৩. আমাদের ইদানীংকার গণতন্ত্র আমেরিকান সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থির কথা মনে করিয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যবসায় প্রচুর লাভবান হওয়ার এবং নিজেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীর যোদ্ধা হিসেবে (মিথ্যা) প্রচার করে নির্বাচনে জিতেছিলেন। পরে ১৯৫০-এর দশকে, সিনেটর থাকা অবস্থায় যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিযোগী বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা/সদস্যকে অপছন্দ বা ঘায়েল করতে চাইতেন, তাঁকেই তিনি কমিউনিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে সোভিয়েত আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘ঠান্ডা যুদ্ধের’ সময় সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থির কমিউনিস্টবিরোধী তৎপরতা ম্যাককার্থিজম হিসেবে পরিচিতি লাভ। হলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সরকারি চাকুরে—কেউ রেহাই পাননি। ম্যাককার্থি আর তাঁর দলবলের তথাকথিত অনুসন্ধানে কেউ ‘কমিউনিস্ট’ ‘প্রমাণিত’ হলেই তাঁর পেশা-জীবিকা সব শেষ। আশঙ্কা হয়, আমাদের রাজনীতিতে ম্যাককার্থিজমের কু-প্রভাব পড়ছে। যাকে-তাকে সত্য-মিথ্যার বাছবিচার না করে অথবা তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে বলা হচ্ছে—ওই ব্যাটা যুদ্ধাপরাধী বা যুদ্ধাপরাধীর দোসর। অমুকের বাবা ১৯৭১ সালে চাকরি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন বা ছাত্র ছিলেন—অতএব তারা যুদ্ধাপরাধীর দোসর। দেশ স্বাধীন করেছে কেবল এবং শুধু আওয়ামী লীগ। অতএব যারা আওয়ামী লীগ পছন্দ করে না বা আওয়ামী রাজনীতির বিরোধিতা করে, তারা নিঃসন্দেহে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধী। কি সাহসে তারা বাংলাদেশের পতাকা ধরে! স্পষ্টতই অধম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ত্যক্তবিরক্ত। তাই ইতিমধ্যে রাজাকার হয়ে না গেলেও অচিরেই হয়ে যাব। ম্যাককার্থির আমেরিকায় যেমন নিঃসন্দেহে হয়ে যেতাম কমিউনিস্ট। আর বিএনপির সময় ভারতের দালাল। সেদিন বিরোধী দলের নেত্রীর কথায় ভীষণ ঝাঁজ ছিল র্যাবের বিরুদ্ধে। প্রথম ক্রসফায়ারের পর
৪. আমরা যাঁরা ভোট দিতে পারছি না, তাঁরা কি যাঁরা আমাদের ‘প্রতিনিধি’ হয়ে সংসদে বসবেন, তাঁদের কি আমরা মানতে বাধ্য? নৈতিকভাবে বা নৈতিকতার বিচারে তাঁদের যে জনপ্রতিনিধি মানতে বাধ্য না, সেটা নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবেন না। বলতে পারেন, আইনগতভাবে মানতে বাধ্য। কারণ, তাঁরা আইনানুযায়ী নির্বাচিত। হতে পারেন, না-ও হতে পারেন, সে বিতর্কে যাচ্ছি না। দেশ-জাতির বড় বড় ইস্যুতে যেখানে আইন ও নৈতিকতা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে, তখন অনৈতিক আইনের বিধান অমান্য করাই সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব। শতবর্ষ আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রেনের গার্ড যখন মহাত্মা গান্ধীকে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট থাকা সত্ত্বেও ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়েছিল এই বলে যে অশেতাঙ্গের অর্থাৎ কালো-আদমির ফার্স্ট ক্লাসে চড়া নিষেধ, কারণ এটাই আইন। তখন ট্রেন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে বসে ছিলেন প্রতিবাদ করে এ কারণেই যে অনৈতিক আইন অমান্য করাই সর্বোত্তম নৈতিকতা। ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আইন যখন বিধান করে রেখেছিল সাদা-কালো তফাত-ফারাক-ভিন্ন থাকবে, তখন মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা—আমি স্বপ্ন দেখি যে একদিন আমেরিকায় সব মানুষ সমান হবে (সাদা-কালোয় ফারাক থাকবে না)। কমবেশি আমরা পাঁচ কোটি ভোটার এ নির্বাচনে ভোট দিতে পারছি না। আমাদের বলা হচ্ছে আমাদের প্রতিনিধি নাকি ‘নির্বাচিত’ হয়ে আছেন। আমরা ফাউ, কিন্তু আমাদের সংবিধান তো বলে আমরা নাগরিকেরা প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক। এখন দেখছি কিছু লোক জোগসাজশে তথাকথিত নির্বাচনের নামে আমাদের মালিকানা থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছেন। আর কমবেশি যে চার কোটি বা তার কিছু বেশি ভোটারের নামকাওয়াস্তে ভোট প্রয়োগের আইনানুগ সুযোগ আছে, তাঁরা কি মনে করবেন যে নৈতিকভাবেও এটা সিদ্ধ নির্বাচন। তর্কের খাতিরে আপাতত মেনে নিচ্ছি যে শত দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও এটা আইনানুগ নির্বাচন।
ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট; অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।
