বাংলাদেশের তিন জামাতের সাতকাহন : গোলাম মাওলা রনি

by News Room

         (দ্বিতীয় পর্ব) গত বৃহস্পতিবার আমাদের সময়ে উপরোক্ত শিরোনামের লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। যারা টেলিফোন করেছিলেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। অনেকে আবার এ কথা বলে সতর্ক করেছেন যে, কী দরকার এসব বলার! কারণ ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অনেক চরমপন্থী লোকজন থাকেÑ যারা ভালো-মন্দ বাছ-বিচার না করেই তাদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারীকে আক্রমণ করে বসে। কখনো শারীরিক আক্রমণ চালায়, কখনো বা অশ্লীল বাক্যবাণে প্রতিপরে জীবন জারেজার করে দেয়। আমি শুভার্থীদের কথা শুনলাম। কিন্তু প-েবিপে কোনো মন্তব্য করলাম না। কারণ বহুদিন ধরে বহু অপ্রিয় বিষয় লিখতে লিখতে অনেক কিছুর কার্যকারণ বলতে গেলে মুখস্থ হয়ে গেছে। আমি সাধারণত আমার লেখাগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার দিন সকাল ১১টায় ফেসবুকে পোস্ট দিই। নিজস্ব ওয়াল ও ফ্যান পেজ মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ লোক এবং তাদের বন্ধুবান্ধব মেলালে প্রায় ৫০ লাখ লোকের কাছে মুহূর্তের মধ্যে পোস্টটি চলে যায়। এরপর শুরু হয় লাইক ও কমেন্টের পালা। অনেকে পে বলেন, কেউ কেউ বিপওে বলেন। উপরোক্ত শিরোনামের লেখাটি সঙ্গত কারণেই জামায়াতে ইসলামী ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের লোকজন খুবই পছন্দ করেছেন। অন্যদিকে তাবলিগ জামাতের সমর্থকদের কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন আমাকে তাবলিগ সম্পর্কে অধিকতর অধ্যয়ন করার জন্য। অনেকে কিছু শব্দ বা বাক্যের সত্যাসত্য সম্পর্কে আপত্তি তুলেছেন। বেশ কয়েক বলেছেন, রনি ভাই, আপনাকে অনেক ভালো জানি, আপনার লেখা নিয়মিত পড়ি। কিন্তু আজকের লেখার বিষয়ে আপনার মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। এই প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হলো, আমি নিজ থেকে তাবলিগ জামাত সম্পর্কে একটি শব্দও বলিনি। এই জামাতের প-বিপরে লোকজন যা সচরাচর বলে থাকে, সেগুলোই গ্রন্থিত করে উপস্থাপন করেছি মাত্র। এতে সাধারণ মানুষ যেমন তাবলিগ জামাত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তেমনি তাবলিগের লোকজনও তাদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডাগুলোর মোকাবিলার জন্য উপায় খুঁজতে পারবে। লেখক হিসেবে সম্পূর্ণ নিরপে ও নির্লিপ্ত থেকে  কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছি মাত্র। তা ৫০ বছর ধরে ঘাটে পথে উচ্চারিত হয়ে আসছিল বিচ্ছিন্নভাবে। আজকের লেখায় আমি প্রথমে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং পরে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে আলোচনা করব। ওই আলোচনায়ও আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য থাকবে না। সংগঠন দুটির প-বিপরে লোকজনের বক্তব্যগুলো এমনভাবে বর্ণনা করবÑ যাতে সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা একান্তে চিন্তা করে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশের ইসলাম, মুসলমানদের ঐক্য ও ধর্মপরায়ণতা নিয়ে সব সময় গর্ব করি। দুনিয়ার কোথাও এমন মুমিন ও মুত্তাকি মানুষ পাওয়া যাবে না। এমন সুমধুর আজানের ধ্বনি একই সময়ে এত কণ্ঠে পৃথিবীর কোনো শহর-বন্দর-গঞ্জে বেজে ওঠে না যেরূপটি বাজে বাংলার আকাশে-বাতাসে সর্বত্র। আমরা প্রায় সবাই সুন্নি ও হানাফি মাজহাবের। আমাদের মাতৃভাষা এক ও আরবি উচ্চারণের ভঙ্গিমাও একই প্রকৃতির। ইসলামের হুকুম-আহকাম