আল মাসুম, জৈন্তাপুর থেকে: আর একটি জয়, তাহলেই হবে ইতিহাস। প্রথমবারের মতো বড় কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতবে বাংলাদেশ। তবে তার চেয়েও বড় হল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের জন্য রসদ পেয়ে যাবে মাশরাফি বিন মুর্তজার দল।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রোববার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারতের মুখোমুখি হবে স্বাগতিকরা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হতে যাওয়া সেই ম্যাচ জিততে মরিয়া মাশরাফিরা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভালো প্রস্তুতির জন্য এবার প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ হচ্ছে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছানোয় ভারতে ৮ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলা হচ্ছে না তামিম ইকবাল-সাকিব আল হাসানদের।
প্রথম রাউন্ডের আবরণে হতে যাওয়া বাছাইপর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বুধবার নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচের আগে ধর্মশালায় একটি অনুশীলন সেশন থাকতে পারে মাশরাফিদের। সে দিক থেকে ভারত ম্যাচ মাশরাফিদের এক ধরনের প্রস্তুতি ম্যাচও।
এশিয়া কাপ শুরুর আগে টি-টোয়েন্টির এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো লোক কমই ছিলেন। সাবেক-বর্তমান তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে মুশফিকুর রহিমদের সম্ভাবনা কমই ছিল। বিশেষ করে ওয়ানডের চমৎকার পারফরম্যান্স টি-টোয়েন্টিতে নিয়ে যেতে না পারায়।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চার ম্যাচের সিরিজের শেষ দুটিতে হারা বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট শুরু করে ভারতের কাছে ৪৫ রানের হার দিয়ে। সব মিলিয়ে টানা তিন ম্যাচ হারা বাংলাদেশ দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় পরের ম্যাচে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারানোর পর বিদায় করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা ও টি-টোয়েন্টির অন্যতম সফল দল পাকিস্তানকে।
টানা তিন জয়ে আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে মাশরাফিদের। টি-টোয়েন্টির ভাষাও এখন আর খুব একটা অচেনা নয় তাদের। ক্রমশ সবাই বুঝতে পারছেন কার কী ভূমিকা, কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে। চিনে নিয়েছেন টি-টোয়েন্টির অলিগলি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দোরগোড়ায় বলে এশিয়া কাপের সঙ্গে সেই টুর্নামেন্ট নিয়েও ভাবতে হচ্ছে চন্দিকা হাথুরুসিংহেদের। শেষবার মতো দলকে দেখে নেওয়া সুযোগ তার। শেষ তিন ম্যাচের পারফরম্যান্স নির্ভরতা জোগাবে তাকে। চট্টগ্রাম ও খুলনায় শিষ্যদের নিয়ে যে নিবিড় অনুশীলন করিয়েছেন তিনি, তার ফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।
রানেই আছেন তামিম, ক্রমশ নিজেকে ফিরে পাচ্ছেন সৌম্য সরকার। তিন নম্বরে আলো ছড়াচ্ছেন সাব্বির রহমান। বাংলাদেশের দুর্ভাবনা কেবল মুশফিককে নিয়ে। দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান কিছু দিন ধরে নিজের ছায়া হয়ে আছেন।
সাকিবের পারফরম্যান্সে আছে সেরা চেহারায় ফেরার ইঙ্গিত। দ্বিতীয় স্পিনার হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত আরাফাত সানি। ফিনিশারের ভূমিকায় এখন পর্যন্ত অসাধারণ মাহমুদউল্লাহ। টপ অর্ডার থেকে মিডল অর্ডারে নেমে আসা মিঠুনের সামর্থ্য আছে শেষে ঝড় তোলার।
বোলিং আক্রমণের সেরা অস্ত্র মুস্তাফিজুর রহমানের অভাব আগের ম্যাচে অনুভব করতে দেননি তাসকিন আহমেদ-আল আমিন হোসেন। গতি ঝড় তোলা তাসকিন মঞ্চটা তৈরি করে দিচ্ছেন, শেষে এসে রানের গতিতে বাধ দিচ্ছেন আল আমিন।
ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে হারাতে সব সতীর্থের কাছ থেকে সেরাটা চান মাশরাফি। অনুপ্রেরণাদায়ী এই অধিনায়ক দলের জয়ে নিজেও অবদান রাখছেন। ব্যাটে-বলে তার ছোট-ছোট অবদান পার্থক্য গড়ে দিতে পারে ফাইনালে।
প্রথম ম্যাচে যে বাংলাদেশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল আইসিসি টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দলকে তা ভুলেননি ভারত ক্রিকেট দলের পরিচালক রবি শাস্ত্রী। ঘরের মাঠে বাংলাদেশকে হালকা করে দেখার ভুল করতে রাজি নন তিনি।
এখন পর্যন্ত এবারের এশিয়া কাপে কোনো ম্যাচ না হারা ভারত ফাইনালে কঠিন লড়াইয়ের প্রত্যাশা করছে। অভিজ্ঞদের ভেলায় শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচ পার হতে চায় তারা। মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, সুরেশ রায়না, রোহিত শর্মা, যুবরাজ সিংদের রয়েছে অসংখ্য টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। ফাইনালের মতো স্নায়ু চাপের ম্যাচে সেই অভিজ্ঞতাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
২০১২ সালের আসরে ফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ। সেবার স্বাগতিকদের হৃদয় ভেঙে শিরোপা জিতেছিল পাকিস্তান। সেই দলকে এবার হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। সীমাহীন প্রত্যাশা নিয়ে ফাইনালের দিকে তাকিয়ে আছে ক্রিকেটপাগল বাংলাদেশের মানুষ। টিকেটের চাহিদা এখন আকাশ ছোঁয়া।
টিকেটের জন্য দুই রাত ধরে ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়েছিল অসংখ্য ভক্ত। কাঁদানে–গ্যাস লাঠিপেটাও হজম করতে হয়েছে তাদের। বেশিক্ষণ লাগেনি সব টিকেটি বিক্রি হতে। বেশিরভাগকেই ফিরতে হয়েছে টিকেট না পাওয়ার হতাশা নিয়ে।
গ্যালারিতে থাকবেন ২৫ হাজার দর্শক। কিন্তু তাদের সঙ্গে থাকবেন দেশের সব মানুষও। সবার প্রত্যাশা একটাই-জয়। যে জয় শিরোপার সঙ্গে এনে দিবে আত্মবিশ্বাস। তার অপেক্ষায় পুরো বাংলাদেশ।
