গোলজার আহমদ হেলাল : ১৯৯৯ সাল।সম্ভবত ফেব্রুয়ারী অথবা মার্চ মাস।সদ্য জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাল কাটাচ্ছি।মুক্তির ২/৩ দিন পর আমরা কাজল শাহ তে যাই।আমারই বন্ধু এবং আমার জেলমেট রিপনের বাবা মা’র সাথে সাক্ষাৎ করতে।
আমি,রিপন ও ইকবাল।আমাদের সাথে আমাদের বড় ভাই এম সি কলেজের গণিত বিভাগের মেধাবী ছাত্র রাজু মু.শিবলী ভাই ছিলেন।সিলেটের গোলাপগন্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বনেদী পরিবারের এক সন্তান শিবলী ভাই।গুণে- মানে,রুপ –সৌন্দর্য্যে,মেধা-প্রজ্ঞায় ভরপুর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের ও নানাবিধ মানবীয় গুণাবলী ছিল তাঁর মাঝে।ধীর-স্থির ও শান্ত-স্বভাবের সেই ভাইটি যে কারো উপর অতি সহজে প্রভাব ফেলতে পারতেন।
আমরা দেখেছি এম সি কলেজের সর্বস্থরের ছাত্ররা তাঁকে শ্রদ্ধা ও সমীহ করত।কলেজ ছাত্রাবাসে তাঁর নৈতিক প্রভাব ছিল অসাধারণ।তিনি কলেজ,জেলা-মহানগর ছাড়িয়ে সারাদেশে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।একটি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ও কাজ করেছেন।আসলে এ ধরনের বিরল প্রতিভাসম্পন্ন লোকগুলো জাতীয় নেতৃত্বে গেলে পরিবর্তন আসবে।
আজকের বাংলাদেশে বিভিন্ন দলের নেতৃত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন।হিংসা-বিদ্বেষ ,হানাহানি,অন্তর্দ্বন্দ,অন্তর্জ্বালা ইত্যাদিতে রাজনৈতিক দলগুলো আক্রান্ত।আওয়ামীলীগ,বিএনপি সহ ইসলামীদল গুলোতেও ইহা বিরাজমান।বরঞ্চ ইসলামের নাম নিয়ে পরিচালিত দলগুলোতে বেশী।বুর্জোয়া দলগুলোতে প্রকাশ পায় আর অবুর্জোয়া বা আদর্শবাদী আন্দোলনে প্রকাশ পায় না।দলগুলোর শীর্ষপদের লোকগুলোর যাঁতাকলে কর্মীরা পিষ্ঠ হয়।জেলা মহানগরের নেতৃত্বে থাকে সিন্ডিকেট।আর এখানেই পর্যুদস্ত হয় গণতন্ত্র।
আমরা যখন কলেজে পড়ি তখন রাজনৈতিক দলগুলো আদর্শের মানদন্ডে ছিল উত্তীর্ণ।বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সিনিয়র এক ভাই পাঠচক্রের দাওয়াত দিয়েছিলেন।চুপে চুপে গিয়েছিলাম।জনচারেক ছাত্রের সেই সভায় এক নেতা সাম্যবাদের উপর বিশাল গবেষণামুলক কথা রাখছিলেন।অধ্যয়ন এর উপর দখল যে তাঁর আছে তা বুঝতে বাকী থাকল না।তিনি সাম্যবাদের একাল সেকাল সম্পর্কে অনেক কথা বললেন।তিনি বলেন মার্কসীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের ভিত্তি হল দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের সূত্রের সাহায্যে বস্তুর অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও তার ফলে বস্তুর বিকাশের চিরকালীন ও সার্বজনীন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে মার্কস-এঙ্গেলস সমাজ বিকাশের চারটি স্তরের কথা বলেছেন। (১) আদিম সাম্যবাদী সমাজ। (২) দাস সমাজ। (৩) সামন্ততান্ত্রিক সমাজ। (৪) পূঁজিবাদী সমাজ।
আদিম সাম্যবাদী সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, তাই কোনো শ্রেণী বা শ্রেণীশোষণও ছিলো না। শোষন ছিলো না বলেই শোষনের অস্ত্র রাষ্ট্রও ছিলো না। দাসসমাজে দাসসমেত সকল উৎপাদন, উপাদান এবং উৎপন্ন সামগ্রীর মালিক ছিলো পরশ্রমভোগী দাসপ্রভুরা। দাসযুগের দাসদের নির্মম নির্যাতনের উপর নির্ভর করত রাষ্ট্রের সুখ-সমৃদ্ধি। সামজ বিকাশের এই যুগেই শ্রেণীশাসন ও শ্রেণীশোষনের সূত্রপাত হয়। এই শুরু হলো শ্রেণীশোষনের ইতিহাস। এছাড়া আরো অনেক কথা বললেন।
সেই সময় ডানপন্থী ইসলামী আদর্শের একজন আমাকে উপহার দিলেন শব্দার্থে আল কুরআনুল মজিদ।আল কুরআনের ৩০তম পারার বঙ্গানুবাদ।আমার হৃদয় মনকে আলোড়িত করল ইহা।জীবন পরিবর্তনের সূচনা এখানেই।কুরআনের মুগ্ধতাই মানুষকে জীবন সম্পর্কে ধারণা দেয়।
আমরা গেলাম নগরীর কাজলশাহের দুতলা বাসায়।শীতের পড়ন্ত বিকেলে।সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহুর্তে। সেদিনের শহরের কথাও দৃশ্য আমার চোখে যেন ভাসছে।আজকের সিলেট শহর আর প্রায় দেড়যুগ পূর্বের সিলেট শহরের অনেক তফাৎ।এখনকার মতো দূষিত বাতাস কিংবা অনিয়ন্ত্রিত বিল্ডিং তখন ছিল না।কবির কবিতায় সেই দৃশ্যের রুপ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে আমরা তা উপভোগ করেছি।কবি বলেন,”চারিদিক ধোঁয়া ধোঁয়া,দিন ডুবি-ডুবি ৷সাঁঝের আগমনে পাটে গেলো রবি ৷ ” সত্যিই শীতের বিকেল অনেক সুন্দর, সন্দেহ নেই। কেন সুন্দর তা আমার জানা নেই। তবে একটি কথা বলতে পারি, শেষ বিকেলের চঞ্চল সোনালী রোদটাকে আমার ভাল লাগে। অনেক বেশি ভাল লাগে।সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকন করে আমরা সে বাড়ীটিতে প্রবেশ করি।
রিপনের আব্বা রাজশাহীতে জেলা জজ আদালতের বিচারক।অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কর্মরত আছেন।অত্যন্ত ধী -শক্তি সম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান।এ ধরনের বিচারক সত্যিই বিরল।তাঁর সাথে বেশ কিছু সময় কাটালাম।আমাদেরকে পিতৃসুলভ আচরণে অনেক উপদেশ দিলেন।মনে হল তিনি এক উদার হৃদয়ের ব্যক্তিত্ববান পুরুষ।তিনি বললেন, তিনিও একসময় ছাত্রজীবনে জেল খেটেছেন।ছাত্রজীবনে ছাত্ররাজনীতিও করেছেন।বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।প্রসঙ্গক্রমে,আমিও বলে ফেললাম এক সময় ছাত্র ইউনিয়নের মিটিংয়ে গিয়েছি।তিনি কোন মন্তব্য করেন নি।পরে ভাবলাম তিনি তো একজন বিচারক।তাঁর একটি কথা এখনো মনে পড়ে,’তিনি বলেছিলেন,বেসিক ভালো হলে সেই ব্যক্তি সমাজের লোকজনকে ন্যায়বিচার-সুবিচার উপহার দিতে পারবে।এখানে ডিগ্রী ফেক্টর নয়,দলও বিবেচ্য নয়।মুল কথা হল শীর্ষপদের লোক দুরাচার কিনা।“
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
