সিলেটের খবর ডেস্ক : সকল পরিচয় পেছনে ফেলে শুধুমাত্র লৈঙ্গিক পরিচয় ‘নারী’ হওয়ার কারণে যে অপমান-নিগ্রহ-নিপীড়নের শিকার হতে হয় এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং রাষ্ট্রের দ্বারা, এর প্রতিবাদেই আওয়াজ উঠেছিল গতকাল মধ্যরাতে “শেকল ভাঙার পদযাত্রার মাধ্যমে।
গতকাল (১৩ অক্টবর) রাত ১১টা ৫৯মিনিটে রাজধানীর শাহবাগ থেকে শুরু হয় শেকল ভাঙার এ পদযাত্রা। এখান থেকে মিছিলে স্লোগানে শাহবাগ-সিটি কলেজ-কলাবাগান হয়ে শহরের বিভিন্ন পথ প্রদক্ষিণ করে মানিকমিয়া এভিনিউ-এ এসে বিক্ষোভকারী নারীরা সমাবেশ অনুষ্ঠিত করে।

সমাবেশে এ পদযাত্রার অন্যতম সংগঠক তাপসী দে প্রাপ্তি তাদের ১২ (বারো) দফা দাবি তুলে ধরেন। মানিক মিয়া এভিনিউ-এ সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে আন্দোলনকারীরা এ সকল দাবি তুলে ধরেন।
দাবিসমূহ-
১। সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ-যৌন সহিংসতার সাথে যুক্তদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক ও ন্যায্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইনে ও সামাজিকভাবে ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন সংস্কার করতে হবে।
৩। পাহাড় ও সমতলের সকল নারীদের ওপর সকল প্রকার যৌন এবং সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।
৪। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যেকোনোভাবেই ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৫। প্রাথমিক লেভেল থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (গুড টাচ ব্যাড টাচের শিক্ষা, সম্মতি বা কনসেন্ট এর গুরুত্ব, প্রাইভেট পার্টস সম্পর্কে অবহিত করা) যোগ করতে হবে।
৬। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১৫৫(৪) ধারা বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে।
৭। হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সিডো সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল আইন ও প্রথা বিলোপ করতে হবে।
৮। মাদ্রাসার শিশুসহ সকল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মাঝে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।
৯। জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকে নারী অবমাননাকর বার্তা প্রকাশ ও প্রচার করা নিষিদ্ধ করতে হবে।
১০। রাস্তাঘাটে নারীদের অযথা পুলিশি ও অন্যান্য হয়রানি বন্ধ করতে হবে। গণপরিবহনে নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
১১। ধর্মীয় বক্তব্যের নামে অনলাইনে ও অফলাইনে নারী অবমাননাকর বক্তব্য প্রচার বন্ধ করতে হবে।
১২। যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ‘এই মেয়ে, এত রাতে বাইরে কী?’, ‘রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে?’, ‘এত রাতে বাইরে যেতে চাইছ, সাথে কোনো পুরুষ আছে তো?’- সমাজের এমন স্টেরিওটাইপ দৃষ্টিভিঙ্গিকে ভাঙতেই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মধ্যরাতে রাজধানীর পথে মশাল হাতে পদযাত্রায় নেমেছি আমরা।
শেকল ভাঙার এ পদযাত্রায় নারীদের সম্মিলিত কণ্ঠে স্লোগান ওঠে, ‘দিনে হোক রাতে হোক, সামলিয়ে রাখো চোখ’, ‘আমি নির্দোষ আমি নারী, আসল দোষী ধর্ষণকারী’, ‘আমার বোন কবরে ধর্ষক কেন বাইরে’ প্রভৃতি।
নারীদের এই আন্দোলনে অনেক পুরুষ কর্মীরা ও ছাত্র-যুব-সাংস্কৃতিক সঙ্গগঠণও সংহতি জানান। আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ড. শহীদুল আলম, রেহনুমা আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফাসহ আরও অনেক বিশিষ্টজন।
