গোলজার আহমদ হেলাল:
আমাদের দেশের লোকজন কার্যত দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কালের রাজনৈতিক কর্মকান্ড, সরকারের অযাচিত পদক্ষেপ ও সামাজিক বিভেদের দরুন গোটা সমাজব্যবস্থা দ্বি-খন্ডিত হওয়ার উপক্রম। একদিকে ইসলামী তাহজীব-তামাদ্দুনে বিশ্বাসী লোকজন ও ইসলাম প্রেমিক জনতা আর অপরদিকে তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী বাঙ্গালী ও বিজাতীয় সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন লোকজন। এবিভেদ বা বিভক্ত রাজনৈতিক নয়, ভাষাগতও নয়, পুরোপুরি সাংস্কৃতিক। যখন একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের উপর আঘাত করা হয় তখন সামাজিক বিভক্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে একই স্থানে বসবাসরত জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়। দেখা গেছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো জনপদে লোকজন সহসাই গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়।
আমাদের প্রিয় জন্মভুমি এই বাংলাদেশ। পৃথিবীর প্রচলিত সকল ধারনাকে ব্যর্থ করে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে অবগাহন করে এ জাতি নিশ্চিত করে তার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, ১৩৪২ সনে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের হাত ধরে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলা’ যখন স্বাধীন সম্মান নিয়ে মাথা উচুঁ করে দাঁড়ালো, তারও আগে আরণ্যক ব্রাম্মণ ও বুদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলোতে ‘বঙ্গ’ নামের আকরিক উঁকি দিয়েছিল। তারও বহু আগে বিশ্বস্রষ্ঠা সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন হিসেবে সুনীল সমুদ্র থেকে একটু একটু করে জাগিয়ে দিচ্ছিলেন এই অপার সম্ভাবনার পাললিক ব-দ্বীপকে। তবে ১৩৩৮খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোনারগাঁও-এর প্রান্তরে রুখে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ বাংলায় প্রথম স্বাধীন সুলতানী যুগের সূচনা করেন। যেখানে প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি এ ভুগোলের প্রথম টাকশাল সেদিন আকাশ থেকে কোনো পুস্পবৃষ্টি হয়েছিল কি না জানি না, কিন্তু অবাক বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল এ উপমহাদেশ।
সৌন্দর্য, সম্পদ আর সম্ভাবনার অবিস্মরণীয় বিভায় উদ্ভাসিত হয়ে এ ভুখন্ডকে দেখার জন্য, এ মাটিকে জানার জন্য পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকেরা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুতিবস্ত্র মসলিন, নৃতাত্ত্বিক সম্পদ বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর, শালবন বিহার, মহাস্থানগড় ইত্যাদি এ মাটিকে দিয়েছে রূপকথার ঐশ্বর্য। এ জনপদের লোকজনকে অনন্য সাধারণ মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে সুদূর ইয়েমেন থেকে ছুটে এসেছিলেন হযরত শাহজালাল (র:। এই কল্যাণের বিপরীতে আছে লুন্টনের বেদনাদগ্ধ ইতিহাস। সম্পদের লোভে এখানে আছড়ে পড়েছিল ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী, পর্তুগীজ, ডাচ ও ফ্রান্সের বাণিজ্য পোত। ব্রিটিশ বেনিয়ারা শোষন করেছে, নির্যাতন করেছে, শুধু তাই নয় তাদের লালসায় পুড়ে ছারখার হয়েছে এ মানচিত্র।
আজোও বাংলাদেশে সেই বেদনাদগ্ধ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির পদধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশ এক অজুত সম্ভাবনার সোনার দেশ। এর মাঝে সবচে সম্ভাবনার দিক হচ্ছে এর বিপুল মানবসম্পদ। পৃথিবীর সব আবিস্কার, বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি, প্রযুক্তির বিস্তার, সভ্যতার বিকাশ সব কিছুর মূলে রয়েছে এই মানব সম্পদ। উন্নত বিশ্বে যখন তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য হণ্যে হয়ে খুজঁছে মানুষ তখন আমরা নির্বিচারে পুলিশ কর্তৃক গুলি চালিয়ে এই জনসম্পদকে দুনিয়া থেকে চির বিদায় করে দিচ্ছি। তা কি আমরা একটিবার ভাবছি?
