গোলজার আহমদ হেলাল : রওয়ানা দিলাম চট্রগ্রামের পথে।
ঘুরে আসব পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত স্বাস্থ্যকর স্থান বলে খ্যাত কক্সবাজার,দক্ষিণের থানা টেকনাফ,নারিকেল জিন্জিরার দ্বীপ বলে খ্যাত সেন্টমার্টিন,পার্বত্য জেলা ও জনপদ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী রাঙামাটি,বান্দরবন ও খাগড়াছড়ি জেলা এবং ঐতিহাসিক বীর চট্রলার দর্শনীয় স্থানসহ অনেক কিছু।
সম্ভবত ২০০৩ সাল।এবং সেদিকে মনে হয় আমার প্রথম যাওয়া।মোটামুটি শীত পড়েছে।সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর মাস।যথারীতি রেলষ্টেশন পৌছলাম।রাত ৯টায় চিটাগাংয়ের ট্রেন।একে একে সবাই চলে আসলাম।আমি তখন দরগামহল্লায় থাকতাম।এম সি কলেজের ছাত্রাবাসেও আমার নির্ধারিত কক্ষ ছিল।আমি একজন আবাসিক ছাত্র।
নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছাড়ল গন্তব্যের উদ্দ্যেশে।আমরা মোট ৯ জন।অভিযাত্রী দলের ভাগ্যবান সহযাত্রী।লাকী নাইন ।আমি,মহসীন ভাই(বর্তমানে এডভোকেট),লিঠু ভাই(বর্তমানে ব্যাংক অফিসার),জিয়া ভাই(বর্তমানে ব্যবসায়ী),মোতালেব ভাই(বর্তমানে প্রভাষক), প্রিয় রুপন ভাই(বর্তমানে ইটালী প্রবাসী), প্রিয় সুমন(বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী),স্নেহের সালেহ(বর্তমানে বেসরকারী একটি কলেজের প্রিন্সিপাল) ও স্নেহের আশিক(বর্তমানে ডাক্তার)।
আমাদের দলের প্রতিটি সদস্য অসাধারণ গুণে গুণান্বিত এবং নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল।সালেহ এবং আশিক সর্বকনিষ্ঠ।তারা দু’জন ক্লোজ ফ্রেন্ড।সহপাঠি ও ক্লাসমেট।অসাধারণ মেধা ও প্রতিভার অধিকারী। অত্যন্ত নম্র,ভদ্র ও শান্তশিষ্ট।ছোটবেলা থেকেই তাদের চিনি।
সুমন সিদ্দকী দিলখোলা প্রাণবন্ত এক যুবক।অত্যন্ত চালাক,বুদ্ধিমান ও সাহসী এক ছেলে।জিয়া ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯২ সালে।তিনি তখন মিরাবাজার জামেয়ায় ক্লাস এইটে পড়তেন।আমি তখন এম সি কলেজে আই এস সি ১ম বর্ষে পড়ি।
আমি মিরাবাজারে যে বাসায় থাকতাম তার পাশেই তাদেরও বাসা।আশ্বর্য হয়েছি , এত কম বয়সের বালকদের মধ্যে এ পাড়ায় তিনিই নিয়মিত ৫ওয়াক্ত মসজিদে নামাজ আদায় করতেন।আমি মনে মনে ভাবতাম এই ছেলেটি কে।নম্র,ভদ্র , চাল চলন এবং আচার আচরণে উৎকৃষ্ট এ ছেলেটি এ পাড়ার সেরা বালক।সবাই প্রশংসা করে তার।একদিন পরিচয় হল,জানলাম ,তাঁর গ্রামের বাড়ী চট্রগ্রাম।তাদের সিলেটে ফ্যাক্টরী আছে।বড় ভাই অনেকদিন থেকেই সিলেটে ব্যবসা করছেন।সেই সুবাদে তাঁর এখানে আসা।অসাধারণ অমায়িক ও শিষ্টাচারপুর্ণ এক মানুষ।এ ধরনের মানুষ এ সমাজে বিরল।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল আমাদের সহযাত্রী ৯ জনের মধ্যে ৭ জনের বাড়ীই সিলেটের ভিতর।কিন্তু এ সবার মাঝে সকলের আগেই আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়েছে প্রিয় জিয়া ভাইর সাথে।মুলত তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েই এ যাত্রা শুরু।তবে মহসীন ভাই ও লিঠু ভাই এর উৎসাহ-উদ্দীপনা ,মোতালেব ভাইয়ের পীড়াপীড়ি,সুমন সিদ্দিকীর অবিরত চাপ আর স্নেহের সালেহ এবং আশিকের প্রবল আগ্রহ ও সকলের কৌতুহল,অনুসন্ধিৎসু মন কোন অংশে কম নয়।
