১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনার অদূরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ জেগে ওঠে।
নদীর মোহনা থেকে দুই কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ১৯৭৪ সালে একটি আমেরিকান স্যাটেলাইটে আড়াই হাজার বর্গমিটারের এ দ্বীপটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে।
পরে রিমোট সেন্সিং সার্ভে চালিয়ে দেখা গিয়েছিল দ্বীপটির আয়তন ক্রমেই বাড়ছে এবং একপর্যায়ে এর আয়তন ১০ হাজার বর্গমিটারে দাঁড়ায়। ভারত সরকার এই দ্বীপের নাম দেয় ‘নিউ মুর’। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পরই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারও নতুন দ্বীপের মালিকানা দাবি করে এর নাম দেয় দক্ষিণ তালপট্টি। অবস্থান দেখানো হয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায়।
ভারত সরকারও দ্বীপটিকে তাদের মালিকানা বলে দাবি করতে থাকে। এই এলাকার বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা বিভাজক হাড়িয়াভাংগা নদীর মূলস্রোত যেহেতু দ্বীপের পশ্চিম ভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সেহেতু ‘নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা নীতি’ বা Thalweg doctrine অনুযায়ী বাংলাদেশ দ্বীপটিকে নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত করছে। অপরদিকে ভারতীয় দাবি হচ্ছে, নদীর মূলস্রোত পরিবর্তনশীল।
অনেকে দাবি করেন, ১৯৫৪ সালে প্রথম দ্বীপটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। দ্বীপটির মালিকানা বাংলাদেশ দাবি করলেও ভারত ১৯৮১ সালে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পতাকা ওড়ায়।ভারতের যুক্তি, ১৯৮১ সালের আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণ তালপট্টির পূর্ব অংশটির অবস্থান ভারতের দিকে, যা ১৯৯০ সালের ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটি চার্টেও স্বীকৃত।
বিবিসির খবর অনুযায়ী দ্বীপটি বর্তমানে ২ মিটার সমুদ্রতলে নিমজ্জিত।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের ৭ জুলাইয়ের রায় অনুযায়ী দ্বীপটি ভারতের সমুদ্র সীমায় পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তবে ২০০৯ সালের মামলার শুরুতে বাংলাদেশ তালপট্টি নিজেদের দাবি করে। এর সমর্থনে মানচিত্র উপস্থাপন করতে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে প্রণীত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানচিত্রে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দক্ষিণ তালপট্টির কোনো অস্তিত্ব নেই। পরে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কোনো মানচিত্রেই এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ২০১০ সালে বাংলাদেশ একটি সংশোধিত মানচিত্র উপস্থাপন করে। সালিশি আদালত ওই সংশোধিত মানচিত্র গ্রহণ করেননি।অপরপক্ষে ভারত তালপট্টিকে নিজ ভূখণ্ড দেখিয়ে সমদূরত্বের ভিত্তিতে সীমারেখা টানার ব্যাপারে যুক্তি দেখিয়েছিল। সালিশি আদালত সমুদ্রসীমা এলাকা পরিদর্শনে এসে তালপট্টির অস্তিত্ব না পেয়ে ভারতের ওই যুক্তি বাতিল করে দেয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সীমারেখা টানা হয় বাংলাদেশের দাবি অর্থাৎ মূল ভূমিবিন্দু থেকে ১৮০ ডিগ্রি রেখা টানার যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে। এ কারণে রায়ে সীমারেখা টানা হয় ১৭৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি বরাবর।
এ সিদ্ধান্তে ভারতের মনোনীত বিচারক ড. পি এস রাও নোট অব ডিসেন্ট দেন। তবে বাকি চারজন ১৭৭ দশমিক ৩ ডিগ্রির পক্ষে একমত থাকার কারণে সেটি রায়ে সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ সাগরে বিরোধপূর্ণ এলাকায় ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে। ভারত পেয়েছে ৬ হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্রে বিলীন হওয়া তালপট্টির অংশটি ভারতের ওই ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় পড়েছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী জানান, তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব এখন নেই। সেটা আরও অনেক আগেই সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। যে এলাকায় তালপট্টি ছিল সমুদ্রের সেই অংশ ভারতের সীমানায় পড়েছে। সেটা একটা ক্ষুদ্র অংশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমায় বড় অংশ পেয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির রায় প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সমুদ্রসীমা বিরোধের এ মামলায় বাংলাদেশের বাদী ডা. দীপু মনি বলেন, তালপট্টির কোনো অস্তিত্বই নেই। এ কারণে এটার দাবিরও কোনো যুক্তি নেই।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রসীমা বিভাগের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খোরশেদ আলম বলেন, দক্ষিণ তালপট্টি বাংলাদেশের অংশ দাবি করা হলেও হাড়িয়াভাঙা নদীর মোহনায় বাংলাদেশ অংশে এর অবস্থান ১৯৮০ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে কোনো মানচিত্রেই দেখানো হয়নি। বিষয়টি কেউ খেয়ালও করেনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নির্ধারণে সালিশি আদালত ১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফের মানচিত্রকে মূল ভিত্তি ধরেছে। এ কারণে দক্ষিণ তালপট্টি যেখানে ছিল সেখানকার সমুদ্রসীমা ভারতের অংশে পড়েছে।
