গোলজার আহমদ হেলাল: কিছু দিন পূর্বে ফয়সলের বিয়েতে গিয়েছিলাম কুলাউড়ায়।তার সাথে অনেক স্মৃতি।বিয়ের আগের দিন যাওয়ার ইচ্ছা ছিল।ব্যস্ততার কারণে যেতে পারিনি।শুনেছি খালাম্মা গভীর রাত অবধি অপেক্ষা করেছেন।
২০০১ সালে প্রায় ৬মাস ছিলাম কুলাউড়ায় ভুকশিমইল ইউনিয়নে।হাকালুকির বুক চিরে বাঁধ ভাঙ্গা প্রবল জল উপেক্ষা করে নৌকা বেয়ে গিয়েছিলাম জাকিরের বাড়িতেে বাদে ভুকশিমইলে।জাকিরের বাাড়ীর আঙ্গিনা ডুবে বারান্দায় পানি।কিন্চিত বাকী ঘরে প্রবেশের।সে সময় ফয়সল,হোসাইন,ইকবাল,খয়রুল,আলিম উদ্দিন ও আরেক যাকির মিলে ৬জন সহ আমরা ৭জন গিয়েছিলাম জাকিরের বাড়ী।
সেদিন আমি দেখেছিলাম হাকালুকির যৌবন,তার উন্মত্ততা,তার বিশালতা ও ক্ষিপ্র্রতা।আমি উত্তাল হাকালুকি দেখেছি,শুুকিয়ে যাওয়া মৃন্ময় হাকালুকিও দেেখেছি।কিন্তু সেদিনের তেজ আর কখনও দেখিনি।প্রিয় ভাই জাকির ছিল জ্বরে আক্রান্ত।তারই অগ্রজ ফয়সাল ও সহপাঠি হোসাইনে’রা তাকে সমবেদনা জানাতে প্রবল জল অতিক্রম করে দেখতে গিয়েছিল।সেদিনের স্কুল পড়ুয়া(দাখিল ফলপ্র্রার্থী)ছেলেরা (পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত)যে সাহস দেখিয়েেছেে আমি রীতিমত অবাক হয়েছিলাম।তাদের আতিথেয়তায়য় মুগ্ধ হয়ে প্র্র্রীত হয়েছিলাম।।সত্যিকার অর্থে হাকালুকির বিশালতা ও উদারতা তাদের চরিত্রে
ঠাঁই পেয়েছেে।
হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাওর। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর আয়তন ১৮,১১৫ হেক্টর, তন্মধ্যে শুধুমাত্র বিলের আয়তন ৪,৪০০ হেক্টর। এটি মৌলভীবাজার জেলার় বড়লেখা (৪০%), কুলাউড়া (৩০%), এবং সিলেট জেলার় ফেঞ্চুগঞ্জ (১৫%), গোলাপগঞ্জ (১০%) এবং বিয়ানীবাজার (৫%) জুড়ে বিস্তৃত। ভূতাত্ত্বিকভাবে এর অবস্থান, উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড় এবং পূর্বে ত্রিপুরা পাহাড়ের পাদদেশে। ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে উজানে প্রচুর পাহাড় থাকায় হাকালুকি হাওরে প্রায় প্রতি বছরই আকষ্মিক বন্যা হয়।
শীতকালে হাওরের দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। চারিধারে জেগে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া কিঞ্চিত উঁচুভূমি বিলের পানিতে প্রতিচ্ছবি ফেলে সৃষ্টি করে অপরূপ দৃশ্যের। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হাওরের জলরাশির মাঝে সূর্যের প্রতিচ্ছবি বেশ মনোমুগ্ধকর। শীতকালে অতিথি পাখিরা সারি বেঁধে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসতে থাকে বিলগুলোতে।
পরিযায়ী পাখিদের আগমনে হাওর যেনো পরিণত হয় স্বর্গোদ্যানে। আর এ সময় অতিথি পাখিদের সাথে মিতালি গড়তে মানুষের কলকাকলিও বাড়ে হাওর পারে।
হাওরের স্বাদু ও মিঠাপানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে, আইড়, চিতল, বাউশ, পাবদা, মাগুর, শিং, কৈসহ আরও নানা প্রজাতির দেশীয় বিলুপ্তির পথের মাছগুলো। ২৪০ টি ছোট, বড় ও মাঝারি বিল রয়েছে।শীতকালে এসব বিলকে ঘিরে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে উঠে গোটা এলাকা।২৪০টি বিল নিয়ে গঠিত হাকালুকি হাওরের বিলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বর্ষাকালে এই হাওরে ধারণ করে এক অনবদ্য রূপ। চারদিকে শুধু পানি আর পানির খেলা। সে এক অপরূপ দৃশ্য।
