গোলজার আহমদ হেলাল:
জীবনের প্রতিদিন নিরবে নিরবে চলে যায়/চলে য্ওায়া স্মৃতি গুলো শুধু শুধু পিছু পিছু ডেকে যায়/ইতিহাস কথা বলে, কথা বলে দিন /কথা বলে সোনাঝরা স্মৃতির জরিন।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে কোন জাতি সামনের দিকে এগিয়ে চলে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সে দল নিজেদের মতো করে ইতিহাসকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে। এভাবে নতুন প্রজন্ম সত্য অতীত থেকে হয় বঞ্চিত। বিকৃত ইতিহাস জাতিকে বিভাজন ও অনৈক্যের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ (নয়)মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে অনেক ত্যাগ এবং কষ্ঠ স্বীকার করে এ দেশের জণগন ‘বাংলাদেশ’কে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ¯া’ন করে নেয়। স্বাধীনতার ৪১টি বসন্ত অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা আমাদের জাতিসত্বার পরিচিতির ব্যপারে ঐক্যমত্যে পৌছতে পারিনি। যা আমাদের সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেকটাই বাঁধাস্বরুপ।
১৩৪২সনে সামসুদ্দীন ইলিয়াছ শাহের হাত ধরে ইতিহাসে প্রথম বারের মতো রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলা’ যখন স্বাধীন সম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো, তারও আগে আরণ্যক ব্রাম্মণ ও বুদ্ধ ধর্মগ্রন্থ গুলোতে উঁকি দিয়েছিল ‘বঙ্গ’ নামের আকরিক। তারও বহু আগে বিশ্ব স্রষ্ঠা সৌন্দর্য্যরে লীলানিকেতন হিসেবে সুনীল সমুদ্র থেকে একটু একটু করে জাগিয়ে দিচ্ছিলেন এই অপার সম্ভাবনার শ্যামল-কোমল পাললিক ব-দ্বীপকে। আর দিল্লীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোনারগাঁও এর প্রান্তরে রুখে ফখরউদ্দিন মোবারকশাহ যখন প্রতিষ্ঠা করলেন এ ভূ-গোলের প্রথম টাকশাল সে দিন আকাশ থেকে কোন পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল কিনা আমরা জানি না, কিন্তু অবাক বিষ্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল উপ- মহাদেশ। যেমন পৃথিবীর প্রচলিত ধারণাকে ব্যর্থ করে ১৯৭১সালে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে অবগাহণ করে এ জাতি নিশ্চিত করে তার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্ত¡া।
সৌন্দর্য্য, সম্পদ আর সম্ভাবনার অবিস্মরণীয় বিভায় উদ্ভাসিত এই ভ‚খন্ডকে দু’চোখ মেলে দেখার জন্য পূর্বপ্রান্ত থেকে যেমন ছুটে এসেছেন হিউএনসাঙ, মাহুয়ান, ফাহিয়ান তেমনি পশ্চিমে ভ‚-মধ্য সাগরের ছল-ছল ঢেউয়ের ভেতর থেকে এ মৃত্তিকাকে জানার জন্য প্রাণকে সম্প্রসারিত করেছেন বিশ্ববিশ্রæত ইবনে বতুতা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুতীবস্ত্র মসলিন যেমন এ মাটিকে দিয়েছে রূপকথার ঐশ্বর্য্য তেমনি পৃথিবীর বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুরের উপর ডানা মেলেছে কপিলা বস্তুর মেঘমালা। সুদূর ইয়েমেন থেকে এজনপদকে অনন্য সাধারণ মর্যাদায় অভিসিক্ত করার জন্যই যেন ভেসে এসেছে শাহজালালের কন্ঠ নিঃসৃৃত আজানের মহিমাময় ধ্বনি। এই কল্যাণের বিপরীতে আছে লুন্ঠনের বেদনাদগ্ধ ইতিহাস।সম্পদের লোভে এখানে আছড়ে পড়েছে বৃটিশ, ডাচ, পর্তুগীচ ও ফ্রান্স বণিকদের বানিজ্যপোত। তাদের লালসার শোষন নির্যাতনের ভয়ঙ্কর জালে জড়িয়ে পড়ে নিঃস্ব থেকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এই মানচিত্র। তারপরও বাংলাদেশ মাথানত না করা এক অযুত সম্ভাবনার সোনার দেশ। এতো ভঙ্গ বাংলাদেশ তবু রঙ্গে ভরা। এই পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা কর্ণফুলীর তীরে তীরে প্রতিটি সুর্যোদয়ে নিয়ে এসেছে গভীর আধ্যাত্মিকতা, সংগ্রামের অজর অমর প্রেরণা। নকশীকাঁথার মতো রাত ও দিন। এদেশেরই জমিতে পা-দিয়ে কবি বলেছিলেন ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবো না কো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভ‚মি’। যারা জীর্ণ পুরাতন জামাপরা তাদের ছড়ানো হতাশা ভষ্মস্তুপে আজ তাইতো পত-পত করে উড়ছে লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা লাল সবুজের গর্বিত নিশান। আর স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতু নতুন দিগন্তে প্রসারিত করেছে রুপকথা। কোটি কোটি প্রাণের কলরবে স্বাধীনতার ৪১ বছর পর বাংলাদেশকে করে রেখেছে প্রাণপংকময়।
