করেছেন, তাতে মতামত দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে।
রাত ৮টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান প্রাণভিক্ষার ফাইল নিয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করার ফাইল নিয়ে বের হন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক খান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাত পৌনে ১০টার দিকে বলেন, প্রাণভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতি নাকচ করে দিয়েছেন। তারা মূলত আগে থেকেই অপরাধ অস্বীকার করে আসছিল, এখন দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষা করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতি আবেদন নাকচ করেন। আমরা ফাঁসি কার্যকরের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিব।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কারাগারে চারটি অ্যাম্বুলেন্স নেওয়া হয়। এর মধ্যে দুটি সাধারণ এবং লাশবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স নেওয়া হয় কারাগার কম্পাউন্ডে।
রাত ৮টার দিকে টেলিফোনের মাধ্যমে ডাকা হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পরিবারকে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের ফোন পেয়ে দুই পরিবার কারাগারের দিকে রওয়ানা হন। রাত ৯টায় দিকে গাড়িতে করে শেষবারের মতো সাক্ষাতের জন্য কারাগারের সামনে আসেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী, দুই ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ফাইয়াজ কাদের চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মেয়ের জামাই। এরপর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এ সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের আবার মানবতাবিরোধী অপরাধের ট্রাইব্যুনালের বিচার ব্যবস্থাকে দায়ী করেন।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ৪০ জন আত্মীয়-স্বজন কারাগারে এলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রবেশের অনুমতি পান। এর দুই মিনিটের মাথায় আলাদা একটি গাড়িতে করে আসেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরাও। তবে পরিবারের সব সদস্য একই সময় আসতে না পারায় মুজাহিদের পরিবার কারাগারের সামনেই গাড়িতে বসে ছিলেন। পরে তারাও ভেতরে প্রবেশ করেন।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এরপরই কারা ফটকের সামনে পুলিশের একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়।রাত সোয়া ১০টার পর কারাগারে প্রবেশ করেন আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা জেলার প্রশাসক ও সিভিল সার্জন।
ফাঁসি কার্যকরকে কেন্দ্র করে নাশকতার আশঙ্কা আছে কিনা এমন প্রশ্নে রাত ১০ টা ২০ মিনিটে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান কারা গেটে সাংবাদিকদের বলেন, আজ ফাঁসি কার্যকর করা হবে। নাশকতার কোনো ধরনের তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবুও আমরা সতর্ক আছি। লাশ দাফন নিয়ে তিনি বলেন, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী লাশ পাহারা দিয়ে গ্রামের বাড়ি নেয়া হবে।
গতকাল দুপুর দেড়টার পর মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের উত্তরা সেক্টর ১১ এর ১০ নম্বর সড়কের ‘মিশন তামান্না’র বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একইভাবে পুলিশ মোতায়েন করা হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ধানম-ি আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বর ‘কিউসি রেসিডেন্স’ নামক বাড়িতেও।

You may also like

Leave a Comment