জনশ্রুতিমতে, বহু বছর আগে ত্রিপুরার মহারাজা ওমর মানিক্যের সেনাবাহিনীর ভয়ে বড়লেখার কুকি দলপতি হাঙ্গর সিং জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় এমনভাবে লুকি দেয় বা লুকিয়ে যায় যে, কালক্রমে ঐ এলাকার নাম হয় “হাঙ্গর লুকি”, ধীরে ধীরে তা “হাকালুকি”-তে পর্যবসিত হয়। আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রচন্ড এক ভূমিকম্পে “আকা” নামে এক রাজা ও তাঁর রাজত্ব মাটির নিচে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। কালক্রমে এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় “আকালুকি” বা হাকালুকি। আরো প্রচলিত যে, এক সময় বড়লেখা থানার পশ্চিমাংশে “হেংকেল” নামে একটি উপজাতি বাস করতো। পরবর্তিতে এই “হেংকেলুকি” হাকালুকি নাম ধারণ করে। এও প্রচলিত যে, হাকালুকি হাওরের কাছাকাছি একসময় বাস করতো কুকি, নাগা উপজাতিরা। তাঁদের নিজস্ব উপজাতীয় ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করা হয় “হাকালুকি”, যার অর্থ ‘লুকানো সম্পদ’।
হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা বিবেচনা করা হয়। এটি জলাভূমির সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং টেকসই ব্যবহারের জন্য রামসার এলাকা হিসেবে এটি সংরক্ষিত।
হাকালুকি হাওরের স্থায়ী জলাশয়গুলোতে বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ জন্মে। এক সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয়, ভাসমান বড় বড় গাছপালা (swamp forest) এখন আর নেই। চাতলা বিল-এ ছোট আকারের এরকম একটি বন আছে (২০০০ খ্রিস্টাব্দ)। এখানে ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪১৭ প্রজাতির পাখি, এর মধ্যে ১১২ প্রজাতির অতিথি পাখি ও ৩০৫ প্রজাতির দেশীয় পাখি। এছাড়া ১৪১ প্রজাতির অনান্য বন্যপ্রাণী, ১০৭ প্রজাতির মাছ, তন্মধ্যে ৩২ প্রজাতি বিভিন্ন পর্যায়ে বিপন্নপ্রায়। এছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের কীট-পতঙ্গ, জলজ ও স্থলজ ক্ষুদ্র অনুজীব। ইকো-ট্যুরিজমের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হাকালুকি হাওরসহ সাতটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। উপরোক্ত প্রাকৃতিক উপাদান ছাড়াও রয়েছে স্থানীয় পেশাজীবি মানুষের ইতিহাস, সামাজিক আচার, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। ১৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ১২০প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, বিলুপ্ত প্রায় ২০ প্রজাতির সরীসৃপ। এখানে প্রতি বছরশীতকালে প্রায় ২০০ বিরল প্রজাতির অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। হাকালুকি হাওর টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, ইকোটুরিজ্যম শিল্প বিকাশের এক অসাধারণআধার।
হাকালুকি হাওড় বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন রূপ ধারন করে। বর্ষাকালে এই হাওড়টি একটি অথৈ সাগরে পরিনত হয়। আবার শীতকালে এই হাওড়ের রূপ হয় অন্যরকম। পুরো হাওরই দেখার মতো। সমুদ্রের মতো বিশাল ঢেউ, চারদিকে পানি আর পানি। অনেক দূরে দূরে গ্রাম।
ফয়সলের বিয়ের দিন কুলাউড়া ষ্টেশনে নেমে রহিম কে ফোন করলাম।রহিমের বাসা পৌর শহরের মাগুুড়া এলাকায়।রহিম শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করে একটি বেসরকারী সংস্থার জেলা পর্যায়ের সবচেয়ে বড় পদে কর্মরত আছেন।মেধাবী,দক্ষ,পরিশ্রমী ও পরিপাটি হিসেবে ছাত্রজীবন থেকেই সুনামের অধিকারী।বিয়ে শেষে রহিমের প্রশান্তিময় সৌন্দর্যমন্ড সৌন্দর্যমন্ডিত বাসায় কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার ট্রেনে আবিরসহ ফিরলাম।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
