আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি (৫১)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।

পটিয়া ছেড়ে রওয়ানা দিলাম রাঙামাটির পথে। গহীন অরণ্যের মাঝ দিয়ে উঁচু নিচু আকাবাকা সর্পিল পথ বেয়ে পৌছালাম রাঙামাটি শহরে। চমৎকার দৃশ্য। অপূর্ব সাজানো গোছানো এক শহর। স্রষ্টা তাঁর অসাধারণ নির্মাণ শৈলী দিয়ে গড়ে তুলেছেন যেন এ জনপদ কে। মুগ্ধতার দ্যুতি ছড়ায় যেন। আমরা অভিভূত, বিস্মিত, উদ্বেলিত। তাই তো কবি যথার্থই বলেছেন, এ দেশ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না ।আমার এ জন্মভূমি সকল দেশের রানী।

বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা রাঙামাটি। এখানের মানুষের জীবনযাত্রা, জীবনচিত্র, কৃষ্টি-কালচার এক অভিনব মাত্রার। পাহাড়ী ঢং আর বৈচিত্র্যময় জীবিকানির্বাহের উপায় ও পদ্ধতি বর্ণনাতীত। পর্যটন সমৃদ্ধ এ অঞ্চল ও স্থানীয় শিল্পের আকর্ষণীয় জিনিসপত্র মুগ্ধ করে যে কাউকে।

আমরা দুপুরবেলার খাবার শেষে চলে গেলাম ঝুলন্ত ব্রীজের উপর। কাপ্তাই হ্রদের উপর নির্মিত এ ব্রীজটি আমাদের মোহিত করে তুলে। এর মাধ্যমে দু’টি পাহাড়ের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এরপর আমরা চলে যাই শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে রাজবন বৌদ্ধ বিহারে।

রাজবন বিহার বৌদ্ধদের একটি ধর্মীয় স্থাপনা। পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে আছে বৌদ্ধদের উপাসনালয়, হাসপাতাল, ভিক্ষুকদের আবাসিক ভবন, স্বর্গ ঘর, দেশনালয়, বিশ্রামাগার, অতিথিশালা, অনুষ্ঠান মঞ্চ, রন্ধনশালা, সীমাঘর, আবাসিক কুঠির, ভোজনালয়, লাইব্রেরী ও প্রেস। শুধু বৌদ্ধদের জন্য নয়, এই ধর্মজ্ঞানচর্চাকেন্দ্রটি দুনিয়ার সব প্রকৃতি প্রেমী মানুষ ও জ্ঞান সাধকদের জন্য। এটি একটি জানার নতুন ভূবন। সাংস্কৃতিক ভাববিনিময়ের সাথে এখানে ধর্মচিন্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য’র সুযোগ মিলে। নিরাপত্তার জন্য বিহারের চতুর্দিকে রয়েছে সীমানা প্রাচীর। সন্ধ্যার পর সাধারণত এখানে যাওয়া যায় না। অনুমতি নিয়ে স্বর্গীয় সিঁড়ি ব্যবহার করা যায়। আমরা ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু দেখলাম। তাদের কুঠির শিল্প ও হস্তশিল্পের বাজার থেকে আমাদের ভাইয়েরা অনেক কিছু কিনলেন। টেকসই জিনিসপত্র।

দেখা হল, এক ভিক্ষুকের সাথে। কথা হল অনেক কিছু। জানা যায়, ভিক্ষুকদের সেবার জন্য ও উপাসনালয়ের কাজে এখানে নিয়োজিত আছেন কুমারী যুবতীগণ। কুমারী ছাড়া এ কাজগুলো আর কেউ করতে পারবে না। যুক্তিও মেলা ভার। মেরীর মত। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। বিহার থেকে আমরা ফিরি রাঙামাটি শহরে। সেখানে হাল্কা নাস্তা সেরে চট্টগ্রামের দিকে রওয়ানা দেই।
আর পেছনে ফেলে আসলাম অপুর্ব রাঙামাটি কে। চোখে যেন লেগেই আছে রাঙামাটির জল।
লিয়াকত হোসেন খোকনের ভাষায়
অন্য রকম প্রেম – ২
রাঙা রঙে আঁকা প্রাণের রাঙামাটি —