ট্রেন চলতে থাকল।চলতে আছে।নদী,পাহাড়,পর্বত ডিংগিয়ে চলছে।কখনও গ্রাম কখনও শহর পেরিয়ে যাচছে।অসাধারন যাতায়াত রাস্তা।মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করছি আমরা।কখনও গান,কখনও কৌতুক,কখনও গল্প চলছে অবিরত।মাঝে মধ্যে নাস্তা ও নীরবতাও উপজীব্য বিষয়।সবার একটাই বাসনা কখনও চট্রগ্রাম পৌছিঁ।
হঁ্যা ভোরবেলাই চট্রগ্রাম নগরীতে পৌঁছলাম।কি সুন্দর দৃশ্য।কুয়াশাভেজা সকাল।মনে পড়ে গেল সেই প্যারাগ্রাফ রাইটিংয়ের কথা।এ উইন্টার মর্নিং।এর বাস্তব ও প্রায়োগিক দিক।
অভিযাত্রী দলের সিনিয়র সদস্য মহসীন ভাই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার দৃঢ়চেতা উদার হৃদয়ের এক মানুষ।এম সি কলেজে পড়তেন।ছাত্রাবাসে থাকতেন আমার মত।আমার এক বছরের জুনিয়র।কিন্তু দেখতে উনাকে আলহামদুলিল্মুলাহ, মুরুব্বীদের মত লাগত।কথাবার্তাও সেই রকম।আমাদের তিনি এক দাওয়াত দিয়েছিলেন রাতের ট্রেনে।সকালে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভাই সীতাকুন্ডে সম্ভবত বাড়ী।সেখানে উনি নাস্তার ইনভাইট করেছেন।আমাদের সবাইকে যেতে হবে।
আমরা রেলষ্টেশন থেকে ঐ পথেই সিএনজি যোগে রওয়ানা দিলাম।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বন্দরনগরী নামে পরিচিত শহর, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাহাড়, সমুদ্রে এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে বিখ্যাত। ঢাকার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ শহর হচ্ছে চট্রগ্রাম।এখানে দেশের সর্ববৃহৎ বন্দর ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এটি এশিয়ায় ৭ম এবং বিশ্বের ১০ম দ্রুততম ক্রমবর্ধমান শহর। চট্টগ্রামের উত্তরে সিলেট বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং মেঘনা নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য, ত্রিপুরা ও মায়ানমার এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ। এছাড়াও চট্টগ্রামের পূর্বে পার্বত্য জেলাসমূহ এবং দক্ষিণে কক্সবাজার জেলা রয়েছে। চট্টগ্রাম শহর উত্তরে ফৌজদারহাট, দক্ষিণে কালুরঘাট এবং পূর্বে হাটহাজারী পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমরা ঐ ভাইয়ের বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছলাম।গ্রামের মধ্যে আধপাঁকা দু’ তলা বাড়ী।আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল দু’তলা ঘরে।খুব সুন্দর,পরিপাটি বাড়ী ও ঘর।দু’তলায় উঠার সিড়িটা কাঠ দ্বারা নির্মিত,নান্দনিকতা সমৃদ্ধ।সত্যিই বাড়ীটি প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তি মনে করিয়ে দেয়।উপরে উঠে আরো বিস্মিত হলাম।পেছনে সমুদ্রের অথৈ জলরাশি।সাদা আর সাদা।জানলাম, ঐ এলাকার লোকজন লবন চাষ করে অনেক অর্থ উপার্জন করে।
আমরা হাতমুখ ধুঁয়ে একটু ফ্রেস হলাম।আমাদের কে বিভিন্ন রকমের খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করা হল।খালু আর খালাম্মা এত আদর যত্ন করলেন ভুলে যাওয়ার নয়।তাদের আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ ও প্রীত।সিলেট এবং চট্রগ্রামের লোকজনের মধ্যে বড় ধরনের সাদৃশ্য হল আতিথেয়তা।মেহমানদের যথাযথ সমাদর করা।সত্যিই অতুলনীয় বটে।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
