লাঞ্চিত মানবতাঃ শাহবাগ থেকে বাংলাদেশ

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল :
লাকী আক্তার। বাংলার আলীগড় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী। অসম্ভব আর অকৃত্রিম দেশপ্রেম, আর দেশের ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ তার। গগনবিদারী শ্লোগান আর লাখো জনতাকে সারাদিন সারারাত উজ্জীবিত করে শাহবাগ আন্দোলন মাতিয়ে তুলেছেন তিনি। প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চের তরুনরা তাকে উপাধি দেয় অগ্নিকণ্যা নামে। ভবিষ্যতে তিনি জাতীয় নেত্রী বা দেশের কর্ণধার হতে পারেন। ছাত্র ইউনিয়ন নামের রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদকের দায়িত্বে তিনি বর্তমানে আছেন।
গণজাগরণ মঞ্চে কিছুদিন পূর্বে রক্ষীবাহিনীর নেতা তোফায়েল আহমদ গিয়েছিলেন সংহতি প্রকাশ করতে। শাহবাগ আন্দোলনকে অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক রাখার স্বার্থে সেদিন লাকী আক্তার তোফায়েল আহমদের মতো রাজনৈতিক ধীমান নেতাকে বক্তব্য দিতে বারন করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম নায়িকা লাকী আক্তারকে সেখানেই লাঞ্চিত হতে হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তাকে ছুটতে হয়েছে বারডেম হাসপাতালে।
একাত্তরের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শেষে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক নতুন একটি দেশের জন্ম হয়। পাক-হানাদারদের শোষন-বঞ্চনা আর নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়ার সে ইতিহাস ভোলার নয়।
আমার চাচা মুক্তিযোদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। একজন সফল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি বর্তমান সরকারের অর্থ্যানূকূল্যও নিয়মিত পেয়ে যাচ্ছেন। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের পুরুষ ও মহিলা সবাই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। কারণ হানাদার বাহিনী গ্রামের পশ্চিমের টিলায় ক্যাম্প স্থাপন করেছে। একদিন আমার আব্বা বাড়ীঘর দেখতে এসেছিলেন। তখন হানাদারবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তাকে দিয়ে সাড়ে তিন ফুট গভীর গর্ত তৈরী করে। এরপর তাকে নিজ হাতে খোড়া গভীর গর্তে নামতে বলে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ও প্রাণে মারার হুমকি দিয়ে আব্বাকে গর্তে নামিয়ে ফেলে এবং কোমর পর্যন্ত হানাদারবাহিনীরা মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়। এরপর শুরু হয় নির্যাতন। পায়ের বুট দিয়ে লাথি, আর বাঁশের লাটি দিয়ে অনবরত তার সারা শরীরে আঘাত করতে থাকে। এক পর্যায়ে কমান্ডার গুলি করতে উদ্যত হলে কতিপয় রাজাকার এসে তাকে সেখান থেকে মুক্ত করে দেয়। আমার আব্বার মুখ থেকে সে

ভয়াবহ বর্বর নির্যাতনের কাহিনী শুনলে গা শিউরে উঠে। তার শরীর তখন থেকে বিপন্ন প্রায়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা কি নির্মম নির্যাতন করেছে তা অবর্ণনীয়। আব্বার মুখ থেকে শুনেছি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘তারা নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট গোপন খবর পাঠাতেন।’

স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নূরে আলম সিদ্দিকী ১৫ ডিসেম্বর’১২ বাংলাদেশ প্রতিদিনে লিখেছেন “চোখের জলে বুক ভাসিয়ে লক্ষ মানুষের বুক মাড়িয়ে মায়ের কাছে সন্তান ভিক্ষা চেয়ে নিয়েছি রনাঙ্গণে পাঠানোর জন্য, বোনের কাছে স্বামী ভিক্ষা নিয়েছি। দীর্ঘ ৯মাসের যুদ্ধের সময় যখন ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরেছি কোথাও কোথাও সতীত্ব হারানো বোন শরনার্থী ক্যাম্পে পায়ের উপর আছড়ে পড়েছে। বলেছে ‘এই কলংকিত জীবন নিয়ে আর বাঁচতে চাই না।’ মাথায় হাত রেখে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেছি, দুঃখ করোনা বোন সূর্য উঠবেই। তার দীর্ঘ রোশনায় শুকিয়ে যাবে তোমার মুখের ওপর ছড়ানো অশ্রু।”
আফসোস, ৪২ বছরের পাদপীঠে দাঁড়িয়ে এখন দেখছি স্বাধীনতার লাল সূর্য পেয়েছি। কিন্তু বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে তার আলো ও উত্তাপ এখনো ছড়ায়নি।