পালনে আমাদের মধ্যে নেই কোনো ভেদাভেদ। এ জনপদের হাজার বছরের ইসলামি ইতিহাসে মানুষজন কোনো বিভেদ বিসম্বাদ মানেনি। কিন্তু কতিপয় ধর্মীয় নেতা সময়ে-অসময়ে চেষ্টা করেছেন মানুষকে ধর্মীয় লেবাস পরিয়ে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত করার জন্য। এ দেশের মুসলমানরা জানেন, তাদের ধর্মে শিয়া-সুন্নি নামে প্রধান দুটি ধারা রয়েছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় শিয়া ও সুন্নির মধ্যে পার্থক্য কী, তাহলে প্রতি দশজনে একজনও পাওয়া যাবে নাÑ যারা শিয়া-সুন্নির রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রুহানি পার্থক্য জানে। এ দুটি ধারার বাইরে আরও ছোট ছোট ধারা রয়েছেÑ ইসমাইলিয়া, রাফয়েদানিয়া, কাদিয়ানি বা আহমেদিয়া, খারেজি, জিকরি মাহদিয়া, মুরিস, কোরানি, ইবাদি ইত্যাদি। এত কিছুর পরও এ দেশের মানুষ কেবল সুন্নি বা সুন্নিয়ত সম্পর্কে শুধু এতটুকুই জানে, আমরা সুন্নি মুসলমান। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় সুন্নি মুসলমান বলতে কী বোঝেন, তাহলে বেশির ভাগই সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। এ দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি কতটা প্রবল, তা আমার শৈশবের কিছু স্মৃতি শুনলেই সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা খুব সহজে অনুধাবন করতে পারবেন। আমার দাদা খুব ভালো পুঁথি পড়তে পারতেন। গ্রামের নারী-পুরুষ দলবেঁধে বসে ওই পুঁথি পড়া শুনতেন। হজরত আলী, মা ফাতেমা, আমির হামজা, কারবালা ইত্যাদি নামে পুঁথি ছিল খুবই জনপ্রিয়। গ্রামবাসী পুঁথি শুনত ও গলাগলি ধরে কান্নাকাটি করতে করতে জারেজার হয়ে পড়ত। হজরত আলিকে মনে করা হতো সব শক্তি ও যুদ্ধজয়ের একক। গ্রামবাসী মারামারির সময় ইয়া আলি বলে ঢাল, সরকি, লাঠি-বল্লম নিয়ে প্রতিপরে ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। ঝড় এলে দোয়া-দরুদ পাঠ করার পাশাপাশি ইয়া আলি! ইয়া আলি বলে চিৎকার করত। কারবালার পুঁথি পড়তে গিয়ে কাঁদেনি এমন মানুষ ষাট বা সত্তরের দশকে খুঁজে পাওয়া ভার। নারী-পুরুষ ছেলে বুড়ো, গুঁড়ামণি-পোলাপানরাও সুর করে ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন বা হায় হোসেন, হায় হোসেন বলে কাঁদত। গোধূলিলগ্নে পশ্চিম আকাশের রক্তিম আভাকে মনে করা হতো ইমাম হোসেনের রক্ত। আমরা প্রায় বিকেলে চিৎ হয়ে ফসলের মাঠে শুয়ে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ইমাম হোসেনের কথা মনে করতাম এবং হাউ মাউ করে কাঁদতাম। তখন আমরা কেউই শিয়া নামটি পর্যন্ত শুনিনি। আমাদের ধর্মবোধ, কৃষ্টিকালচার ইত্যাদি গড়ে ওঠেছিল সাহিত্যনির্ভর হয়ে। ষাটের দশকে মীর মশাররফ হোসেন রচিত ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসটি গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ধর্মীয় পুস্তকের মতোই সমাদৃত হতো। আমাদের দেশে সুফিবাদ পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। মূল সুফিবাদের আবার ১৪টি উপধারা রয়েছে। এগুলো হলো বেকতাসি, চিশতি, কুবরাউইয়্যা, মাওলাউইয়্যা, মুরিদিয়্যা, নকশবন্দি, নিমাতুল্লাহি, নুরবক্সি, ওয়াইসি, কাদেরি, সেনুসি, সাদিলিয়্যা, সোহাওয়ার্দিয়্যা ও তিজানিয়্যা। আমাদের দেশের সুফি-সাধকরা হয়তো নিজেরা ওই ১৪টি দলের যে কোনো একটির সঙ্গে একীভূত হয়ে নিজে ইবাদত-বন্দেগি করতেন এবং ভক্ত-মুরিদান জোগাড় করে নিজের মতাদর্শ প্রচার করতেন। আমার জানা ও দেখা মতে, দেশের খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এসব ব্যাপারে বিস্তারিত জানে বা জানার চেষ্টা করে। তারা সরল বিশ্বাসে তা-ই করেÑ  যা তাদের পীর করতে বলেন এবং সে কথাটি বিশ্বাস করেÑ যা তাদের পীর বিশ্বাস করতে পারেন। পীর-মর্শিদ ছাড়াও সুফিবাদ সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল জারি, সারি, মুর্শিদী ও বিচারগানের মাধ্যমে। কখনো কখনো যাত্রাপালা বা গীতিনাট্যের মাধ্যমে সুফিবাদ প্রচারিত হতো এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করত।  