এই জাগরণের একটা পূর্ণাঙ্গ নির্মাণচিত্র জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের জেগে উঠা ভোরের নদীর মোহনায় যার প্রতিটি উত্থানে কণায় কণায় আছে একেকটি সম্ভাবনার হৃদস্পন্দন। কোনটা
রেখে কোনটার দিকে বাড়াই হাত। কোনটিই উপেক্ষা বা অবহেলার করার মতো নয়। কৃষিখাত, পোশাকশিল্প, মানব সম্পদ, চিকিৎসা ও ঔষধশিল্প, সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম শিল্প, জাহাজ নির্মাণ, সিরামিক শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি, নদী, পর্যটন ও ফুলের মতো প্রভৃৃতি খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা।
বিগত কয়েকদশক থেকে বাংলাদেশে কৃষিতে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ১৮.৬% আসে কৃষিখাত থেকে। আমাদের মোট জাতীয় শ্রমশক্তি ৪৫%ভাগ কৃষি কাজে নিয়োজিত। কৃষিযোগ্য জমির শতকরা ৮০%জমিতে ধান চাষ হয়ে থাকে। দীর্ঘ ৪০(চল্লিশ) বছরপর দেশের জণসংখ্যা দ্বি-গুন হওয়া সত্বেও আমরা প্রায় ৩.৫০কোটি মেট্রিকটন ধান এবং ১৫লক্ষ মেট্রিকটন গম উৎপাদন করে থাকি। উন্নত জাতের বীজ ও সারের ব্যবহার এবং সেচ সুবিধার কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন উল্লেখ যোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কৃষিতে এখন বহুমুখীকরণ ও বাণিজ্যিকিকরণ সময়ের অনিবার্য দাবী। বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট এ পর্যন্ত ৪টি হাইব্রিডসহ মোট ৬০টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। সম্প্রতি লবণাক্তপানি সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপক‚লীয় জেলা ও পার্বত্য জেলাগুলোতে ধানচাষ আরো সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন কৃষি পন্য প্রক্রিয়া করণ শিল্প আরো গড়ে তোলা। ইতোমধ্যে দেশে ডেইরী, পোল্ট্রি শিল্প বিকশিত হয়েছে এবং আরো সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সরকার একটি সুন্দর পরিকল্পনা জনগনের সামনে উপস্থাপন করেছে। আমরা মনে করি, এ বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। কৃষি প্রধান জনবহুল এ দেশে ‘একটি বাড়ী, একটি খামার’ প্রকল্প সত্যিই আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনমুখী স্বাবলম্বী প্রকল্প। গ্রাম প্রধান এই বাংলাদেশের সকল জনগন যদি এ কর্মসূচীতে একীভ‚ত হতে পারে তা হলে আমাদের বিশ্বাস দেশ উন্নতির দিকে ধাবিত না হয়ে পারবেনা। তবে একটি বিষয় সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে হবে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগীতা যাতে যথাস্থানে পৌঁছে। সরকারের এ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ও যাতে যতœবান থাকেন এ বিষয়ে। কথায় আছে, ‘স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মঝে কেন আড়াল মধ্যবর্তী মোল্লাকে আজ হাঁকিয়ে দাও।’ সরকারও জনগনের মধ্যখানে যারা সেতুবন্ধনের কাজ করেন তারা যেন পরিপাটি ও যতœশীল হোন এটাই সকল মানুষের দাবী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্প উদ্ভাবনের জন্য প্রশংসা পাওয়ার দাবী রাখেন। কারন আমাদের দেশ ৩য় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। এ দেশের সিংহভাগ মানুষ ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত ভাবে কৃষিকাজের সাথে জড়িত। এ দেশে রয়েছে আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতে পূর্ণ বিশাল উর্বর কৃষি জমি। এ দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু কৃষি কাজের জন্য যথোপযোগী। সব মিলিয়ে একসময় এ জনপদের পুকুরে পুকুরে মাছ ছিল। গোয়াল ভরা গরু ছিল। ছিল মাঠ ভরা ধান। বিট্রিশ বেনিয়ারা এগুলো ক্ষত-বিক্ষত করে আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে বানিয়েছে আমাদেরকে নি:স্ব জাতিতে। অথচ যারা আমাদের সম্পদ নিয়ে তাদের নিজেদের জীবন রক্ষা করছিল আজ তাদের কাছে আমাদের হাত পাততে হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত থেকে উৎপাদন বাড়াতে ‘একটি বাড়ী একটি খামার’ প্রকল্পের বিকল্প নেই। দেশের সকল জনগন এবং সরকার অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে এ প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে পারলে সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত।
তারিখ:১২/০৪/১২ইংরেজী
লেখক: সাংবাদিক,সমাজকর্মী ও সংগঠক।
