দ্বীনি শিক্ষা বনাম জাগতিক শিক্ষা

by News Room

সৈয়দ তানভীর আলম:আমার মেয়ে আলিশবাকে নিয়ে ইসলামিক শিক্ষার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বারাকা এরাবিক লার্নিং এ যাচ্ছিলাম তখন সামনের ট্যাক্সিতে লেখাটা চোখে পড়লো- “আপনার শিশুকে ইসলামিক শিক্ষা দিন”।
ইসলামিক শিক্ষাটা আসলে কি?
ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রবেশের পূর্বে মাদরাসা এবং স্কুল নামের দুটি বিভাজিত ধারার অস্তিত্ব ছিলো না। এই অঞ্চলে ইসলামের সূচনা থেকে বৃটিশ পিরিয়ডের আগ পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলোতে একসাথে দ্বীনী এবং জাগতিক দু’ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ছিল।

ইসলামের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ জামেয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পর্যালোচনা সামনে আনা হয় তাহলে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে তার মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে মরোক্কোর কারাউয়্যীন বিশ্বাবিদ্যালয়, তিউনিসিয়ার যাইতুনিয়া, রয়েছে মিশরের আযহার।

কারাউয়্যীন শুধু ইসলামী দুনিয়ার নয়, পুরো বিশ্বের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। এখানে একদিকে যেভাবে দ্বীনি বিষয় তথা কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকহ প্রভৃতির পাঠদান হতো পাশাপাশি যেগুলোকে আজ আমরা জাগতিক বিষয় বলি যেমন চিকিৎসা বিদ্যা, গণিত শাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি সেগুলোও পড়ানো হত।

এতে একদিকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিদগ্ধ আলিম তৈরি হয়েছেন। তেমনি সেখানে তৈরি হয়েছেন ইবনে রুশদের মত দার্শনিক। সেখান থেকে জন্ম নিয়েছেন বড় বড় অনেক বিজ্ঞানী।

এখনকার প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দরুন অনিবার্যভাবে আমাদের সমাজে দু’টি সম্প্রদায় তৈরি হয়ে গিয়েছে। আর দুই সম্প্রদায়ের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে বিস্তর ফারাক। বৈষয়িক শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষা না থাকার দরুন ফরযে আইনের ইলম তাতে হাছিল হচ্ছে না। ফলে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ ছাত্র এবং এই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে যারা বের হয় তারা জানে না দ্বীনের ফরয বিধান কী।

অন্যদিকে আলেমদের কেউ তো বিজ্ঞানী হতে পারেননি। কেউ তো চিকিৎসক হতে পারেননি। তাদের কেউ কোনো আবিষ্কার দেখাতে পারেননি। আলেম-সমাজের নিকট এর কি কোনো উত্তর আছে? অথচ কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহের একটি বড় বিষয় ছিল ইজতিহাদ ও গবেষণা।

তাছাড়া আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কয়জনই বা তৈরি হয়, যারা কিছু আবিষ্কার করছে? না, সেখানে আবিষ্কার করা যাবে না! সেখানে তো আবিষ্কারের দরজা এভাবে খিল দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ইংরেজরা যা বলবে তাই চূড়ান্ত কথা! পশ্চিমারা যে থিউরি দেবে সেটাই শেষ থিউরি! তারা যে ওষুধ বলে দেবে সেটাই একমাত্র ওষুধ!
অথচ মুসলিম বিজ্ঞানীরাই ইসলামি স্বর্ণযুগে (অর্থাৎ ৮ম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত) বিজ্ঞান ও সভ্যতায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এখন পর্যন্ত সে সকল মুজতাহিদগণের নামগুলোই এস্ট্রোলজি, ম্যাথম্যাটিকস, মেডিকেল সাইন্স, কেমিস্ট্রি ইত্যাদি বিষয়গুলোতে দীপ্যমান।
মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমি এর রচিত ‘হিসাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালাহ’ গ্রন্থের নামানুসারে বীজগণিত শাস্ত্রকে পরবর্তীকালে ইউরোপীয়রা আল-জেবরা নামকরণ হয়েছে।
কেমিস্ট্রির জনক জাবির ইবনে হাইয়ানের মত রসায়নের গবেষণা আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় কেউ করতে পারেননি। ইবনে সিনা মাত্র ১০ বছর বয়সে পবিত্র কোরআনে হাফিজ হয়েছিলেন। তিনি দার্শনিক,চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ এবং মুসলিম জগতের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও সর্ববিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন।
ইবনে যাকারিয়া আল রাযির অস্ত্রোপচার পদ্ধতি ছিল গ্রীকদের থেকেও উন্নত।
ওমর খৈয়াম এর রচিত ‘কিতাবুল জিবার ওয়াল মুকাবালা’ গণিতশাস্ত্রের একখানি অমর গ্রন্থ।

আমাদের জেনারেল শিক্ষাকার্যক্রমের সাথে ইলমে দ্বীনি শিক্ষার কার্যক্রম সমন্বিত হলেই ইসলামী শিক্ষার স্বর্ণযুগে ফিরে যাওয়ার একটা প্রয়াস হতে পারে। আর সেটাই হবে প্রকৃত ইসলামিক শিক্ষা, নীতি নৈতিকতা, বিবেক এবং মুল্যবোধের শিক্ষা।

লেখক:সৈয়দ তানভীর আলম-ক্যালিগ্রাফি আর্টিস্ট

You may also like

Leave a Comment