আসমা জান্নাত মণি:আমি তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম যখন আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি। আমার অন্যতম একজন প্রিয় শিক্ষক স্কুল জীবনে একটা কথা প্রায়ই বলতেন…. ” তুমি যদি বড় কোন গর্ত জাম্প করে পার হতে চাও, তোমাকে গর্তটার সামনে থেকে একটু পিছিয়ে আসতে হবে, এরপর সজোরে দৌড় দিয়ে গতিশক্তি সঞ্চয় করেই জাম্প করতে হবে।”
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় যেসব পরিশ্রমী ছাত্র – ছাত্রীদের হারিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন পেজ এ তাদের কয়েকজনের গল্প পড়লাম।অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়াশুনা করেছে একজন,ইমিডিয়েট অপারেশন করানোর দরকার ছিল।প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটবে এই চিন্তায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল,ওজন নেমে এসেছিল ৩৫ কেজিতে। অন্য একজনের মা হজ্ব করার সময় হাজরে আসওয়াদে ছুঁয়ে একটা দোওয়াই করেছিল আমার ছেলেটাকে ডাক্তার বানিয়ে দিও। এক বছর কয়েকমাস প্রাণপণ চেষ্টা করেছে মায়ের স্বপ্নটাকে ঘরে আনবার জন্য।
রেজাল্টের আগের দিন রাতে তিন বছরের ছোট বাচ্চাটা তার মায়ের সাথে সিজদায় পড়ে দোয়া করছে তার বোনটি যেন ডাক্তার হতে পারে। হ্যাঁ কিছু সৎ,পরিশ্রমী,আপাতদৃষ্ঠিতে ব্যর্থ মানুষের গল্প এই গুলো। জানি এই গল্পগুলোর চেয়ে হয়তো আরো অনেক ট্রাজিক গল্প লুকিয়ে আছে প্রতিটা ডেডিকেটেড মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার্থীর জীবনে। গল্পগুলো হয়ত অপ্রকাশিতই থেকে যাবে। অপ্রিয় হলেও মানতে হবে এই পরাজয়ে অনেক দৃঢ় মনোবলের ফাইটাররা থেমে যাবে ।জীবনে দ্বিতীয়বার আর কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার ইচ্ছে তাদের হবে না কখনো। তোমরা যে স্বপ্নটা দেখেছিলে সেটাকে হয়ত একদিনেই পরিবর্তন করে অন্য একটা স্বপ্নে পরিবর্তন করতে পারবে না। একটি স্বপ্ন একদিনে তৈরী হয় না আবার আরেকটি স্বপ্নকে নিজের ঠিকানা ভাবতে একটু সময় লাগবে তোমাদের।
তোমরা চাইলে এখানেই থেমে যেতে পারো । আবার এটাও পারো, আর একবার…. অন্তত জীবনের শেষ চেষ্টা মনে করে আর একবার ওঠে দাঁড়াতে। মানুষ যদি তার প্রথম দুই তিন চেষ্টাতেই থেমে যেত তাহলে বিশ্বাস করতে পারো এই পৃথিবীতে অনেক উদ্ভাবন সেখানেই থমকে যেত। তোমরা থেমে গেলে তোমাদের এই এক বছরের পরিশ্রম হারিয়ে যাবে চিরতরে। বিশ্বাস করো একদিন যে তুমি হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটেছিলে ভূলেও কেউ মনে করবে না। আগামী প্রজন্ম হয়তো জানবেই না একটা প্রহসনমুলক নাটকের মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে তোমাদের হারিয়ে দেয়া হয়েছিল।
এই অল্প সময়ের পিছিয়ে পড়াটাকে গর্ত পেরুনোর মত প্রেরণা দিয়ে আরেকবার জাম্প করো। ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যথমেটিকস, ফার্মেসি, ফ্যাশন ডিজাইনিং, রাজনীতি, পৌরনীতি, ইতিহাস, অভিনয়, লেখনী, গান যে যেভাবেই পারো, যেটাতেই পার অন্তত আর একটাকে ধরে আবার একটা লক্ষ্য স্থির কর। রোমাঞ্চকর সামরিক জীবন ভাল লাগলে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর যে কোন একটার গর্বিত অফিসার হয়ে যেতে পারো ইচ্ছে করলেই। এই একবছর অধ্যবসায় আর কঠোর পরিশ্রম তোমাদের এক একজনকে অদম্য সক্ষমতা সম্পন্ন মানব সম্পদে পরিণত করেছে। নিজেকে আরেকবার বিশ্বাস করেই দেখো আর তুমি ঠকবে না। জীবনের শুরুই তো কেবল মাত্র,একটা পরাজয় কি তোমাদের থামিয়ে দিতে পারে? জীবনের ভোরবেলায় হাটতে যেয়ে কতবার পড়ে গিয়েছে, ক ই হেরে যাওনি তো কখনো। কিছু দুর্নীতিবাজ মানুষের অপকর্মের শিকার হয়ে তুমি তোমাকে ধ্বংস করবে কেন? শুধু মনে রেখো, আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোর এত বড় ভাগ্য হয়নি তোমাদের মতো সাহসী কিছু সৈনিক কে তার বুকে স্থান দেবার। গর্তটাকে খুব ভালভাবে কাছ থেকে দেখে পিছিয়ে এসো। এরপর প্রস্তুতি নাও, আরেকটা জাম্প দেয়ার…. আমি ও ঠিক এ রকম ই স্বপ্ন দেখি। আমি জীবনের কোন একটী ক্ষেত্রে সফল হয়ে একদিন হাজার হাজার মানুষের সামনে মাইক হাতে নিয়ে ঘোষণা করবো ২০১৭ সালের প্রহসন আমাকে থামিয়ে দিতে পারে নি।
লেখক:শিক্ষার্থী,সংবাদ কর্মী ও সমাজ কর্মী।
