বিনোদন ডেস্ক:সম্প্রতি কীর্তনের সুরে গাওয়া ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ শিরোনামের একটি গান নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের গান নিয়ে আয়োজন করে ‘আইপিডিসি আমাদের গান’। এ আয়োজনের তৃতীয় পরিবেশনায় গত ২০ অক্টোবর রাধা আর কৃষ্ণের প্রথম দর্শনের অনুভূতি নিয়ে রচিত গান ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি নতুন করে উপস্থাপন করা হয়। পার্থ বড়ুয়ার সংগীতায়োজনে গানটি গেয়েছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ও মেহের আফরোজ শাওন ও একদল শিল্পী। ২০ অক্টোবর গানটি প্রচার হতে না হতেই শাওন-চঞ্চলের গাওয়া গানটির বিরুদ্ধে কপিরাইট আইনে অভিযোগ করে সরলপুর ব্যান্ড। তাদের দাবি গানটি তাদের কপিরাইট করা। কোনোরকম অনুমতি না নিয়েই আইপিডিসি সেটা পরিবেশন করেছে। সরলপুর ব্যান্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে ইউটিউব থেকে গানটি সরিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে সরলপুর ব্যান্ড গানটি নিজেদের বলে দাবি করে কপিরাইটের প্রমাণপত্র দেখালেও গানটি সরলপুর ব্যান্ডের বলে মানতে চায় না আইপিডিসি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সরলপুরের কপিরাইট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধিকাংশেরই যুক্তি রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে গাওয়া চিরায়ত কীর্তনের সুরে পরিবেশন করা এই গানটি কী করে সরলপুরের হয়? চিরায়ত গানের তো কপিরাইট থাকার কথা না। এমন অভিযোগের জবাবও দিয়েছে সরলপুর। তারা জানিয়েছে, গানটির মূল ভাব লোকসংগীত থেকে নিলেও তারা নিজেদের মতো করেই গানের লিরিক পরিবেশন করেছে। ফলে গানটি তাদেরই।
দেশ রূপান্তরের কাছে কণ্ঠশিল্পী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, ‘আমরা গানটা গাওয়ার পর যখন কপিরাইটের অভিযোগ উঠল, তখন নতুন করে আমরা পার্থ বড়ুয়া, চঞ্চল চৌধুরী মিলে যখন আবার গানটা নিয়ে রিসার্চ করলাম, তখন বিষয়টা হয়ে গেল বিস্ময়কর। আমার মনে হয়, এ গানটায় তাদের কপিরাইট দাবি করা ঠিক হয়নি। কারণ এই গানটা মৈমনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালার। দ্বিজ কানাইয়ের গানটা এদিক-ওদিক করে তৈরি করা। কিছুটা আশুতোষ ভট্টাচার্যের সংগৃহীত গান থেকে কালেক্ট করা। বিভিন্ন জায়গা থেকে দুই লাইন, দুই লাইন করে জুড়ে দিয়ে তারা কিছু শব্দ এদিক-ওদিক করেছে, যেটাকে আসলে মৌলিক গান বলা যায় না। এখন আমি যদি রবীন্দ্রনাথ থেকে দুই লাইন নিই, নজরুল থেকে দুই লাইন, লালন থেকে দুই লাইন নিই, হাছন রাজা থেকে দুই লাইন নিয়ে আমি ৫ লাইন যোগ করি তাহলে তো আর মৌলিক গান হলো না।’
সংগীত আয়োজক পার্থ বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এই গানের বিষয়ে প্রমাণপত্রসহ কপিরাইট অফিসে অভিযোগ জানিয়েছি। বৃহস্পতিবার আমরা লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। কপিরাইট অফিস বিষয়টি বিবেচনা করে জানাবে গানের কপিরাইট কার। যেহেতু এটা এখন কপিরাইট অফিসের তদন্তাধীন রয়েছে তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।’
এদিকে গবেষক সাইমন জাকারিয়া মৈমনসিংহ গীতিকাসহ বেশকিছু প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানের কপিরাইট সরলপুর ব্যান্ড দাবি করতে পারে না। কারণ গানটি মৈমনসিংহ গীতিকা ও পালাগান থেকে সংগৃহীত হয়েছে। চিরায়ত গানের কোনো কপিরাইট হয় না।
