গোলজার আহমদ হেলাল : আজ হতে প্রায় দু’যুগ পূর্বে শেকড় সন্ধানী লেখক ও গবেষক মরহুম সৈয়দ মোস্তফা কামাল বলেছিলেন,” ও মাওলানা,জৈন্তায় একটা সভা আয়োজন কর।আমি যাইমু।জৈন্তার ইতিহাস কিছু মাইনষরে কইমু।তোমরা জানরায় না ।আর বুঝরায় না, এত সুন্দর জৈন্তা-জাফলং নষ্ট করিওনা।”
উনার সেদিনের কথা তাঁর ভাষায় প্রকাশ করতে না পারলেও মুল কথা যে তাই,আমার হুবহু এখনও স্মরণ আছে।জাফলং সৌন্দর্যের রাণী,অনেকে প্রকৃতি কন্যাও বলে থাকেন।রূপ আর প্রকৃতির অসাধারণ বৈশিষ্ট্যর ধরুণ লোকজন এ ধরনের অভিধায় অভিহিত করে জাফলংকে।
ইতিহাস-ঐতিহ্যে স্ব-গরিমায় মহিমান্বিত ও নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ খ্যাত প্রান্তিক অঞ্চল সিলেট। আর এর উত্তর পূর্বাংশে অবস্থিত স্বর্গীয় মহিমায় গড়া পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, হাওর-বিল, চা-বাগান, বৃক্ষরাজি এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার ও নৈসর্গিক সম্পদে ভরপুর সমৃদ্ধ এলাকা জাফলং। শৈশবের জাফলং এর স্মৃতি অবর্ণনীয় ও ভোলার মতো নয়। জাফলংয়ের স্মৃতি আজ ঠিকই মনে উকি দেয় বার বার ,কিন্তু প্রকৃতি কন্যার সেই রুপ-জৌলুস এখন আর আগের মতো নেই। শকুনীদের বিষাক্ত থাবায় ক্ষত-বিক্ষত জাফলং।জাফলং আজ খন্ড-বিখন্ড।
২০ ডিসেম্বর ২০১৬ সিলেটে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর উদ্যোগে ‘নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের আধার জাফলং সংরক্ষণ: প্রয়োজন আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্টিত হয়।সভায় বক্তারা বলেন, জাফলংয়ের পাথর কাটার ফলে পরিবেশ বিপর্যয় তথা শব্দ দুষণ, বায়ু দুষণ ইত্যাদির ফলে মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জাফলং এর পরিবেশ বিপর্যয় রোধে তারা সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।আমি সেই সভায় ছিলাম।এটা একটি হাই প্রোফাইল মিটিং ছিল।সিলেটের মাননীয় জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,সরকারের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ,এনজিও ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ,সাংবাদিক,জনপ্রতিনিধি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় এলাকার জনগণও সেখানে ছিলেন।
ঘটনাচক্রে ঐ দিন বিকেলে মোস্তফা কামাল স্মরণে আলোচনা সভার দাওয়াত পাই।২০ ডিসেম্বর উনার মৃত্যুবার্ষিকী সেটা ভূলেই গিয়েছিলাম। যাই হোক সারাদিন ব্যস্ত থাকার পরও নিজের বিবেক ও দায়বোধ থেকেই সন্ধ্যার পর মরহুম সেই গুণী ব্যাক্তির স্মরণ সভায় হাজির হই।
আমি এম সি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাঁরই লেখা “এম সি কলেজ: স্মৃতি-বিস্মৃতির জাগ্রত অতীত” পুস্তকখানি পড়ে বিমোহিত হই। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্মে।আমার ভাবতে অবাক লাগে ,জাফলং আজ বিরানভূমি হয়েছে।তিনি সেদিন কোন শক্তি দিয়ে সেটা উপলব্ধি করলেন।
সত্যিকার অর্থে তিনি একজন মহামানব,দার্শনিক ও ক্ষণজন্মা পুরুষ।আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
