রওশনের ‘গিরিঙ্গি’ উত্থান

by News Room
সিলেটের খবর ডেস্ক:স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদের সঙ্গে গিরিঙ্গি করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হচ্ছেন বেগম রওশন এরশাদ। আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে পরিচিত দলের প্রেসিডিয়াম এই সদস্য সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে দেশের রাজনীতিতে এ অর্জন করতে যাচ্ছেন। এ জন্য তিনি স্বামীকে আটক রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং জাতীয় পার্টিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করেছেন। সব দল অংশ না নেয়ায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচএম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ার পর তিনি কার্যত নীরব ছিলেন। গুলশানের বাসায় বসে কলকাঠি নাড়িয়ে সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মতামত উপেক্ষা করে সুবিধাবাদীদের নির্বাচনে থেকে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

এরশাদ নিজে ফোন করে এবং পার্টি অফিস থেকে ফোন করে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তিনি (রওশন) দলীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশ উপেক্ষা করে পাল্টা ফোন করে দলীয় প্রার্থীদের কয়েকজনকে মনোনয়ন প্রত্যাহার না করার অনুরোধ করেন।

তিনি যাতে দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন সে জন্য নিজের স্বামী দলীয় চেয়ারম্যানকে ‘আটক’ রাখার পরামর্শ দেন। উল্লেখ, ২০০৬ সালের জুন মাসে তিনি জাতীয় পার্টিকে দ্বিখণ্ডিত করে নিজেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছিলেন। আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি মহাজোট গঠন করার পর আর্থিক সুবিধা নিয়ে তিনি ২২ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তবে দলের নেতাকর্মীরা তাকে বর্জন করায় আবার এরশাদের নেতৃত্বাধীন মূল দলে ফিরে আসেন।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে পাতানো ভোট মনে করে নির্বাচন বর্জন করলেও রংপুর-৩ আসনের এমপি হিসেবে আজ এরশাদের শপথ গ্রহণের কথা। তবে সবকিছু নির্ভর করছে স্ত্রী রওশন এরশাদের ইচ্ছার ওপর। কারণ তিনি দলের নেতৃত্ব কব্জা করতে এরশাদকে প্রকাশ্যে আসতে দিতে আগ্রহী নন।

বিএনপিসহ সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় এইচএম এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি লাঙ্গল প্রতীক কোনো প্রার্থীকে বরাদ্দ না দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেন। সে সময় এরশাদ বলেন, এদেশের মানুষ আমাকে অনেক দিয়েছে, সম্মান করেছে। জনগণের কাছে আমি ঋণী। শেষ বয়সে জনগণের বিপক্ষে যাব না। জনগণের ইচ্ছার বাইরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় বিপাকে পড়ে যায় নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা। তারা সরকারকে বোঝায় এরশাদকে বাইরে রাখলে দলের নেতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না (ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে দুই দলের সংস্কারবাদী নেতারা এরকম প্রস্তাব দিয়েছিলেন)।

১২ ডিসেম্বর রওশন এরশাদসহ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে বঙ্গভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার দু’ঘণ্টা পর বারিধারার বাসা থেকে এইচএম এরশাদকে আটক করে সিএমএইচএ নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর প্রচার করা হয় এরশাদ অসুস্থ। এরশাদ নিজেকে সুস্থ দাবি করলেও সরকার থেকে ‘এরশাদ অসুস্থ’ প্রচার করে মিডিয়ায়। নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং গলফ খেলতে অভ্যস্ত এরশাদ আটক অবস্থায় হাফিয়ে উঠলে তিনি আটক থাকাবস্থায় গলফ খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সরকার তাকে গলফ খেলার সুযোগ দেয়। কিন্তু তার রাজনৈতিক ইমেজ মেলাইন করার জন্য সে খবরও মিডিয়ায় ফলাও করে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী এবং সুবিধাবাদী নেতারা রওশন এরশাদকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে থেকে যায়। নির্বাচনের সময় দলের নির্বাচনে অংশ নেয়া নেতারা সবকিছু রওশনের নেতৃত্বে হচ্ছে প্রচার করলেও রওশন এরশাদ অসুস্থতার কথা নীরব থাকার কৌশল গ্রহণ করেন। পাতানো নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে এসে ঘোষণা দেন এরশাদের নির্দেশে তিনি ভোটে গেছেন। যদিও সুবিধাবাদী নেতারা ছাড়া সর্বস্তরের নেতারা রওশনের এ দাবি এখনো মেনে নিতে পারছেন না।

