এক মাসে ৩০২ রাজনৈতিক খুন-গুম: খালেদা

by News Room

ডেস্ক রিপোর্ট:

গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে সারা দেশে ৩০২ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে খুন ও গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিরোধী দলগুলোর প্রতি সরকারের দমন-পীড়ন তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

সারা দেশ থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসা তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, “এই এক মাসে ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের চার নেতা খুন, দিনাজপুরে পাঁচজন নিহত, নীলফামারীতে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের ছয়জন নিহত ও নয়জন গুম হয়েছেন। যারা গুম হয়েছেন তারা সবাই বিএনপি ও স্বেচ্ছাস্বেক দলের স্থানীয় নেতা।”

বিকেল চারটায় সংবাদ সম্মেলনের সময় নির্ধারিত থাকলেও খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনস্থলে আসেন তিনটা ৩০ মিনিটে। পরে তিনটা ৩৩ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন শুরু করে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলে।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি ও ১৯ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

দেশে গণতন্ত্র নেই- এমন অভিযোগ করে খালেদা জিয়া  বলেন, “গণতন্ত্র হত্যা করে দেশে একদলীয় এবং এক ব্যক্তির স্বৈরশাসন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।”  কারসাজি ও জরবদস্তির মাধ্যমে বর্তমান সরকার ও সংসদ গঠন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বেগম জিয়া।

তিনি বলেন, “ইচ্ছেমতো সংবিধান বদল করে সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিনা ভোটে ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এরা ক্ষমতা দখল করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকেও এক ভাগ আসন দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি আসন ভাগাভাগি চায়নি।”

আওয়ামী লীগতে ‘চরম সুবিধাবাদী দল’ আখ্যা দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, “এই দলটি যখনই নিজেদের কাছে যেটি সুবিধা মনে করে, সেটাই করে। সুবিধা না হলে তারা এর চরম বিপরীতে অবস্থান নিতেও সামান্য লজ্জাবোধ করে না। বাংলাদেশের মানুষ এই সুবিধাবাদী রাজনীতির স্বরূপ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।”

খালেদা জিয়া বলেন, “৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যে প্রহসনের আয়োজন করা হয়েছিল দেশবাসী তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ৫ ভাগ মানুষও ভোট দিতে যায়নি। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।”

সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে- এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “প্রতিপক্ষ নির্মূল করার এমন নিষ্ঠুর তাণ্ডব স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগের তাণ্ডবকেও হার মানিয়েছে। ”

খালেদা জিয়া বলেন, “সারা দেশকে পাইকারি হত্যাকাণ্ডের এক আতঙ্কিত জনপদে পরিণত করা হয়েছে। দেশের কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে বিরোধী মতপোষণকারী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিয়ে। বিরোধী নেতাকর্মীদের যখন যাকে খুশি গ্রেফতার করা হচ্ছে।”

বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, “তামাশার নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধ সরকার গঠন করা হয়েছে। এই সরকার ও সংসদ বৈধ জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হয়নি। এই সংসদের নেতা স্পিকার বিরোধী দলীয় নেতা কেউই জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। বেশিরভাগ মন্ত্রীই ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন।”

খালেদা জিয়া বলেন, সরকার বাস্তবতা থেকে আরো দূরে সরে গিয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। সন্ত্রাস ও অস্ত্রের শক্তির ওপর ভর করে অবৈধ শাসনকে প্রলম্বিত করতে চাইছে। চক্ষুলজ্জা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে গলাবাজি এবং জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে হুমকি ধামকি দিয়ে চলছে।”

আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন ও জনগণ কর্তৃক বর্জিত হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, এমন দাবি করে বেগম জিয়া বলেন, “তারা একদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে, অপর দিকে দলীয় সন্ত্রাসীদের সারা দেশে লেলিয়ে দিয়েছে জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে। বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের তালিকা করে বেছে বেছে খুন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আটক করে গুলি চালিয়ে বা নির্মম দৈহিক নির্যাতনে পঙ্গু করে দেয়া এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তারা দেশকে পাইকারি হত্যাকান্ডের এক আতঙ্কিত জনপদে পরিণত করেছে।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “দলীয়করণ ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নৈতিক শক্তি ধ্বংস করে ঘাতক বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। বাইরের নির্দেশনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি দমন ও বিরোধী দল নির্মূলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

খালেদা জিয়া বলেন, “আমরা খবর পেয়েছি, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা ও গুমের ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য বেআইনি জুলুম-নির্যাতন চালানোর বিরুদ্ধে। কিন্তু অতি-উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ডে বাধ্য করছে।”