স্বাধীনতা যুদ্ধ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে লাল সবুজের পতাকার স্বাধীন দেশে জন্ম গ্রহণ করেছি, এটাই বড় সৌভাগ্যের। এটা আনন্দের, এটা বড় তৃপ্তির। তবে বড় বেদনা, বড় আশাহত এখানেই যখন দেখি লাকী আক্তারের মতো তরুণীরা লাঞ্চিত হয়। যখন দেখি তাহমিনার মতো গৃহবধূরা অভাবের তাড়নায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, যখন বিশ্বজিতের মতো নিরিহ যুবকদের কর্মস্থলে যাওয়ার নিরাপত্তা নেই। বরঞ্চ সারা বিশ্ব দেখছে কিভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে বিশ্বজিতকে হত্যা করা হয়েছে।
শাহবাগের আন্দোলন দিয়ে লিখা শুরু করেছিলাম। এটা তরুন ছাত্র-যুবসমাজের আন্দোলন। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সরকার যাতে জামায়াতের সাথে আতাত করে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের (ফরমায়েশী) রায় দিতে না পারে কিংবা রায় দিতে যাতে বিচারকরা প্রভাবিত না হন। এবং এটা ছিল মূলত একটা সরকার বিরোধী আন্দোলন। ন্যায় ও যৌক্তিক এ আন্দোলন সামান্য কয়েক দিনের ব্যবধানে মূল লক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। আন্দোলনের প্রবক্তারা সরাসরি অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবী করে আসলে বিচার বিভাগকে অবজ্ঞা করছেন কিংবা বিচার বিভাগের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছেন। এসম্পর্কে ১৫ ফেব্রুয়ারী’১৩ ইং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্ঠা ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনে লিখেছেন “আমাদের নতুন প্রজন্ম তাহাদের বয়স অনুপাতে বয়স্কদের অনেকের চাইতে অধিকতর শিক্ষিত। তাহাদের অবশ্যই জানিতে হইবে যে, আমাদের অনেকে মাত্রাতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণে ব্যর্থ হইয়াছেন যখন তাহাদের বিজ্ঞ ও যুক্তিপ্রবণ হওয়া দরকার ছিল। আমাদের ইহাই স্বীকার করিয়া লইতে হয় যে, জনগনের রায়ই আইন যেমনটি দাবী করিয়াছেন প্রখ্যাত ফৌজদারী আইনজীবী জনাব আনিসুল হক এবং আরো কতিপয় ব্যক্তি, তখন মৃত্যুদন্ড কে গণরায় বলিতে হইবে। সুতরাং আমাদেরকে যৌক্তিক ভাবে স্বীকার করিয়া নিতে হইবে যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল বা কোর্টে আপীলের জন্য প্রেরণের দরকার নাই। আইনে পরিবর্তন আনারও দরকার নেই। যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করিবার জন্যই শুধু অপেক্ষা করিতে হইবে। তবে উহা হইবে বৈপ্লবিক বিচার, আইনের শাসনের বিচার হইবে না। অথচ আইনের শাসনের বিচারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করা হইয়াছিল এবং জনগন দেশকে শাসনতন্ত্র দিয়াছিল।”
সুতরাং নতুন প্রজন্ম যদি এ বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় তা হলে এ আন্দোলন জাতিকে বড় ধরনের বিভ্রান্তি ও বৃহত্তর বিভক্তির দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে।
তরুনদেরকে বুঝতে হবে বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। এ ধরনের রাষ্ট্রকে স্বাবলম্বী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে হাড়ভাঙ্গা কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমরা এখনো দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত। প্রতিনিয়ত এদেশের সিংহভাগ লোক অর্থনৈতিক টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। উন্নত বিশ্ব অনলাইনের মাধ্যমে অনেক আয় করছে। আমরা

এখনো পারছিনা। তাই শুধুমাত্র ব্লগিং করে দেশ গড়া যায় না। শখ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ধর্মের বিরুদ্ধে অশ্লীল প্রচারণা চালিয়ে শুধূ জাতিগত বিভেদই বাড়বে না বরঞ্চ ৪২ বছরের তৈরী হওয়া জাতিসত্তা পঙ্গুত্ব বরণ করবে। আমাদেরকে সাম্যের মহান নীতি,আইনের শাসন,ধর্মের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা কে প্রাধান্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মুলনীতি ও স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের নির্দেশনার আলোকে রাষ্ট্র ,দেশ ও সমাজ গঠনে মনোযোগী হতে হবে।

রাজপথে মানবতা লাঞ্চিত হওয়ার পর এবার মনুষত্ববোধ ধ্বংসের মহোৎসব শুরু হয়েছে। সুতরাং সময় এসেছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, ডাক এসেছে প্রান্তিক সভ্যতায় সমবেত হওয়ার। জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায় আমাদের অনুভূতিকে শানিত করে কর্মে মনোনিবেশ করতে হবে। তাঁর ভাষায়- ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর/তখনও জাগিনি যখন যোহর। হেলা ও খেলায় কেটেছে আসর/মাগরেবের আজ শুনি আজান। জমাতে শামিল হওরে এশাতে/ এখনও জমাতে আছে স্থান।

লেখক:সাংবাদিক,সমাজকর্মী ও সংগঠক।
তারিখ:২৫/০২/২০১৩ইংরেজী।

You may also like

Leave a Comment