তবে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে এইচএম এরশাদ শপথ নেয়ার মাধ্যমে মুক্ত হতে চাচ্ছেন। সরকার আগে এরশাদকে শপথ নিলে ‘অসুস্থ থেকে সুস্থ হবেন এরশাদ’ প্রস্তাব করলেও রওশনের গিরিঙ্গির কারণে তাকে গতকাল শপথ নেয়া থেকে বিরত রাখা হয়।

সূত্রের দাবি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকা সফরে এসে এরশাদকে যে প্রস্তাব দেন সেটা প্রকাশ করায় সাবেক এই প্রেসিডেন্টের ওপর দিল্লির শিব শঙ্কর মেনন গং ক্ষুব্ধ। তারা সরকারকে জানিয়েছেন এরশাদকে বিশ্বাস করা যায় না। বিশ্বাস করে তাকে (এরশাদ) বিরোধীদলীয় নেতা করা হলে তিনি যে কোনো সময় পদত্যাগ করে সরকারকে বিপাকে ফেলতে পারেন। দিল্লির এই মনোভাব বুঝতে পেরে সরকার রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতা বানানোর পক্ষ্যে।

আর দলের অন্যান্য নেতাদের (যারা পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিনা ভোটে এমপি হয়েছেন) আশঙ্কা এরশাদ মুক্তি পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। সে জন্যই এরশাদকে আাটক রেখে দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে হলেও রওশন এরশাদের নেতৃত্বে বিরোধীদল গঠন করতে চাচ্ছেন তারা। এর মধ্যেও কয়েকজন আবার মন্ত্রিত্ব ছাড়তে চাচ্ছেন না। তারা বিরোধী দলে থাকতে চাচ্ছেন এবং সরকারে থেকে মন্ত্রিত্ব (গাছেরটা খাবেন নিচেরটাও কুড়াবেন) রাখতে চাচ্ছেন। এ নিয়ে দলে বিরোধ চলছে। তবে রওশন এরশাদ সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন দলের মূল নেতৃত্ব তিনি কব্জা করতে পারলে সবার ইচ্ছা পূরণ করবেন।

সূত্র জানায় গতকাল শপথ নেয়ার পর রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বলেন, সে কে, তাকে সাইজ করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু বলেন, ম্যাডাম, ববি হাজ্জাজ হচ্ছেন আমাদের স্যারের বিশেষ উপদেষ্টা। তিনি জাতীয় পার্টিকে নিয়ে রিসার্চ করেন। তখন রওশন এরশাদ বলেন, সে কিসের রিসার্চ করে। এ ধরনের রিসার্চ আমরা অনেক করতে পারি। রওশন এরশাদ আরো বলেন, এই ছেলেটা কিছুদিন আগে দলের বিষয়ে অনেক কিছু করেছে। তাকে সাইজ করতে হবে। এ ধরনের ছেলে আর যেন দলের ভেতরে ঢুকতে না পারে। প্রশ্ন করেন, সে এখন কোথায়? এ সময় কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ম্যাডাম, ববি এখন লন্ডনে।

রওশন এরশাদের মুখে এ ধরনের কথা শুনে জাতীয় পার্টির এক নেতা বলেন, ওনি (রওশন) স্বামীর সুবাদে রাজনীতিতে কীভাবে এসেছেন আমরা জানি। ওনার কী কোনো গ্রহণযেগ্যাতা আছে? উনি নিজের নামে নির্বাচন করে কী জামানত রক্ষা করতে পারবেন? এরশাদের সুবাদে রাজনীতিক হয়ে তিনি এখন ধরাকে সরাজ্ঞান করতে চাচ্ছেন। ওনার এবং ওনার ভাইবোনদের দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ’৯০-এ এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। এরশাদের নামে রাজনীতিতে এসে এখন এরশাদকে মাইনাস করতে চাচ্ছেন। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে এক সময় তিনিই নিজেই রাজনীতি থেকে মাইনাস হয়ে যাবেন। সূত্র: ইনকিলাব

You may also like

Leave a Comment