সাংবাদিকরা সংবাদমাধ্যমে সাহস করে সত্য তুলে ধরতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খালেদা জিয়া বলেন, “অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের হেনস্থা ও হয়রানি করা হচ্ছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও মিছিল করতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। পুলিশ-র্যা ব হামলা চালাচ্ছে। ঢাকায় বিরোধী দলের সমাবেশ, গণজমায়েত, জনসভা ও মিছিল করার অধিকার কার্যত হরণ করা হয়েছে। জবরদস্তি ও ত্রাসের এই বেআইনি শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ বেশি দিন নীরব থাকবে না। আমরাও নিশ্চুপ বসে থাকব না।”

অবিলম্বে হত্যা, গুম, উৎপীড়ন ও বিরোধী দল নির্মূলের এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধের জন্য আহ্বান জানিয়ে সব হত্যাকাণ্ডের ঘটেছে তার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। তবে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে গ্রেফতার করে বিচারে সোপর্দ করা যায়। কিন্তু বিনাবিচারে হত্যা করলে সেই খুনের বিচার হতে হবে।”

পাশাপাশি তিনি সরকারের প্রতি নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার-হয়রানি বন্ধ এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি দেয়ার দাবি জানান। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলের ওপর থেকে সকল বিধিনিষেধ অবিলম্বে তুলে নেয়ার আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে দমন-পীড়ন বন্ধ করে সকল বন্ধ সংবাদমাধ্যম খুলে দিয়ে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দেয়ার দাবি জানান খালেদা জিয়া।

তিনি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও ক্ষমতাসীনদের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সব মানবাধিকার সংস্থাকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানান।

বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, “ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। এই মাসেই ২০০৯ সালে পিলখানায় ২৫ ফেব্রুয়ারি  ৫৭ জন চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। সেই শোকাবহ দিনে ঢাকায় এশিয়া কাপ ক্রিকেটের উদ্বোধন উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ নাচগানের অনুষ্ঠানের আয়োজনের কথা আমরা শুনেছি। বেদনাবিধূর ওই দিনে কোনো আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান না করার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি। তাদের সমর্থন আমাদের একমাত্র শক্তি। সেই সমর্থন আমাদেরকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। ভোটের অধিকারবঞ্চিত মানুষ সুযোগের অপেক্ষায় আছে। তারা এর উপযুক্ত জবাব দেবে।”

খালেদা আরো বলেন, চলমান সমস্যার সমাধানে সরকারের কাছে সংলাপ ও সমঝোতায় আহ্বান জানাচ্ছি। এ আহ্বানে সাড়া দেয়া বা না-দেয়া তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে এই দেশকে যেকোনো উপায়ে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতেই হবে। এ জন্য নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।”

খালেদিা জিয়া বলেন, বিএনপি একদলীয় বাকশালি স্বৈরশাসনের ধ্বংসস্তূপ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র এনেছে। স্বৈরচার হটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। জনগণের সমর্থনে বারবার দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিএনপি জানে কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কৌশল ও কর্মপন্থা নিরূপণ করেই বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আজকের সভ্য পৃথিবীতে দু-একটি সার্টিফিকেট জোগাড় করে এই অন্যায় ও অবৈধ শাসনকে প্রলম্বিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন এই স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচারকে মেনে চলবে না। আমরাও অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েই যাব, এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। তাই সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আবারও আহ্বান জানাচ্ছি।”

১৯ দলীয় জোট গঠনের পর এটিই খালেদা জিয়ার প্রথম সংবাদ সম্মেলন। গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে গত ১৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়া সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির  সদস্য আর এ গনি, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লে. জে. (অব.)  মাহবুবুর রহমান, আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনাম আহমেদ চৌধুরী, ফজলুল হক পটল, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, শামসুজ্জামান দুদু, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, রিয়াজ রহমান প্রমুখ।

১৯ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির (একাংশ) চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমেদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর শুরু সদস্য মশিউল আলম,  বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, ইসলামী ঐক্যজোট  চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ নেজামী, এনপিপি চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু, খেলাফত মজলিস সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, জাগপা’র শফিউল আলম প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনডিপি চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা, বাংলাদেশ ন্যাপ সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া,  ইসলামিক পার্টির এমএ মবিন, ন্যাপ ভাসানির শেখ আনোয়ারুল হক, মুসলিম লীগের কামরুজ্জামান খসরু, ডেমোক্রেটিক লীগের সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ।

You may also like

Leave a Comment