জুনায়েদুর রহমান:
গত ০৩ অক্টোবর সোমবার পরীক্ষা হতে ফেরার পথে সিলেটের এম.সি কলেজের পুকুর পাড়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহসাধারণ সম্পাদক বদরুল আলমের চাপাতির আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিস। তিনি সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রলীগ নেতা বদরুল খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। যেখানে খাদিজাকে কুপানো হয়েছিল ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেউ কেউ খাদিজাকে কোপানোর দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেছিলেন। সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার নৃশংসতায় শিউরে উঠে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে হাজারো মানুষ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্কুলছাত্রী কণিকা ঘোষ, ঢাকার সুরাইয়া আক্তার রিসা ও মাদারীপুরের নিতু মণ্ডলের পর খাদিজার ওপর বখাটে ও উত্ত্যক্তকারীদের একই ধরনের হামলার ঘটনায় উৎকণ্ঠা বেড়েছে সারা দেশে। বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, ‘অপরাধীদের বিচার না হওয়ার কারণেই এমন ঘটনা বাড়ছে’।
খাদিজা যে কলেজে পড়েন এবং যে কলেজের ক্যাম্পাসে ঘটনা ঘটেছে, সেই দুই কলেজেরই ছাত্রী ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, ‘একই কলেজে আমিও পড়েছি, আমি সেখানে নিজেকে ভাবছি! কী নির্মম, আমি ভিডিওটা পুরো দেখতে পারিনি। আমাদের খাদিজা বেঁচে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক।’ তিনি আরো বলেন, তারা ধরেই নিয়েছে এ ধরনের সন্ত্রাস যারা করে, ওই সন্ত্রাসীরা বিচারের ঊর্ধ্বে। এমন বর্বরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হামলাকারীর বিচার দাবি করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, মাটিতে পড়ে থাকা খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে নির্দয়ভাবে কোপায় বদরুল। সেখানে অনেকের কান্না, কারো বা চিৎকার শুনা গেলেও খাদিজাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসছিল না। কিন্তু এগিয়ে যান এম. ইমরান কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী। তখন খাদিজাকে কুপিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে বদরুল। ইমরান খাদিজাকে বাঁচাতে অনেককে এগিয়ে আসতে ডাকাডাকি করেন।
প্রথমে কেউ আসতে চাইছিল না তারপর কয়েকজন এগিয়ে আসে। ইমরান খাদিজা কে নিয়ে যান ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, নিজে প্রথম ব্যাগ রক্ত দিয়ে প্রাণ বাঁচান খাদিজার।
ভাবতে অবাক লাগে, যে খাদিজাকে আহত করল সেই বদরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আর যে ছেলেটি খাদিজাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিল সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুক। তাহলে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ গুলোতে কি শিখছে মেধাবী সন্তান গুলো? প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়!
তারপরের কাহিনী সবার জানা। একদিকে খাদিজার জন্য উৎকন্ঠা অন্যদিকে সারাদেশ বদরুলের ফাঁসির জন্য উত্তাল। তার মধ্যে সরকারী মহিলা কলেজে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে ফজিলাতুন্নেসা নামে এক ছাত্রীকে হত্যার হুমকির অভিযোগ পাওয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে খাদিজা সম্পর্কে কথা বলেন। বদরুলের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তিরও আশ্বাস দেন।
এছাড়া তখন অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুবই স্পষ্ট। তিনি কাউকে ছাড় দেন না। আমি আপনাদের জোর গলায় বলতে পারি, যে-ই অপরাধ করেছেন, সেই অপরাধীকে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।’
অবশ্য এখন আদালতে বদরুলের বিচার চলমান। খাদিজাও অনেকটা সুস্থতার পথে। খাদিজাকে বাঁচানো এম. ইমরান কবিরের সাথে ফোনে কথা হয় খাদিজা আক্তার নার্গিসের। তিনি জানান, খাদিজা আপু (গতকাল) আমার সাথে ফোনে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে উনার সাথে কথা হয়। খাদিজা আপু এখন অনেকটাই সুস্থ। খাদিজা এখন নিজ হাতে খেতে পারে, সাহায্য করলে হাঁটতেও পারে। এছাড়া খাদিজাকে হুইল চেয়ারে করে ঘুরানো হয় বলে জানান খাদিজার সৌদিআরব প্রবাসী বাবা। খাদিজা এখন সবাইকে চিনছে, সবার সাথে কথাও বলতে। এছাড়া ঢাকার স্কয়ার হাসপাতাল হতে ফোনেও আত্নীয়-স্বজনের সাথে কথা হয় খাদিজার। তবে খাদিজার চাপাতির আঘাতের কারণে মাথার বাম পাশ এখনো অবশ রয়েছে। শীঘ্রই ফিজিওথেরাপি দেয়া শুরু হবে বলে ডাক্তাররা জানান।
গত ০৪ নভেম্বর মঙ্গলবার ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমকে একমাত্র আসামি করে সিলেট মহিলা কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
সিলেট মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হারুন-উর-রশিদ।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সদর দক্ষিণ) জেদান আল মুসা সাংবাদিকদের জানান, সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মামলাটির চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ মামলায় একজনকে আসামী ও ৩৬ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।
এদিকে, চার্জশিট দাখিল করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন মামলার বাদী খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস। বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সিলেট মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের পিপি মফুর আলী বলেন, আগামী ১৫ নভেম্বর মামলার নির্ধারিত তারিখে চার্জশিটের উপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আদালত চার্জশিট গ্রহণ করলে মামলার বিচার কাজ শুরু হবে।
ঘটনা সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি বদরুল খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করার সময় স্থানীয় ব্যক্তিরা বদরুলকে ধরে পিটুনি দেন। পরদিন বদরুল তাঁকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন জালালাবাদ থানায়। মারধরকারীদের জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে এই বখাটে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মামলার এক আসামি বলেন, উত্ত্যক্ত করার জন্যই যে তাঁকে মারধর করা হয়েছিল, তা সবাই জানত, পুলিশও। তারপরও ২০১২ সালের ৩১ মে ১৪ জনের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
উক্ত্যক্ত করার জন্য তখন বদরুল গণপিটুনি খাওয়ার পর জামায়াত-শিবির কে দায়ী করে পত্রিকায় নিউজও আসে। এমনকি বিভিন্নভাবে সরকার বদরুলকে সরকার সহযোগীতা করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, তাহলে একজন বদরুলকে বখাটে করার পিছনে এই সমাজ একটুও দায়ী নয় কি?সব কিছুকে ছাপিয়ে খাদিজার জন্য যেভাবে দেশের মানুষ ভালোবাসা দেখিয়েছে তা যুগ যুগ ধরে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। খাদিজা পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।
