গোলজার আহমদ হেলাল : মাতা,মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা এই তিনটি পরম শ্রদ্ধার বস্তু।কথাগুলো বলেছিলেন বহুভাষাবিদ পন্ডিত ড:মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী,শিক্ষাবিদ,ভাষাবিদ, লেখক, গবেষক ও সমাজ সংস্কারক। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে তাঁর গবেষণা আজো অতুলনীয়। তিনি ২৪টি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন, এগুলোর মধ্যে ১৮টি ভাষার ওপর তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিলো। বিশেষ করে হিন্দুদের ধর্মীয় ভাষা সংস্কৃতের ওপর তাঁর পান্ডিত্য ছিল অসাধারণ।
ভারতীয় উপমহাদেশে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় ইরানের বিশিষ্ট কবি হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের বই অনুবাদ করেন। একনিষ্ঠ ধার্মিক হিসেবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কুরআন হাদিসের অনুবাদ যেমন করেছিলেন, তেমনি ধর্মপ্রচারেও সক্রিয় ছিলেন। জ্ঞান-সাধনার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন বলেই শিক্ষিত সমাজে তাঁকে “চলমান বিশ্বকোষ” হিসেবে সম্মান করা হতো।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রধানতঃ বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে, এই উপমহাদেশে এমন এক অনন্য প্রতিভা যাঁর পরিচয় শুধু প্রশংসার শব্দ উচ্চারণ করে দেয়া চলে না। তিনি জ্ঞানকে শুধু গ্রহণই করেননি, সর্বত্র সেই জ্ঞানের তাপকে ছড়িয়েছিলেন। ভাষা সাধনার ক্ষেত্রে তাঁর কৌতুহল এবং অন্বেষণের কৃতিত্ব অসাধারণ। ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী হয়েছিলেন।
“ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ র জীবনী আমি লিখছি না।কথাগুলো উল্লেখ করার এক বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।আমরা যখন ছোটবেলা অতিক্রম করি।প্রাইমারীতে যখন পাঠ নিয়েছি তখন গুরুজনেরা নীতিবাক্য হিসেবে এগুলো বলতেন।উদ্দেশ্য হলো এই রকম মহামানবদের পদাংক অনুসরণ করে জীবনকে বিকশিত করা।আর মাতা,মাতৃভূমি আর মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা করা।
রোজ বিহানে সবুজ ঘাসের সেই শিশিরবিন্দু মাড়িয়ে পাঠশালাতে যাওয়া সত্যিই আনন্দকর।রোমাঞ্চকর তো বটেই।সেকালে স্কুলের মাস্টাররা বাড়ী বাড়ী গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করতেন।তার চেয়ে বেশী করতেন কাউন্সিলিং।লেখাপড়া করলে কি হবে,মানুষকে শিক্ষিত কেন হতে হবে,ইত্যাদি।
কিন্তু সে সময় প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজের চিন্তা না করে যারা সন্তানদের শিক্ষালয়ে পাঠিয়েছেন তারা অবশ্যই দুরদর্শী। তারা পশ্চাৎপদ চিন্তা বাদ দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়েছেন। তারা সামন্তবাদকে গ্রহণ করেন নি।মাথাও নত করেন নি।আমার বাবা সেই দুরদর্শীদের একজন।
আজ নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়।বাবা থাকলে সেই অসহায়ত্ব থাকত না।
সেদিন পত্রিকার পাতায় দেখলাম ঢাকা আন্তার্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারছেন না।টাকার অভাবে।আমার ভাবতে অবাক লাগে।আসলে মুল বিষয় হলো আমরা আমাদের গন্তব্যস্থল এবং এ পথের রেখাচিত্র অংকন করতে পারছি না।
আজকে মু. শহীদুল্লাহ এর মতো বিদগ্ধ গুণীজন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। নেই সেখানে গবেষণা,মনোযোগ ও প্রেষণা।আছে শুধু রাজনীতি।আমার স্যার জগবন বাবু ও মহেশ বাবু কত না আদর করে অংক শিখাতেন।জগ বাবুর দুটি মেয়ে ছিল ।চন্দনা ও ঝরণা।খুবই মেধাবী।কিন্তু স্যার কোন রকম তফাত করতেন না আমাদের মাঝে।তিনি খুব সহজ সরল ভাবে পিতৃসুলভ আচরণ দিয়ে আমাদের শিক্ষা দিতেন।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
