গোলজার আহমদ হেলাল : আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখনকার অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে থাকে প্রায় সময়।একদিন ব্যাংকিং আইনের উপর লেকচার দিতে গিয়ে জনৈক শিক্ষক বলেই ফেললেন,” আমার কাছে ইসলামী ব্যাংকের প্রফিট আর যমুনা ব্যাংকের ইন্টারেস্টের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।” আমরা সে সময় প্রতিবাদ করে বলছিলাম স্যার আপনার বক্তব্য সঠিক নয়।আমাদের স্যার তাঁর কথা রিভাইজ না করলেও তিনি সে কথায় অটল থাকেন। আসলে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মুলত প্রায়োগিক দিক বিবেচনা করে লেকচারে বলেছিলেন ইসলামী ব্যাংক আর যমুনা ব্যাংকের মুনাফা ও সুদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আমরা জানি,মুনাফা শব্দের অর্থ লাভ। লাভ হলো— আমি ব্যবসা করছি, আপনাকে একটা পণ্য দিলাম, তার বিনিময়ে আপনি আমাকে টাকা দিচ্ছেন। আমি যে টাকায় পণ্যটা কিনেছি, তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছি। এটা হচ্ছে মুনাফা। আর সুদ হচ্ছে টাকার বিনিময়ে টাকা। আপনাকে আমি ১০ হাজার টাকা দিয়েছি এই মর্মে যে, আপনি এক বছর পরে আমাকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা দেবেন। এ ক্ষেত্রে ১০ হাজারের বিনিময়ে আমি ১০ হাজার ৫০০ টাকা পেলাম। এটাই সুদ। আর আমি আপনাকে বর্তমান বাজারমূল্যে দুই মণ ধান দিচ্ছি, যার মূল্য এক হাজার ৫০০ টাকা। এই শর্তে দিচ্ছি যে আপনি আমাকে ছয় মাস পরে দেবেন দুই হাজার টাকা। এটা আমি মুনাফা করলাম। দুটির মধ্যে পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে। একটা হলো টাকার বিনিময়ে টাকা। আরেকটা হলো ধানের বিনিময়ে টাকা। আবার ধানের বিনিময়ে যদি ধান নেওয়া হয়, তাহলে সেটা সুদ হয়ে যাবে। জিনিস দুটির ধরন যদি ভিন্ন হয়, তাহলে সেটা লাভ বা মুনাফা হয়ে যাবে এবং এটা চুক্তিভিত্তিক হতে হবে। সুদ ও মুনাফার মাঝে বেশ কিছু দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রয়েছে। সেগুলো হলো- ক. কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের উপর নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাকে সুদ বলা হয়। আর মুনাফা হচ্ছে- লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে ব্যাবসায়িক উপার্জন। খ. সুদের উপাদান হলো- সময়, সুদের হার ও ঋণের পরিমাণ। আর মুনাফা নির্ভর করে ব্যয়-সাশ্রয় ও অনুকুল চাহিদার উপর। গ. সুদের উৎপত্তি হলো ঋণ থেকে। ঋণ সুদমুক্তও হতে পারে। তবে ঋণ ছাড়া সুদের উৎপত্তি অসম্ভব। মুনাফার উৎস সৃষ্টি হয় ব্যবসায়ে সরাসরি মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে। ঘ. সুদের লগ্নীতে ঋণদাতা পুজি হারানোর ঝুকি বহন করে না। মুনাফার কারবারে মূলধনী ক্ষতির ঝুকি থাকে। পুজির যোগানদার এ ঝুকি বহন করে। ঙ. মূলধনী তহবিলে ঋণের পরিমাণ বেশি হলে প্রতিষ্ঠানের ঝুকি বাড়ে। লাভ-লোকসানের ভিত্তিকে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ার কারণে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুকি বাড়ে না। ফলে এ পদ্ধতিতে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। চ. সুদের ফল ঋণদাতা একা ভোগ করে। মুনাফা ভাগ হয় পুজির যোগানদার ও ব্যবহারকারী/সংগঠকের মাধ্যমে। ছ. একই ঋণচুক্তির বিপরীতে ঋণদাতা নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ বারবার পেতে পারে। এক্ষেত্রে চক্রবৃদ্ধিরও সুযোগ থাকে। কেনা-বেচার কারবারে কোনো পণ্যেও দাম একবার নির্ধারিত হয়। সে কেনা-বেচা থেকে মুনাফা একবারই পাওয়া যায়। কোনো কারণে সময় বেড়ে গেলেও মুনাফা বাড়ে না। সুদ ও মুনাফা নির্ধারণের কৌশলগত পার্থক্য : আসল ও সুদ যোগ করে সুদ-আসল নির্ধারণ করা হয়। সময় বৃদ্ধির সাথে সুদ চক্রাকারে বেড়ে যায়। আর মুনাফার ক্ষেত্রে মোট বিক্রয় মূল্য থেকে যাবতীয় খরচ বাদ দিলে মুনাফা বের হয়। শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য : ইসলামে সুদ চরমভাবে নিষিদ্ধ। কোনো ধরনের সুদের ব্যবসায়ই ইসলাম অনুমোদন করে না। আর মুনাফা ইসলামে অনুমোদিত। স্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে কারবার পরিচালনাকে ইসলাম উৎসাহিত করে। স্যারের কথা ছিল ইসলামের নাম নিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক নিয়মে পরিচালিত হয় কিনা।দেশের বিদ্যমান ইসলামী ব্যাংকগুলো পদ্ধতিগত ব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগ করছে কিনা। এক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তাদের দায়বোধ ও দায়িত্ব অনেক।যদি তা না হয় তাহলে জনগণ ও উপকারভোগীরা প্রতারিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। আমার খুব ভাল লাগছে আমার বিভাগীয় চেয়ারম্যান স্যার বর্তমানে জজ হিসেবে কর্মরত।যিনি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করতেন।দেওয়ানী কার্যবিধি পড়াতেন ও মোটকোর্ট পরিচালা করতেন।আমার মনে পড়ছে সে সময়ে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছিল।আমাদের সাংবিধানিক আইন পড়াতেন অল্পবয়ষ্ক, মেধাবী ও প্রতিভাবান এক শিক্ষক।তিনি আমাদেরকে এ্যাসাইনমেন্ট দিলেন “Caretaker Government:Re-thinking For New Idea.” এখানে আমি সর্বোচ্চ নম্বর পেলাম।৩০নম্বরের মধ্যে ২৭ পেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল পরীক্ষায় এল এল বি (আইন ও বিচার ) তে আমি ১ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হই। আসলে ভাল শিক্ষক ভাল পড়ায়।সেখান থেকেে ভাল কিছু অর্জন করা যায়,শেখাও যায়।সাংবিধানিক আইনের শিক্ষক উনিও বিচার বিভাগে চলে গেছেন।আন্তর্জাতিক আইন ও ভূমি আইন পড়াতেন দু ‘ শিক্ষক(ফি-মেইল)উনারাও জুডিসিয়ারীতে চলে যান।বিভিন্ন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডিগ্রীধারী মেধাবীদের উল্লেখযোগ্যরাই বিচার বিভাগে প্রবেশ করেন।এটা একটা ভাল দিক। কারণ ,বিচারক যদি ন্যায়পরায়ণ হন ,মেধাবী,চৌকষ,সুবিবেচক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হন, মানুষ সুবিচার পাবে।ঠিক তেমনি আইনপেশায়ও ভাল পেশাজীবির প্রয়োজন।কথায় আছে, শক্তিশালী আইনজীবি সম্প্রদায় শক্তিশালী বিচারক সম্প্রদায় সৃষ্টি করে।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
