সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরে উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ: ৭ মাসের ব্যবধানে পান ৩ দফা হাইব্রিড প্রমোশন

by News Room

সুনামগঞ্জপ্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালকের বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রণালয়ের এক সচিবালয়ের জনৈক কর্মকর্তার আশির্বাদে এসএম আফসারুজ্জামান পান হাইব্রিড প্রমোশন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা থেকে ৭ মাসের ব্যবধানে তিন দফা প্রমোশন পেয়ে তিনি হন উপ-পরিচালক। দফায় দফায় প্রমোশন পেয়ে তিনি অনিয়ম- দুর্নীতি আর সরকারী অর্থ লোপাটে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। মাঠ প্রদর্শনী, ডিজেল ভুর্তকি, বদলী বাণিজ্য, সারের ডিলার নিয়োগ, সারের বরাদ্দ, কৃষি কার্ড প্রদান, আউষ প্রণোদনা, বিদায় সংবর্ধনা, পিকনিক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষি পুনবার্সন কর্মসুচী-২ এ ১৯ হাজার কৃষককে বিনা মুল্যে সার বীজ বিতরণের প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মধ্যে ৭ হাজার কৃষকের বরাদ্দের পুরো টাকা সহ গত ৫ বছরে প্রায় কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত কৃষি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীসহ বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসাবে এসএম আফসারুজ্জামান ২০০৮ সালের ৩ এপ্রিল যোগদান করেন। ২০১১ সালের মার্চ মাসে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা, ২০১১ সালের মে মাসে জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ও একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর উপ পরিচালক হিসাবে একই অধিদপ্তরে প্রমোশন পান তিনি। অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) কৃষি মন্ত্রনালয়ের এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার আর্শীবাদের জোরে এক বছরে অলৌকিক ভাবে আফসারুজ্জামান তিন বার প্রমোশন পান।
বিশ্বম্ভরপুরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আফসারুজ্জামান ডিজেল ভর্তুকির সরকারের নগদ অর্থ সহায়তার ৩৭ লাখ টাকার মধ্যে তৎকালনীন সোনালী ব্যাংক ম্যানেজার ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগ সাজস করে ডিজেল ভর্তুকির সিংহভাগ টাকাই ভুয়া মাষ্টার রোলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। একই সময়ে প্রদর্শনী সঠিক বাস্তবায়ন না করেই বরাদ্দের টাকা পকেটস্থ করেন তিনি। ২০০৯ সালে কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্পের নামে ভুয়া মাষ্টার রোলে কৃষকদের কোন রকম ট্রেনিং না করিয়েই ফাইল ওয়ার্কের মাধ্যমে খামার বাড়ি প্রকল্পের ৩ বারের বরাদ্দের টাকাও আত্মসাৎ করেন।
২০০৯ সালে চীন সরকার কর্তৃক দেয়া ১০ মেট্রিক টন টিএসপি সার বিনা মুল্যে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ না করে কালোবাজারীদের কাছে সার বিক্রি করে প্রায় ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। ২০১০ সালে আউশ প্রণোদনার বরাদ্দকৃত টাকা একই কায়দায় আত্মসাত করেন। কৃষি সহায়তার জন্য ১০ টাকায় কৃষকদের ব্যাংক এ্যাকাউন্ট করার নির্দেশনা থাকলেও তিনি প্রতিটি কার্ড কৃষকদের কাছ থেকে ২’শ টাকা করে নেন। উপজেলা কৃষি পুর্নবাসন ফাইল আর মাঠ পর্যায়ের চিত্র মেলালেই দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের  বিষয়টি তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে বলে জানান কৃষি অফিসে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে কৃষকদের ফসলহানীর পর ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাহিরপুরে কৃষক সমাবেশ কৃষি পুর্নবার্সন কর্মসুচী -২ উদ্বোধন করেন। কৃষি মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ১৯ হাজার ুদ্র কৃষককে বিনা মুল্যে সার বীজ প্রদানের জন্য প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কৃষি কর্মকর্তা আফসারুজ্জামান মাত্র ১২ হাজার কৃষকের মধ্যে সার বীজ প্রদান করেন। ভুয়া মাষ্টার রোলের মাধ্যমে বাকি ৭ হাজার কৃষককের বরাদ্দের সার বীজ গোপনে ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়। ২০১১ ও ২০১২ সালের আউষ প্রণোদনার টাকাও পুরনো কায়দায় পকেটস্থ করেন। এতসব দূর্নীতি আর লোপাঠের বিষয়টি ধামাচাঁপা দিতে গিয়ে আফসারুজ্জামান প্রমোশন পেয়েও থেকে যান সুনামগঞ্জে। বিশ্বম্ভরপুরে কৃষি কর্মকর্তা থেকে ২০১১ সালের মার্চে পদোন্নতি পেলেও ২০১২ সালের জুলাই মাসে তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পদ ছাড়েন। বিভাগীয় শামিÍ বদলী, হয়রানী আতঙ্খে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জেলার বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিসে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী জানান, ২০১১ সালে উপ পরিচালক হিসাবে পদোন্নতি পাওয়ার পর আফসারুজ্জামান সার বরাদ্দ, ডিলার নিয়োগ ও বদলী বাণিজ্যের নামে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। নিজের আস্থাভাজন কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাধ্যমে আবারো কোন কোন সময় জেলা সদরসহ জেলার ১১টি উপজেলার অধিকাংশ  সার ডিলার নিয়োগে, সারের বরাদ্দ থেকে উৎকোচ আদায় করেন। ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, ডিএপি সারের বরাদ্দে প্রতি মেট্রিক টনে ৫’শ থেকে ১ হাজার টাকাও উৎকোচ নিতেন। জেলার তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশাসহ বেশ ক’টি উপজেলায় একাধিক সার ডিলারের বিরুদ্ধে কালোবাজারে সার বিক্রির অভিযোগ উঠলেও আফসারুজ্জামান কানে তুলো দিয়ে রাখতেন। কালে ভদ্রে তদন্তের ভয় দেখিয়ে অভিযুক্ত ডিলারদের কাছ থেকে কামিয়ে নিয়েছেন বাড়তি টাকা। ২০১২ সালে পিকনিকের নামে বাধ্যতামুলক জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় ২’শর অধিক কৃষি কর্মকর্তা কর্মচারীর নিকট থেকে সর্বনি¤œ ৫’শ টাকা হারে চাঁদা আদায় করেন। পরে মাত্র ৫০ জনকে ছাতকে নিয়ে গিয়ে পিকনিক করে অবশিষ্ট টাকা নয় ছয় করে নিজেই পকেটস্থ করেন।
চলতি বছর ২০১৪ সালে ফেব্রƒয়ারী মাসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের নামে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে জেলার ১১ টি উপজেলার কৃষি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা সংগ্রহ করেন।
তার বিরুদ্ধে রয়েছে বদলী বাণিজ্যের অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী জানান, বদলী করতে গিয়ে সুইপারের কাছ থেকেও ৭ হাজার টাকা নেন  উপ-পরিচালক। এছাড়া গার্ড, এমএলএসএস, পিপিএম, এসএম,অফিস সহকারী, উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপ সহকারী উদ্ভিদ সংরণ কর্মকর্তাদের বদলীর েেত্র প্রত্যেকের কাছ থেকে সর্ব নি¤œ ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা উৎকোচ নেন। এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. এসএম আফসারুজ্জামানের বক্তব্য জানতে উনার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ গুলো সত্য নয়, মিথ্যা বানোয়াট। ইতিপূর্বে এসব বিষয়ে অডিট সম্পন্ন হয়েছে, আমাকে হেয় করার জন্যই আমাদের অফিসের এবং বাহিরের কিছু লোক এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

You may also like

Leave a Comment