মানুষ কী নিয়ে বাঁচে? বেশিরভাগ মানুষের জন্যই পৃথিবী সদয় নয়। তারপরও মানুষ এই পৃথিবীতে কেন থেকে যেতে চায়? শুধুমাত্র জৈবিক তাড়নায় মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। অনেক বিবেচনার পর দেখলাম পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার পেছনে কতগুলো বিষয় কাজ করে। সেসব বিষয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার রহস্য। মানুষকে যে বিষয়গুলো বাঁচিয়ে রাখে তার মধ্যে প্রথমেই আসে আস্থা, আশা এবং ভ্রাতৃত্ব। প্রতিটি মানুষ কোন না কোনভাবে কারও ওপর আস্থা রাখে। এই আস্থা যেভাবে ব্যক্তির ওপর থাকে সেভাবে সমাজের ওপরেও থাকে। আস্থা কম-বেশী হয় কিন্তু সেটা শূণ্য হয় না। আবার সেটা পূরো সমাজের ওপর না হয়ে একাংশের ওপরেও হতে পারে। মানুষের আস্থার জায়গা হতে পারে কোন দল, সম্প্রদায়, মতাদর্শ, ধর্ম ও স্রষ্টা এবং এমনকি সরকার বা রাষ্ট্র। যদি আস্থায় সংকট দেখা দেয় তাহলে মানুষের বাঁচার আগ্রহেও সংকট দেখা দেয় এবং যখন মানুষ পুরোপুরিভাবে মানুষের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অন্যদিকে মানবজাতির ওপর প্রচুর আস্থা মানুষকে বাঁচার প্রেরণায় উজ্জীবিত করে তোলে। আস্থার বিপরীত হচ্ছে হতাশা যা জীবনকে বোঝায় পরিণত করে। পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আস্থার সংকট।মানুষকে আস্থার সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য রয়েছে আশাবাদ। যখন পৃথিবীর নির্মমতা আস্থাকে চুরমার করে দেয় তখন জীবনের জন্য জরুরি আস্থাটুকু ফিরিয়ে দিতে পারে শুধুমাত্র আশার আলো। আশার আলো মানুষকে আবারও বাঁচার প্রেরণায় উজ্জীবিত করতে পারে। মানুষকে সান্তনার সুর শুনিয়ে বাঁচার দিশা দিতে পারে শক্তিশালী আশাবাদ। মানুষের সভ্যতা যখনই বড় বেশী মানুষখেকো হয়ে উঠেছে তখনই বিপন্ন মানুষের মাঝে আশার বার্তা নিয়ে কেউ না কেউ হাজির হয়েছে। প্রাচীন যুগের সকল মহমানব থেকে শুরু করে সেমেটিক নবী-রাসূল পর্যন্ত সকলেই বড় বেশী আশার গান শুনিয়ে গেছেন।
সেমেটিকদের মধ্যে এত বেশী নবী আসার কারণ ঔ সম্প্রদায়ের মানুষ বারবারই পরাধীনতার শেকলে বাঁধা থাকত এবং সে বন্দী জীবনে আশার আলো নিয়ে দেখা দিতেন অসংখ্য নবী-রাসূল। খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্মও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার কারণ গভীর আশাবাদ। সে সময়ের সভ্যতা মানুষকে এত বেশী ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল যে, আশা ছাড়া মানুষের হারানোর আর কিছু ছিল না। শুধুমাত্র আশার আলোই ছিল তাদের বাঁচার শেষ অবলম্বন। দুটো ধর্মই খুটিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে দুটিই একই রকম আশাবাদে ভরপূর। খোদার রাজ্যের অনন্ত জীবনের আশা আর যন্ত্রণায় জর্জরিত গ্লানিময় জীবনের বোঝা থেকে নির্বাণ লাভের আশা একই তাড়না প্রসূত।
জীবনের প্রতি আগ্রহ আরও কিছুটা বাড়িয়ে তোলার জন্য এসেছে ভ্রাতৃত্ববোধ। বর্ণবাদ ছাড়া পৃথিবীর সকল মতাদর্শই তার অনুসারীদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। ভ্রাতৃত্ববোধের পরিধি যতটা বড় হয় জীবনের প্রতি আগ্রহও ততটা বেড়ে যায়। অন্যদিকে শত্রুতার পরিধি যতটা বড় হয় জীবন ততটাই সংকুচিত হয়ে আসে। তাই শত্রতা ভুলে যাওয়ার শিক্ষা নিয়ে এসেছে ভ্রাতৃত্বের ধারণা। সংঘাত ও রক্তপাত যেখানে বেশী সেখানে ভ্রাতৃত্বের সংকটই সবচেয়ে বেশী। খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্মে যেভাবে আশাবাদকে প্রধান হয়ে উঠতে দেখা যায় সেভাবে ইসলামে ভ্রাতৃত্বকে প্রধান হয়ে উঠতে দেখা যায়।
কারণ আরবে ইসলামের আবির্ভাবের সময় গোত্রীয় সংঘাত ও রক্তপাত ছিল সামাজিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট। এ সংকটের মূলে ছিল সংকীর্ণ গোত্রীয় সংহতি বা সংকীর্ণ গোত্রীয় ভ্রাতৃত্ব যা অন্যগোত্রকে শত্রুজ্ঞান করত। ইসলাম এ ধরণের পরস্পর বিরোধী ভ্রাতৃত্বের স্থলে নিয়ে আসে সর্বগোত্রীয় ইসলামী ভ্রাতৃত্ব যাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল অসংখ্য আরব গোত্র। মূলত ভ্রাতৃত্বের প্রকট সংকটের ফলেই এই ইসলামী ভ্রাতৃত্ব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আসাবিয়াত অর্থাৎ গোত্রীয় জাতীয়তাবাদ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
আস্থা, আশা ও ভ্রাতৃত্বের পরে আর কী আসতে পারে নিশ্চিত নই। বোধহয় ভালবাসা আসবে। জীবনে ভালবাসার প্রভাবও অনেক গভীর। তবে মানুষ তখনই সঠিকভাবে ভালবাসতে পারে যখন তার আস্থার একটি জায়গা নিশ্চিত হয় এবং আশা ও ভরসার একটি আশ্রয়স্থল থাকে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সে বাঁধা থাকে। এসবের মধ্যেই ভালবাসার জন্ম হয়। মানুষের প্রতি ভালবাসা আস্থাকে আরও দৃঢ় করে, আশাকে স্বপ্নে পরিণত করে দেয় এবং ভ্রাতৃত্বকে নিয়ে যায় মনের গভীরে।
