লাকি আক্তার : হেনা দাস একজন বিপ্লবী, শিক্ষক ও আজীবন সংগ্রামী নারী। বাংলার নারী জাগরণে যে ক’জন নারী তাঁদের সময়ের গ-ি পেরিয়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম কমরেড হেনা দাস। তিনি ছিলেন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য নেত্রী। বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনেরও অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। শুধু কমরেড হেনা দাস বললে নামটি অপূর্ণ থেকে যায়। এই নামটির পূর্বে বিপ্লবী শব্দটি একান্তভাবে অপরিহার্য। ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কমরেড হেনা দাস সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সতীশচন্দ্র দত্ত ছিলেন একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। হেনা দাসের মা মনোরমা দত্ত ছিলেন চুনারুঘাট থানার নরপতি গ্রামের জমিদার জগৎচন্দ্র বিশ্বাসের বড়ো মেয়ে। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে কমরেড হেনা দাস সর্বকনিষ্ঠ। সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে কমরেড হেনা দাস এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। কমরেড হেনা দাস যখন পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, সে সময় তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মেয়েকে বিয়ে করার অনুরোধ করেন। অসুস্থ বাবার অনুরোধ রাখতে তিনি বিয়ের জন্য রাজি হন। বিয়ে ঠিক হয় পার্টির সক্রিয় কর্মী কমরেড রোহিনী দাসের সাথে। তিনি ছিলেন সিলেট জেলা কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় বর ও কনেকে গোপণ কলকাতায় চলে যেতে হয় এবং ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন ঘরোয়াভাবে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর পার্টির নির্দেশে কমরেড হেনা দাস ও রোহিনী দাস অনেকদিন আত্মগোপণ করে ছিলেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন- এমন অনেক সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন এই লড়াকু নেত্রী। প্রায় তিন যুগ শিক্ষকতার পর হেনা দাস ১৯৮৯ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কমরেড হেনা দাস ছিলেন মহিলা পরিষদের সভানেত্রী। কবি সুফিয়া কামাল মারা যাওয়ার পর ২০০০ সালে তিনি এর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নারী ও শিক্ষক আন্দোলনের তার ভূমিকা ছিল অনন্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি ‘রোকেয়া পদকে’ সম্মানিত হয়েছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ পৌরসভা, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ঢাকেশ্বরী মন্দির, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট, আহমেদ শরীফ ট্রাস্টসহ তিনি বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। রাজশাহীর একটি প্রতিষ্ঠান কমরেড হেনা দাসের ওপর একটি অডিওভিজুয়াল ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে। নারীপক্ষ ও নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা থেকে প্রকাশিত দুটি বই-এ হেনা দাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশিত হয়েছে। কমরেড হেনা দাস কেবল একজন সাহসী, সংগ্রামী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বই নন, তিনি একজন লেখিকাও বটে।। ইতিমধ্যে কমরেড হেনা দাসের অর্ধডজন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো- ‘উজ্জ্বল স্মৃতি’, ‘শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবন’, ‘স্মৃতিময় দিনগুলো’, ‘নারী আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা’, ‘স্মৃতিময়-’৭১’ এবং ‘চার পুরুষের কাহিনী’। হেনা দাস তাঁর আত্মজীবনী লিখেছেন ‘পুরুষের কাহিনী’ শিরোনামের বইটিতে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কমরেড হেনা দাসের লেখা বিভিন্ন কলাম ও প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রবন্ধ সংকলন’ শিরোনামে আরেকটি বই। সাহিত্য প্রকাশ এর মফিদুল হক ‘মাতৃমুক্তি পথিকৃত’ নামে তাঁর জীবনের উপর একটি বই প্রকাশ করেছেন।
২০০৯ সালের ২০ জুলাই কমরেড হেনা দাস মারা যান, কিন্তু রেখে যান তাঁর
বলিষ্ঠ সংগ্রামী জীবনের আদর্শ। নতুন প্রজন্ম তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে
কাজ করবে এটাই প্রত্যাশা।
ফেসবুক থেকে/ সম্পাদনা : নৌশিন আহম্মেদ মনিরা