যখন আমার দেশের নীতি নির্ধারকরা আল্লাহ এবং দেবদেবীকে সমভাবে সমতুল্য করে কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষার জন্য নির্নীত করেন তখন স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসে চিড় ধরে, টানাপোড়ন তৈরী হয় ধর্মীয় ভাবাবেগে। যখন এক ধর্মের হারামকে হালাল বলে চালিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া হয় তখন আর করার কিছু থাকেনা। যখন ব্লগে, ইন্টারনেটে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ঈমান-আকীদায় আঘাত করা হয়, ধর্মীয় মৌলিক রীতি-নীতির উপর আক্রমণ করা হয়, ধর্মীয় পোশাক সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করা হয়, তখনই সামাজিক বিভাজনের রাস্তাটি দ্রুত প্রসারিত হয়ে যায়। যখন আমরা দেখি রাজধানীতে কিছু সংখ্যক তরুণ দিন-রাত শুধু শ্লোগান দেয় ভিন্নমতের কিছু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা আদালতের প্রতি ইঙ্গিত করে। অথবা হাজার পাঁচেক লোক এর জনসমাবেশকে গণজাগরণ আখ্যায়িত করে সেখান থেকে এক ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির মতো নির্দেশ দিতে থাকে আর আমাদের সদাশয় সরকার তা বাস্তবায়নে সচিবদের পর্যন্ত মাঠে নামায় তা শুধু রীতিমতো হাস্যকরই নয় বিজ্ঞজনদের নিকট উদ্ভটই মনে হচ্ছে। অপরদিকে বিচার করার নামে একটি গোষ্ঠিকে নির্মূল করতে সরকার অসাধারণ সংগ্রাম করছে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাতীয়করণ করতে সমাজ বিভক্তি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো নয়ই বরঞ্চ মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা ও চেতনায় কুঠারাঘাতের শামিল।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হল রাষ্ট্র ও সমাজে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আমরা এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। যেখানে ফাঁসীই একমাত্র গ্রহণযোগ্য রায় হবে, সেখানে আইনের শাসন সুদুর পরাহত। চলমান যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জাতি দ্বিধাবিভক্ত। ট্রাইব্যুনালে মানবাধিকার, মৌলিক আইন, সাম্য ও সুবিচার থেকে অভিযুক্তরা বঞ্চিত হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মানবাধিকার সংস্থা, আইনজ্ঞ, আইনজীবীদের সংস্থা ইত্যাদিকে উপেক্ষিত করেই সেখানে কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যুদ্ধাপরাধ বিশেষজ্ঞ টবি ক্যাডম্যান বলেছেন ঢাকার রাজপথে আজ যা ঘটেছে তাতে আশঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে যে, উশৃঙ্খল লোকদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশ নাটকীয় ভাবে ও দ্রুততার সাথে গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ও দেশের বিবেকবান মানুষের সঙ্গে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আজ প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতির। সামাজিক বিভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিকে দলিথ মথিত করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিতে হবে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহ দিতে ইতিহাস বিখ্যাত বর্ধমান টাউন হলে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিট্রিশবিরোধী এক বক্তৃতার সময় রচনা করেছিলেন, “মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমনি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কবি চন্ডীদাস গেয়ে গেছেন ‘শুনহে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ বাংলাদেশের লোককবি হাজার বছর আগে বলে গেছেন, “নানান বরণ গাভীরে ভাই, একই বরণ দুধ, জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।”
শচীন সেনগুপ্ত আরো সুন্দর করে “সিরাজ উদদৌলা” নাটকে লিখেছেন “বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়, মিশ্রিত হিন্দু মুসলমানের গুলবাগ এই বাংলা।”
সুতরাং, আমাদের বড় পরিচয় হলো আমরা মানুষ। আমাদের পরিচয় আমরা একই মায়ের সন্তান। আমাদের বড় পরিচয় আমরা এদেশের নাগরিক। এদেশ আমাদের সবার। আমরা একে অপরের সহযোগী, সহকর্মী, সহযোদ্ধা। তাই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্ঠান সবাইকে দেশকে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি চক্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, সামাজিক বিভাজন ও ধর্ম বিশ্বাসের উপর আঘাত করে আমাদের দীর্ঘদিনের গড়ে উঠা জাতিসত্তাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করে আমাদেরকে হীন-নীচ প্রকৃতির জাতি হিসেবে পরিচয় করতে চায়। তাই মানবতা, দেশপ্রেম, মমত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও অহিংসার ধর্মে উজ্জীবিত হয়ে এ ধরনের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশগড়ার কাজে সবাইকে আত্মনিয়োগ এ সময়ের অনিবার্য দাবী।
লেখক:সাংবাদিক
তারিখ:১৫/০৩/২০১৩ইংরেজী
(edited)
