আমরা সুখী বলে হাসি না, বরং হাসি বলেই সুখী। // উইলিয়াম জেমস //

by News Room

মুজাহিদ মসি:রোগী গেলেন ডাক্তারের কাছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন হার্টের সমস্যা, কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি, নিয়মমতো খাবেন। আর আপাতত কিছুদিন ভারী পরিশ্রম হয় এমন কাজগুলো করবেন না, অন্তত এক মাস সিঁড়িভাঙা পুরোপুরি নিষেধ।
মাসখানেক পর রোগী পুনরায় গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার সব দেখেশুনে বললেন, আপনার হার্টের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। এখন আর সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে কোনো অসুবিধা নেই। এই শুনে রোগী মহাখুশি হয়ে বলবেন ‘উফ্, বাঁচালেন ডাক্তার সাহেব, পানির পাইপ বেয়ে বাসায় ওঠা যে কী কষ্টের, এই কদিনে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি!’
পুরানো কৌতুক। তা বটে। কিন্তু দরকার কী হাসি থামানোর? আপনি না হয় নতুন করেই হাসলেন। তাতে ক্ষতি নেই, বরং লাভ আছে ঢের। তাই হাসুন, প্রাণখুলে হাসুন। আনন্দে বাঁচুন।
হাসি ‘ইন্টারনাল জগিং’
সুস্বাস্থ্যের সর্বোত্তম দাওয়াই হতে পারে হাসি। খোদ চিকিৎসকরাই বলছেন এমন কথা। স্বাস্থ্যের ওপর হাসির প্রভাব নিয়ে প্রথম গবেষণা করেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডা. উইলিয়াম ফ্রাই। তার মতে, হাসি এক ধরনের ব্যায়ামের কাজ করে। প্রাণবন্ত হাসির দমকে দমকে কেঁপে ওঠে হৃৎপি-, ফুসফুস, পেট ও মুখের পেশিগুলো। ফলে চমৎকার ব্যায়াম হয় এদের এবং পর্যাপ্ত রক্তসঞ্চালন ঘটে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছে যায় হৃৎপি-, ফুসফুস ও বিভিন্ন পেশিতে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাশাপাশি পাকস্থলিতেও রক্তসঞ্চালন বাড়ে। ফলে হজম প্রক্রিয়া ভালো হয়। স্বাস্থ্য-গবেষকরা তাই হাসিকে অভিহিত করেছেন ‘ইন্টারনাল জগিং’ হিসেবে।ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা ইউনিভার্সিটির মেডিসিনের প্রফেসর ডা. লি ব্রেক বলেন, হাসি কখনো কখনো সত্যিকার ওষুধের মতোই কাজ করে। হাসিতে শিরা ও ধমনী-পথে রক্ত চলাচল সুষম হয়। ফলে দেহকোষে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ে। তাই শুধু নয়, রক্তনালীর, বিশেষত ধমনীর অযাচিত সংকোচন রোধেও হাসির রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি পরিচালিত গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, হাস্যপ্রবণ মানুষদের হৃৎস্বাস্থ্য তুলনামূলক ভালো থাকে।
হাসি মানসিক স্বাস্থের সহায়ক
হাসি আপনার শারীরিক মানসিক আবেগীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখে। মনের বোঝা কমায়। আপনি কিছুটা হলেও ভারমুক্ত হন। তাতে সাইকো-সোমাটিক ডিজিজ বা মনোদৈহিক রোগে ভোগার আশঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই কমে। এছাড়াও টেনশনজনিত মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন নিরাময়ে হাসির ভূমিকা ইতোমধ্যে একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত।
হাসিতে নিদ্রাহীনতা দূর
হাসিতে পেশির সংকোচন কমে, পেশি শিথিল হয়। সে-কারণেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এটি ভালো ঘুমে সহায়ক। বলা হচ্ছে, হাসি ইনসমনিয়া থেকে মুক্তি দিতে পারে।
হাসিতে স্মৃতিশক্তি অটুট
যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, হাসি স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা বাড়ায়। সৃজনশীলতা হয়ে ওঠে শাণিত। সবসময় হাসিখুশি থাকেন এমন মানুষদের ওপর গবেষণা চালিয়েই মিলেছে এসব তথ্যপ্রমাণ।
হাসিতে ব্যথা উপশম
হাসি আপনার ব্যথা ও শারীরিক যন্ত্রণার অনুভূতি কমায়। আনন্দময় প্রাণখোলা হাসিতে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসৃত হয় এন্ডোরফিন, যা ব্যথার অনুভূতি কমিয়ে দেয়। একবার প্রাণখোলা হাসি শরীরের মাংসপেশিকে শিথিল রাখতে পারে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ মিনিটের উচ্ছল হাসি পরবর্তী দু-ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যথামুক্তির কাজ করতে পারে।
হাসি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়সদা হাস্যময় ও উৎফুল-চিত্তে থাকেন যারা, তাদের রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে অধিকতর সংহত। দেখা গেছে, এধরনের মানুষের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম উপাদান গামা ইন্টারফেরন ও টি সেল-এর কার্যকারিতা অপেক্ষাকৃত বেশি থাকে। আর তাতে কমে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি। হাসিকে তাই ন্যাচারাল এন্টিবায়োটিক বা প্রাকৃতিক জীবাণুরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
হাসি ক্যান্সার প্রতিরোধক
হাসির রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধী ক্ষমতা। স্বাভাবিক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়ায় আমাদের শরীরে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে ক্যান্সার সেল। কিন্তু তা টিউমারে রূপ নেওয়ার আগেই আমাদের রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ন্যাচারাল কিলার সেল ক্যান্সার সেলগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিয়মিত হাসিতে ন্যাচারাল কিলার সেল-এর কার্যকারিতা বাড়ে।
লাফ অ্যান্ড বি হ্যাপি
মন খুলে যে হাসতে পারে না সেই পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী ব্যক্তি। কথাটা পন্ডিতজন লিলির।
হাসি আপনাকে সুখী করে। বাড়ায় আপনার ইতিবাচকতা বোধ। আপনাকে স্ট্রেস থেকে দূরে রাখে। জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। স্থায়ী করে আপনার আনন্দের অনুভূতি। আমাদের চারপাশের বন্ধু প্রিয়জন আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যাদের আমরা পছন্দ করি, যারা তুলনামূলক জনপ্রিয়, যাদের সঙ্গ আমাদের ভালো লাগে তাদের সবার একটি জায়গায় খুব মিল তারা হাসেন, জীবনের কোনো না কোনো কিছু নিয়ে তারা সবসময়ই থাকেন হাসিখুশি আর আনন্দ-উৎফুল্ল।
আপনি হাসলে হাসবে আপনার চারপাশ
হাসি মানুষের ছোঁয়াচে অনুভূতি। একজন হাসলে পাশের জন বুঝে না-বুঝে হাসা শুরু করে দেয়।

You may also like

Leave a Comment