আইপিডিসি, পার্থ বড়ুয়া, শাওন ও সাইমন জাকারিয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে দেশ রূপান্তর যোগাযোগ করে সরলপুর ব্যান্ডের মুখপাত্র ও লিড ভোকালিস্ট মারজিয়া তুরিনের সঙ্গে। কানাডা থেকে তুরিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখুন, আমরা কীর্তনের সুরে এই গানটা করেছি। সেখানে আমাদের কিছু সংযোজনও রয়েছে। চিরায়ত সুরের কোনো কপিরাইট হয় না। ফলে সুরে আমাদের সংযোজন থাকলেও আমরা সুরের ওপর কপিরাইট নিইনি। আমরা কপিরাইট করেছি লিরিকের। আমরা বিভিন্ন বই ও পালা থেকে গানটির ভাবধারা গ্রহণ করেছি। ঘটনাগুলো নিয়েছি। লোকজ তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই আমরা গানটি নিজেদের মতো করে লিখেছি। ভাবধারা বা গল্প ঠিক রাখার লক্ষ্যে সেই সব বই বা পালা থেকে কিছু কিছু শব্দ আমরা গ্রহণ করেছি। আর গ্রহণের বিষয়টাও আমরা কপিরাইট করার সময় উল্লেখ করেছি। এসব বিষয় বিবেচনায় গানটির লিরিকের কপিরাইট আমাদের। কিন্তু আইপিডিসি যেটা করেছে আমাদের গানটা তারা হুবহু গেয়েছে। এখন রাধা-কৃষ্ণ নিয়ে অসংখ্য গান অসংখ্য সময়ে গাওয়া হয়েছে। আমাদের সুরটা নকল করেও অনেকে গানটা এদিক-ওদিক করে, অন্যভাবে গেয়েছে। সেখানে কিন্তু আমরা কোনো অভিযোগ করিনি। কিন্তু যখন আমাদের গানটা হুবহু কপি করে গাওয়া হলো তখনই আমরা অভিযোগ করেছি।’
তুরিন আরও বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত আনীত সব অভিযোগ এমনকি সাইমন জাকারিয়ার যুক্তিও খণ্ডন করে লিখিত প্রমাণপত্র কপিরাইট অফিসে আমাদের আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আশা করছি তারা সঠিক সিদ্ধান্তটিই নেবেন।’
এদিকে গান বিতর্ক ও প্রমাণাদি দাখিলের বিষয়ে জানতে চাইলে কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রেজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরলপুর ব্যান্ড ‘সর্বত মঙ্গলে রাধে’ গানের পক্ষে কিছু প্রমাণপত্র দাখিল করেই কপিরাইট করেছে। এরপর আইপিডিসি গানটা করার পর নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। আমরা আগেও বলেছি আমাদের কাছে অফিশিয়ালি অভিযোগ না আসা পর্যন্ত গানের কপিরাইট সরলপুরের। তবে আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) আইপিডিসি তাদের পক্ষে প্রমাণাদিসহ লিখিত অভিযোগ দিয়ে গেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’
সরলপুরের আইনজীবীরাও তাদের পক্ষে প্রমাণাদি দিয়ে গেছেন কি না জানতে চাইলে জাফর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘সরলপুর ব্যান্ডের আইনজীবী কাগজপত্র নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু সেগুলো রাখা হয়নি। কারণ আমরা আজ মাত্র আইপিডিসির অভিযোগ পেয়েছি। তো আইপিডিসির অভিযোগে কী আছে সেটা জানার পর সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সরলপুরকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেব। সরলপুর সেই নোটিসের জবাব দিলে সেগুলো কপিরাইট বোর্ডে পাঠানো হবে। কপিরাইট বোর্ড যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে গানের কপিরাইট কার হবে। সেটার কপিরাইট চিরায়তও হতে পারে আবার সরলপুর বা আইপিডিসিরও হতে পারে।’
জাফর রেজা আরও বলেন, ‘মিথ্যাচার প্রমাণ হলে ৮৯ ধারায় দুই বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এছাড়া স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া গান প্রকাশ করলে তা কপিরাইট আইনের ৭১ ধারার লঙ্ঘন। এই ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কপিরাইট আইনের ৮২ ধারায় ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।’
সুত্র:দেশ রূপান্তর
