সিলেটে রাষ্ট্রপতি:শুধু সরকারী চাকুরী নয় ডিগ্রীপ্রাপ্তদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহবান

by News Room

স্টাফ রিপোর্ট: সিলেট নগরীর রাস্তাঘাটের অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো্. আব্দুল হামিদ। সড়কের এই অপরিচ্ছন্নতার কারণে তাঁর মন খারাপ হয়েছে বলেও জানান রাষ্টপতি।আজ বুধবার বিকেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেন রাষ্টপতি।
সমবার্তনে লিখিত বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, আমি সিলেটকে মনে করেছিলাম অনেক সুন্দর, পরিচ্ছন্ন একটা শহর। কিন্তু এখানে এসে আমার মন খারাপ হয়েছে। সিলেটে এসে দেখি রাস্তাঘাটগুলো অপিরচ্ছন্ন। যোখানে সেখানে পলিথিন, কলার ছোলা, কাগজ পড়ে আছে।এখানে তো ক্যান্টনমেন্ট আছে,কত পরিষ্কার। বিদেশের রাস্তা-ঘাটে থুথু ফেলতেও মানুষ ভয় পায়, অথচ আমাদের দেশে মানুষ নোংরা করার আগেও একবারও ভাবে না। তাদের পরিষ্কারের মানসিকতা হারিয়ে গেছে।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, সবাই মিলে আমাদের শহরহুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। এব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বুধবার দুপুরে হেলিকাপ্টারযোগে সিলেট আসেন রাষ্ট্রপতি। সিলেট এসে প্রথমে হযরত  শাহজালাল (র.) ও শাহপরান (র.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর যোগ দেন শাবির সমাবর্তনে।

শাবির সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

সমাবর্তনে ২০০০-০১ থেকে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের ৬ হাজার ৭৫০ জন গ্র্যাজুয়েটের ডিগ্রি প্রদান করেন রাষ্ট্রপতি। তাদের মধ্যে ২০ জন শিক্ষার্থীকে দেয়া হয় রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক। প্রায় এক যুগ পরে হওয়া শাবিপ্রবির এই ৩য় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শাবিপ্রবির রেজিস্টার ইশফাকুল হোসেনের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ।।

রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বলেছেন, ফলমূল শাকসবজি সবকিছুতেই এখন ফরমালিন। যারা খাবারে ফরমালিন মেশাচ্ছে তারা গণহত্যাকারী। তাদের প্রতিহত করতে না পারলে জাতি পঙ্গু হয়ে যাবে।এরা লুটপাটকারী ব্যবসায়ী।

রাষ্ট্রপতি বলেন, পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রই এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলছে। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর নতুন এই বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত যেকোন অসামর্থ্যই দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশকেও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। এরজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নিরন্তর গবেষণা। নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও তার প্রসারের ওপরই নির্ভর করে দেশের সমৃদ্ধি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর বুকে বুকে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নশীল একটি দেশ। দারিদ্র নিরসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নে বহির্বিশ্বে দেশটি এখন রোল মডেল। বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ওপরে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা ২০২৪ সাল নাগাদ এই হার হবে ১০ শতাংশের উপরে। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সময় এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাওয়ার। সময় এখন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার, পথ চলবার। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ও অগ্রযাত্রায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের অবদান খুবই প্রশংসনীয়। এ দেশের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, পরিশ্রমী, উদ্যমী, লড়াকু ও সংবেদনশীল জনগণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে।

গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, যে-কোনো দেশের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনে তরুণ সমাজ-ই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং আজ তোমরা যারা গ্র্যাজুয়েট হলে, আমার সামনে এই যে তরুণ, তোমরা এক-একটি আলোর প্রদীপ, তোমাদের সকলকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় এগিয়ে আসতে হবে। নিতে হবে দেশ ও জাতির দায়ভার। আমি মনে করি তোমাদের মেধা ও শ্রমেই গড়ে উঠবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা। বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর জ্ঞানতপস্যা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে তোমরা ডিগ্রি অর্জন করেছো। তোমরা ভাল করেই জানো তোমাদের বিদ্যালাভ ও সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে যারা শক্তি, সাহস ও অর্থ জুগিয়েছেন তাঁরা হচ্ছেন এ দেশের জনগণ। তাই বাংলাদেশের জনগণের প্রতি জীবনব্যাপী তোমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতি প্রত্যাশা করে।তিনি বিল গেটস ও ফজলে হাসান আবেদের কথা উল্লেখ করে গ্রাজুয়েটদের বলেন,তোমরা শুধু সরকারী চাকুরী কেন উদোক্তা হয়ে মানুষকে চাকুরী দিবে,এটাই জাতি প্রত্যাশা করে।

