আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি (৮)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : ১৯৯২ সালে স্টার মার্কস সহ ১ম বিভাগে এসএসসি পাশ করে অনেক স্বপ্ন ও ইচ্ছা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম এম.সি কলেজে একাদশ বিজ্ঞান শ্রেণীতে। ২৪ সেপ্টেম্বর’৯২ একাদশ শ্রেণীর উদ্বোধনী ক্লাসের দিন প্রতিপক্ষ দু’টি ছাত্র সংগঠন নবাগত ছাত্রদের সংবর্ধনা ও দলে ভিড়ানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কলেজ কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষনা করে।

প্রায় মাস খানেক পর কলেজ আবার খোলে। গ্রাম থেকে শহরে এসে স্বাভাবিক নতুন পরিবেশের স্পর্শ পাই। পাশাপাশি এম.সি কলেজের মতো একটি নামী-দামী প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করাটাও চাট্টিখানিকথা নয়। বয়সে এবং সাইজে ছোট হওয়ার কারনে সবাই আমাকে স্নেহ করতো।কলেজের বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষিকা আমাকে বেশ কয়েকটি বই উপহার দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের ‘লালসালু’ পড়াতেন। বিশেষ করে ‘লালসালু,’ ‘এম.সি কলেজ স্মৃতি বিস্মৃতির জাগ্রত অতীত,’ ‘সিলেটের মাটি সিলেটের মানুষ’ সহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ দিলেন।

শেষোক্ত দুটো গ্রন্থ থেকে এম.সি কলেজ সম্পর্কে অনেক জানলাম। সেদিন ২৪ সেপ্টেম্বর’৯২ যখন দুটি ছাত্রসংগঠন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তখন দেখলাম কলেজ অধ্যক্ষসহ সিনিয়র শিক্ষকবৃন্দ প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করেছেন পরিস্থিতিনিয়ন্ত্রণ করতে।

এইচ এস সি পাশ করার পর এম.সি কলেজেই আবার ভর্তি হই। গণিত বিভাগে। ইন্টারমিডিয়েট থেকেই ছাত্রাবাসে থাকতাম। প্রায় সুদীর্ঘ ১০ বৎসর ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত,ঘটনা-দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি।

সম্ভবত ১৯৯৫ কিংবা ১৯৯৬ সাল এম সি কলেজ মাঠে খেলাকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী এলাকাবাসীর সাথে আমাদের ছাত্রদের তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে।প্রায় বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা অবধি মারামারি ইট পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি চলছিল।আমি হোস্টেল অডিটরিয়ামের সামনে জৈষ্ট্য এক ভাই কলেজের mathematics dept.এর ছাত্র রাজু মু.শিবলী’র সাথে অবস্থান করি।মূহুর্তেই ওপাশ থেকে বিদ্যূৎ বেগে এক টুকরো পাথরখণ্ড আমার বাম চোখের ঠিক নিচে আঘাত করে।আমি তাৎক্ষণিক রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাই।আমাকে চৌহাট্রায় সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।চিকিৎসক ৪ টি সেলাই দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেয়।প্রায় মাসখানেক এর মধ্যে আমি সু্স্থ হয়ে উঠি।

যাই হোক মহান আল্লাহ আমার চোখ রক্ষা করেছেন।অল্পের জন্য পাথর বৃষ্টি থেকে চক্ষু রক্ষা পায়।আমি অসু্স্থ থাকাকালীন কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের প্রচুর সহমর্মিতা পেয়েছি।বিশেষ করে আমার মনে পড়ছে তৎকালীন ছাত্রনেতৃবৃন্দ যথাক্রমে এম সি কলেজ ছাত্র সংসদের সেসময়কার ভি পি মুজিবাদর্শের লড়াকু এক সৈনিক ছাত্রলীগ নেতা আছাদুজজামান চৌ. পাপপু ভাই,ছাত্রলীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য নিধু ভূষণ দাস পিন্টু,ছাত্রলীগ নেতা রন্জিত সরকার,জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা এমরান আহমদ চৌ.,ছাত্রদলনেতা ছাত্র সংসদের সেসময়কার এ জি এস শহীদুল ইসলাম,ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ছাত্র সংসদের সেসময়কার জি এস ওমর আশরাফ ইমন,জাসদ ছাত্রলীগ নেতা হেলাল আহমদ,ছাত্রশিবির নেতা জয়নাল আবেদীন(বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান,জৈন্তাপুর),সুলতান আহমদ,আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া,ছাত্রমজলিস নেতা আবদুল হান্নান,ফজর আলী,প্রাক্তন ভি পি ওয়াহিদুজজামান চৌ,ছাত্রদলনেতা মিফতাহ সিদ্দিকী প্রমুখ।তারা সবসময় আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন। আমি তাদের কাছে চির ঋণী এবং কৃতজ্ঞ।

আমরা জানি,ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার
বিরোধী আন্দোলনসহ অসংখ্য দেশ মাতৃকার আন্দোলনে ছাত্ররাই
অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক অসংখ্য আন্দোলনেও ছাত্রদের ভূমিকা কম নয়।কিন্তু,আজ ছাত্র অঙ্গনে ভিন্ন অবস্থা বিরাজ করছে।তাহলে কি সামাগ্রিক ভাবে ছাত্র-রাজনীতি খেই হারিয়ে ফেলেছে? যেখানে নৈতিকতা নেই, মানবতা নেই, নেই দায়িত্বশীলতা। আছে শুধু অস্ত্র,হত্যা, গুম, চাঁদাবাজী আর অনৈতিক কর্মকাণ্ড।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক-দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি:সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment