গোলজার আহমদ হেলাল: ৩০/১২/১৯৯৮ ইং তারিখে নতুন সূর্যের সাথে পরিচিত হলাম । প্রখর রোদ্র ,সোনার রবি সকালেই যেন বিমাতাসুলভ আচরণ করে ফেলছে মনে হলো। কারা জীবনের প্রথম দিবসের প্রথম সকালেই আমাদের পায়ে ডান্ডাবেরী পরানো হলো । সে এক লোমহর্ষক কাহিনী । জেল কোডের বিধান অনুযায়ী মামলা বেশী হলে ( ৩ বা এর অধিক ) ডান্ডাবেরী লাগাতে হয় । করার কিছু নেই , যা হবার তো হবে ।
মেয়াসাব বললেন , বাপুরা কি করব বল তো ,এটা একটি বিধি । আমরা বললাম না আংকেল । ঠিক আছে ,আপনার কাজ আপনি করুন। জেলে কারারক্ষীদের মেয়াসাব বলে লোকজন ডাকে । হাঁটা – চলা, খাওয়া- দাওয়া, বিশ্রাম- শোয়া , শৌচকার্য সম্পন্ন করতে দারুন ভাবে কষ্ট লাগত । কী আর উপায় ।
রিপন তো জজ সাহেবের ছেলে । তারও পায়ে ডান্ডাবেরী । আর আমি তো কৃষকের ছেলে । আমি এবং ইকবাল মোটামুটি ভেঙ্গে পড়িনি । সে (রিপন )ভেঙ্গে পড়েছিল। তাকে আমরা শান্তনা দিতাম। ঐ দিন বিকালে সোহেল ভাই (কাউন্সিলার সোহেল ) এবং কবির ভাই (বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যানের ছোট ভাই ) দেখা করলেন । রেহান উদ্দিন রায়হান ভাই (সাবেক চেয়ারম্যান) এবং আবু সাঈদ ভাই ও দেখা করলেন । আরও অনেকে। মনে নেই ।কবির ভাই বললেন ,জয়নাল ভাই ( বর্তমানে জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ) সালাম দিয়েছেন আর তোমাদের জন্য ইফতারী পাঠিয়েছেন । আমরা খুবই খুশী হলাম।
তোপখানার নুরুল ভাই আমাদের সাথে ছিলেন।তাঁরও বাসা থেকে তার বৃদ্ধ আব্বা আজ ইফতারী নিয়ে আসলেন।আমরা খুব মজা করে হরেক রকম আইটেম দিয়ে ইফতার করলাম।
নুরুল ইসলাম ভাই জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। নগরীর তোপখানার প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান তিনি।কোনদিন জেল খাটেন নি।আমাদের মত। আলালের ঘরের দুলাল।ধনী লোক।টাকা-পয়সার অভাব নেই।ঘটনাচক্রে কারাবন্দী।তাঁর এক আত্মীয়কে পুলিশ অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে আসে।থানায় এসে মিথ্যা কথা সহ্য করতে না পেরে এক পুলিশকে তিনি শারীরিক ভাবে লাঞ্চিত করেন।থানার ভিতরে বলে কথা।পুলিশ তৎক্ষণাত তাঁকে গ্রেফতার করে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
আমদানী ওয়ার্ড থেকে সকালে আমাদের স্থানান্তর করে দেয়ার কথা থাকলেও মুক্তির পূর্ব পর্যন্ত আমাদের কে এ ওয়ার্ডেই বসবাস করতে হল।
নুরুল ভাইয়ের আব্বা পরদিন সকালে দেখতে এলেন।বললেন,গতকাল তোমাদের যেগুলো পাঠিয়েছিলাম,সেগুলো পেয়েছো তো।ইফতারীর যে সকল আইটেম এর কথা উনি বললেন,আমাদের কাছে মনে হলো তার অর্ধেকই আসেনি।জেল গেট থেকে ওয়ার্ডে আসতে লাপাত্তা।রাইটার রা গায়েব করেছে।জেলের অভ্যন্তরে বন্দিদের কাছে যারা খবর টবর বা কোন জিনিস পাঠায় কিংবা আদান-প্রদান করে তাদেরকে রাইটার বলা হয়।তারাও বন্দি।
আমরা আশ্বর্য হলাম। পরে ভাবলাম,এটা ই তো নিয়তি।ঐ রিযক তাদেরই জন্য।নুরুল ভাই কে বললাম।নো টেনশন।যদিও তিনি আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়।
অল্পদিনের মধ্যেই লাল দালানের প্রতিটি ইটের সাথে আমাদের সম্পর্ক হয়ে গেলো ।৩দিন পর ডান্ডাবেরী খুলে দেয়া হলো। মাওলানা খুব জোরে শোরে অনুরোধ জানালেন । আল্লাহর রহমতে ডান্ডাবেরীর যন্ত্রনার অবসান ঘটলো ।পরের দিন খবর এল পুলিশ রিপনকে Remand এর আবেদন করেছে। রিপনের অবস্থা আবারো খারাপ হয়ে গেলো।আমরা তাকে অভয়বাণী শোনালাম আর মুক্তির প্রহর গুণতে থাকলাম।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