এবারের সমাবর্তনে মোট ছয় হাজার ৭৫০ শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এদের মধ্যে স্নাতকে চার হাজার ৬১৭ জন, স্নাতকোত্তরে এক হাজার ১২৭, পিএইচডি দুজন, এমবিবিএস ৮৭৮, এমএস ও এমডি ডিগ্রিধারী ছয়জন এবং নার্সিংয়ের ১২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।রাষ্ট্রপতি স্মৃতিচারণ করে বলেন, সিলেটের কমলার স্বাদ অনন্য। যারাই এই কমলা খান, তারাই এই স্বাদ ভুলতে পারেন না। তিনি সিলেটের কমলার প্রশংসা করেন । কমলা নিয়ে তাঁর জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।সমাবর্তনে লিখিত বক্তব্য শেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন তাঁদের মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবার ছিল। ফলে ছোটবেলায় কমলা খাওয়ার সুযোগ খুব বেশি ছিল না।রাষ্ট্রপতি বলেন, ছেলেবেলায় বাড়িতে কমলা এলে আমরা বড়জোর ১/২টা পেতাম। একবার আমার ছোটবোন কমলা খাওয়ার জন্য একটা বুদ্ধি বের করলো। সে বললো, ‘আমার যদি জ্বর হয়, তবে সবাই কমলা নিয়ে আসবে। তখন অনেক কমলা খেতে পারবো।’ সত্যি সত্যিই সপ্তাহখানেক পরে তার জ্বর হলো। ওই সময়েই কাকতালীয়ভাবে আমাদের বাড়ির পাশের হাওর দিয়ে যাওয়া একটি কমলাবাহী নৌকা ডুবে যায়। নৌকাটি সিলেট থেকে কমলা নিয়ে যাচ্ছিল। তখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়তাম। কিন্তু সাঁতার জানতাম।
মো. আবদুল হামিদ বলেন, নৌকা ডুবে যাওয়ার পর আমরা ভাইবোনেরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম হাওরে। এরপর ভেসে যাওয়া কমলাগুলো সংগ্রহ করে এনে মালিককে ফিরিয়ে দিলাম। তখন ওই লোকটি খুশি হয়ে আমাদের অনেকগুলো কমলা উপহার দেয়। এরপর সেগুলো বাড়িতে এনে আমরা ভাইবোনেরা ভাগ করে খাই। তবে এরমধ্যে ২০-২৫টি কমলা একা খাওয়ার জন্য আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম। তবে ওই কমলা আমি খেতে পারিনি। কারণ সপ্তাহখানে পরে লুকিয়ে রাখা জায়গায় গিয়ে দেখি কমলাগুলো পচে গেছে।বর্তমানে কমলাসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে যেভাবে ফরমালিন ও কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে, এর তীব্র সমালোচনা করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।তিনি বলেন, সব জায়গায় এখন শুধু চীনের কমলা পাওয়া যায়। যা দেশে আনতে আড়াই মাস লাগে। এসবে ফরমালিন দেওয়া থাকে। শুধু ফলমূল না শাকসবজি, মাছ, মাংস সবকিছুতেই ফরমালিন। এসব খাওয়ার ফলে দেশে ক্যান্সারের রোগী প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০/৩০ বছর আগেও এত ক্যান্সারের রোগীর কথা শুনতাম না। বেশি লাভবান হওয়ার জন্য যারা ফরমালিন ও কেমিক্যাল দিচ্ছে তারা গণহত্যা করছে। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার এবং সরকারেরও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম। এসময় অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট,সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যসহ  বিভিন্ন অনুষদের ডিনবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

 

You may also like

Leave a Comment