আমাদের গ্রামে একবার গাজী কালুর যাত্রাপালা হলো। এতে দেখানো হলো, গাজী কালু হলেন অলৌকিক মতাসম্পন্ন মানুষ। তিনি সব সময় লোকচুর অন্তরালে থাকেন। তবে কোনো মানুষ যদি কালু বাবার নামে মানত করে শিরনি বিতরণ করে এবং মনে মনে তাকে স্মরণ করে, তাহলে তিনি অলৌকিকভাবে ভক্তের সামনে এসে উপস্থিত হন। তিনি ভক্তের আশা পূরণ করেন। অন্যদিকে কালু বাবা যদি কারও প্রতি বিরূপ হন, তাহলে তাকে রা করার কেউ থাকে না। কহুমুখী আসমানি বালা-মুসিবত, গজব ও জমিনের শত শত বিপদ-আপদ তাকে অক্টোপাশের মতো ঘিরে ধরে। গাজী কালুর যাত্রাপালা হতো সারা রাত ধরে। বিভিন্ন সংলাপের পাশাপাশি থাকত অসাধারণ রিদমের কিছু অনবদ্য সংগীত। তা দর্শকদের হৃদয়-মন ছুঁয়ে যেত। ফলে গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরত। ওই গান শুনে ঘরের নারীরা গাজী কালুর ভয়ে থর থর করে কাঁপত। আমার এখনো মনে আছে, যাত্রাপালা শেষ হওয়ার পর সারা গ্রামে গাজী কালুর নামে শিরনি বিতরণের ধুম পড়ে যায়। মানুষ চলতে ফিরতে একাকী প্রায়ই গাজী কালুর কাছে নিজের আবেদন-নিবেদন পেশ করত। আমার তখন একটি চাকু কেনার বেজায় শখ ছিল। আমাদের তল্লাটের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির ছেলের কাছে সুন্দর একখানা চাকু ছিল। তার বাবা শহর থেকে চাকুটি কিনে এনেছিল। রাশিয়ান চাকু। ছেলেটির নাম মিঠু। আমাদের বয়সি ৭-৮ বছরের বালক। সে সারা দিন কোমরের তাগার (সুতার তৈরি এক ধরনের ফিতা) সঙ্গে চাকুটি ঝুলিয়ে রাখত এবং আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে আম, আমড়া, কামরাঙা প্রভৃতি কেটে কেটে খেত। ঈর্ষায় আমাদের কলিজা পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে লাগল। গ্রামে প্রায় ৫০টির মতো আমাদের বয়সি পোলাপান ছিল। সবার স্বপ্নের মধ্যে কেবল রাশিয়ান চাকু। আমরা সবাই মিঠুকে ভীষণ তোয়াজ করতাম এবং তার চাকুটি একটু ছুঁয়ে দেখতে চাইতাম। সে আমাদের সামান্যতম সুযোগ দিত না। বরং আমরা একটু বেশি অনুনয়-বিনয় করলে সে চিৎকার করে ডাকত, ‘নানি, ও নানি! ওরা আমার চাহু (চাকু) নিবার চায়।’ মিঠুর ডাক শুনে তার বাগদি (বাঘের মতো বিক্রমশালিনী) নানি  আমাদের দিকে তেড়ে আসতেন। আমাদের দলের দুষ্ট ছেলেরা বুড়িকে ভেংচি কাটত এবং লুঙ্গি উঁচিয়ে কিছু একটা দেখিয়ে তাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করত। এরপর ‘ইচিং বিচিং কিচিং খা, কুটনি বুড়ি মইরা যা’ বলে ভো দৌড় মেরে পালাত। ছোট ছোট সোনামণির ৭-৮ জন ছিল সঙ্গতিপন্ন পরিবারের সন্তান। তারা বাড়িতে গিয়ে রাশিয়ান চাকুর বায়না ধরে কান্নাকাটি শুরু করল। সে কী কান্না! কান্নার চোটে গাছের পাতা ঝরে পড়তে লাগল। বাড়ির মুরুব্বিরা কাছাকাছি শহর-বন্দরে ছুটলেন চাকু কেনার জন্য। কিন্তু কেউ কোনো কূলকিনারা পেলেন না। এদিকে শিশুদের কান্না আর থামে না। অনেক মুরুব্বি বিরক্ত হয়ে তাদের শিশুদের আচ্ছামতো ছ্যাঁচা-গুঁতা দিলেন। কিন্তু কাজ হলো না। চাকুর জন্য তাদের পাগলামি আরও বেড়ে গেল। আমিও এই দলের একজন কনিষ্ঠ সদস্য ছিলাম। সবাই মিলে একদিন পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা গাজী কালুর শিরনি দেব। (চলবে) লেখক : সাংবাদিক, কলামনিস্ট

You may also like

Leave a Comment