শৈশবে রাঙামাটির প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিলাম —
সাধনা বসু ছিলেন প্রিয় নায়িকা ,
গিয়েছিলেন তিনি রাঙামাটি
শুনে তো — অভিভূত হওয়া।
রাঙামাটি রঙের শহর, পাহাড় আর পাহাড় —
চারিদিকে হ্রদ আর হ্রদ — কর্ণফুলীও বলা হয়
আহা কত রঙে রাঙা রাঙামাটি —
মনে হয় এ যেনো আমার মনে আঁকা চিরচেনা মায়া
ঊনসত্তর সালে এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে —
পত্রমিতার আহবানে চলেছি রাঙামাটিতে —
নব জীবনের বান্ধবী জানিয়েছিল,
তুমি এসো হে প্রিয় বন্ধু —
রাঙা রাঙা রঙে দেখে দেখে চমকাবে —
খুব কাছে পাবে আমায়,
মনে রেখো, উপজাতিরা ভালোবাসা দিতে জানে,
দিও তুমি আমায় উজাড় করা নব যৌবনের ছোঁয়া।
বুকে লাল গোলাপ লাগিয়ে আসবে —
চিনবো তোমায়, দিবো ঠোঁটে চুমু
কত লেখা বান্ধবীর — ভুলো না আমায় চিঠিতে।
রাঙামাটি তখন পার্ব্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র –জেলা আর এই জেলা শহর বসেছে রাঙামাটিতে।
নেমে দেখি, বাঙালি নেই — শুধু উপজাতি
আজ তো আদর করে বলা হয় , আদিবাসী —
প্রথম দেখায় বান্ধবী আমার বুক থেকে —
নিজ হাতে নিল গোলাপ, দিলো চুমু,
মনে হয়েছিল আমারই ওষ্ঠে তা লাগলো
আহা অমন রূপের পনেরো বয়সীকে পেলাম খুব কাছে।
আর আমার বয়স সতেরো —
নব যৌবনে উথাল পাথাল পুরো দেহ,
আহা কি যেন বিলাতে চায় —
সাম্পানে চড়ে শুভলং যাওয়া কত মধুর মুহূর্ত —
ঝরঝর ঝর্ণা ধারা উল্লসিত মোরা নির্জনে
তখন মনে হয়েছিল, আমি কিশোর সাহু —
হেসে হেসে বললাম, প্রিয়া, তুমি মোর বীনা রায়।
ওর মুখ পানে তাকাতেই — মুক্তোর হাসি ঝরলো।
ভাবলাম, এ কি মালা সিনহা…….
কত ভাবনা, কত কল্পনা —
তুমি আমার আমি তোমার এসো আরও কাছে
ঝর্ণায় স্নান করে দু’জন দু’জনকে পেয়েছে নিবিড় করে
পাহাড়ের কোলে বসেছি, অরণ্যে ঢুকে আলিঙ্গন করা
কত মধুময় দিন —
সেদিন আমরা গেয়েছি নব জীবনের গান।
রাঙা রঙে আঁকা রাঙামাটির প্রেমে জড়িয়ে —
স্বপ্ন ছিল, পাহাড়ের কোলে গড়বো নীড়
থাকবো দু’জন যৌন লালসায় লিপ্ত হয়ে
কোথায় গেল সেই রাঙা সূর্যের মতো ভালবাসা ?
চলে গেল দিন – বছর – যুগ তবুও মনের আঙিনায়
অনেক স্মৃতি জমে রইল, সেখানে পড়েছে ধূলো
তবুও রাঙামাটির প্রেমে জড়িয়ে আজ শুধু বিলাপ,
একদা যাহার অহঙ্কার ছিল উপজাতি নিয়ে —
সময়ে কি হয়ে গেল, ১৯৭৬ সালে এক অবৈধ সরকার এসে ঢুকিয়ে দিল নোয়াখালী, ভোলা, কুমিল্লার লোকজনকে —আর সেই দখলবাজদের দাপট প্রভাবে রাঙামাটি ভরে গেল ভিন জেলার বাসিন্দাতে
শুনেছি, আজ যারা যায় রাঙামাটি তারা সহজে
পায় না দেখা আদিবাসীদের —
তখন বিলাপ জাগে, রাঙামাটি তুমি ছিলে শুধু
সেই রঙে রঙে আঁকা উপজাতিদের আবাসস্থল
তোমার ছিল কত ঐতিহ্য — সব গেল মুছে
এ বেদনার কথা কাহারে জানাই বন্ধু —
তবুও নিজ নিজ মনে আনন্দ হাসি
আমার কালে রাঙামাটিতে চক্ষে দেখেছি —
উপজাতি আর উপজাতি —
তখন ছিল উপজাতিদের পার্ব্বত্য জেলা রাঙামাটি।
কত স্মৃতি জড়িয়ে রইল,
হ্রদের ওপারে যাওয়া, রাত নয়টা
নতুন এক ফুটন্ত গোলাপকে খুব কাছে পাওয়া
কত আনন্দ, কত উপভোগ —
তা আর হবে না, সব কিছু আজ স্মৃতিময় কাহিনী —
রাঙামাটি নব যৌবনের জোয়ার শিখিয়েছিল —
সেই মধুর দিন আর কি হবে ফিরে পাওয়া !
কর্ণফুলী বরকল মারিশ্যা বাঘাইছড়ি কাসালং
সাজেক ভ্যালি, লংগদু চোখের আড়াল হয়ে গেল।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment