অস্ট্রেলিয়ার চিঠি :সিলেট মেডিকেলে খুন ও মোমেনের স্বীকারোক্তি

by News Room
 ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন :গত ৭ জুন রাতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি সোমেন দে’র গ্রেফতারের সংবাদে খানিকটা বিস্মিত হয়েছি। ছেলেটা একটা উন্নতমানের গর্দভ না কি? মাত্র তিন দিন আগে, ৪ জুন একই মেডিকেল কলেজের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা তাওহীদকে সদলবলে পিটিয়ে হত্যা করার পরে কোন বিবেচনায় সে রেলপথে শহর ছেড়ে পালাতে গেল? তার কি ধারণা ছিল না, এভাবে পালাতে গেলে তার পুলিশের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি! নাকি কোনো গডফাদারের আশ্বাস ছিল, ‘ট্রেনে চড়ে নিশ্চিন্তে পালিয়ে যায় সোমেন, কেউ তোর টিকিটাও ছোঁবে না’। খুনের দায়ে অভিযুক্ত সোমেনের জন্য করুণা হচ্ছে। ও স্বদলীয় আরেক খুনি বিদ্যুৎ বড়ুয়ার মতো সৌভাগ্যবান নয়। তৎকালীন সুইডেন প্রবাসী ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া ঢাকায় এসে বহিরাগত ভাড়াটে খুনিসহ সদলবলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রাজিবকে গত ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ শহীদ ডা. ফজলে রাব্বী হলে পিটিয়ে হত্যা করেছিল। খুন শেষে বিদ্যুতের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সে দিব্যি ফিরে গেছে সুইডেন। শুনেছি এখন সে ডেনমার্কে আওয়ামী লীগ একাংশের সাধারণ সম্পাদক। বাংলাদেশ থেকে মন্ত্রী এবং চিকিৎসক নেতারা ডেনমার্ক বেড়াতে গেলে তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। খুনি বিদ্যুৎকে দেশত্যাগে সহায়তা প্রদানকারী মানুষটি (বর্তমানে প্রয়াত) পরবর্তীতে নিজেই আমাকে সেই ঘটনার কথা বলেছিলেন। পালানোর প্রক্রিয়ায় বিদ্যুতের প্রতি তার প্রথম উপদেশ ছিল ‘ভুলেও

মোবাইল ব্যবহার করবি না, র্যাব তোকে ট্রেস করে ফেলবে’। আমি নিজে ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। ছাত্রজীবনের শেষ দিকে, নব্বই-পরবর্তীকালে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। তখন ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের মধ্যে দুয়েকবার বড় রকমের সংঘর্ষ হলেও সহাবস্থানের মতো পরিবেশ ব্যাহত হয়নি। পরবর্তীতে সহাবস্থানের এ ধারাটি আর অব্যাহত থাকেনি।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের চারটি ছাত্রাবাসের দুটি ক্যাম্পাসের বাইরে, তার একটি হলো ‘আবুসিনা’। এই হলের ২০০৩ নম্বর কক্ষটির আরেক পরিচয়, ‘সিলেট মেডিকেল ছাত্রলীগের টর্চার সেল’। পত্রিকার সূত্রমতে, এই কক্ষে নিয়মিত মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসেবীদের আড্ডা বসত। ছাত্রদের কাছ থেকে আদায়কৃত টাকায় এ সব জমজমাট আসরের খরচ আসত। লাঠিসোটা, দা, কিরিচ, হকিস্টিক ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার সুবাদে কক্ষটি মালখানা হিসেবেও পরিচিত ছিল। সেই সঙ্গে চলত মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক টর্চার, মূল টার্গেট ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলেও নিরীহ ছাত্ররাও মাঝেমধ্যে রক্ষা পেত না। তাদের এই অপকর্ম, চাঁদাবাজি, নির্যাতনের ঘটনাগুলো ওপেন সিক্রেট, মেডিকেল কলেজের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী সবারই জানার কথা। অথচ সরকার সমর্থক চিকিৎসক নেতা কিংবা শিক্ষকদের কি একবারও মনে হয়নি, এভাবে রাজনীতির নামে মেডিকেল কলেজে অনাচার চলতে পারে না? এ সব অপকর্ম বন্ধে তাদেরও একটা ভূমিকা আছে। গত দশকে জামায়াত-বিএনপির আমলে ছাত্রদলের নির্যাতনের সময়েও ব্যথিত হৃদয়ে তৎকালীন জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক নেতাদের নীরবতা, কখনোবা প্রশয়ও দেখেছি। তখন মনে মনে ভাবতাম, দিন নিশ্চয়ই বদলাবে। রাজিবের মৃত্যুতে প্রথম বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম, আর এখনতো এই নিয়ে যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল। প্রতিশোধের এবং ভোগের এই ধারা নিরন্তর চলবে। ছাত্রদল আগে করেছে, সুতরাং ছাত্রলীগ এখন করছে, আর ছাত্রলীগ এখন করছে বলেই ভবিষ্যতে সুযোগ এলে ছাত্রদলও করবে। যতদিন রাজিব কিংবা তাওহীদের মতো এমন খুনের ঘটনা না ঘটছে, ততদিন তো আর আমাদের টনক নড়ে না। তাওবা আর কতদিন? রাজিব হত্যার বিচারের বর্তমান অবস্থা কী? খুনের দায়ে মূল অভিযুক্ত বিদ্যুৎ পালালেও তার সহযোগী কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের সবাই এখন মুক্ত। প্রকাশ্যে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়, কেউ কেউ শুনেছি ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ নিয়ে পুলিশের চাকরিতেও ঢুকেছে। সমাজে খুনে দায়ে অভিযুক্তেরও এত দাপট! তাওহীদ হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত সিলেট মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা সোমেন দে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাকি খুনিরা এখনো পলাতক। জানি না শরীয়তপুর নিবাসী তাওহীদ হত্যার বিচারের পরিণতি কী হবে? শুনেছি বিচারের ব্যাপারে রাজশাহীতে বসবাসরত রাজিবের আত্মীয়-স্বজনও হতাশ! বিশ্বজি

ত হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো কোনো হত্যাকাণ্ড মিডিয়ার কল্যাণে ব্যাপক প্রচার পেয়ে গেলে তার হয়তো দ্রুত বিচার হয়, নতুবা এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশের প্রকৃত বিচার হয় না।

বিচার হোক না হোক, বাবা-মাসহ তাওহীদ-রাজিবদের স্বজনদের বুকের ক্ষত ঠিকই অক্ষত থেকে যায়। সময় এসে যতই প্রলেপ দিয়ে যাক, ছেলে হারানোর বেদনা কিছুতেই ম্লান হয় না। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে রাজিবের মাও পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। সদ্য নিহত তাওহীদ যে দলের রাজনীতি করত, তাতে আমার কোনো সমর্থন নেই। তথাপি আমি তার মৃত্যুতে ভীষণ শোকাহত। আমি তাকে চিনতাম না, তার মা-বাবাকে আমি কখনো দেখিনি। তবু বারবার পুত্র হারানো মায়ের ম্লান মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ২০০৯ সালের ৩১ মার্চ রাজিব হত্যার প্রতিবাদে একটি দৈনিকে আমি ‘এই নাও মৃত্যু তোমাকে দিলাম’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। লেখাটি পড়ে প্রয়াত রাজিবের মা আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। আমি দেশে গিয়ে রাজিবের মাকে ফোন করেছিলাম। ফোনে আমার লেখাটার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে খালাম্মা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বাবা, আমার ছেলেটা কি ছাত্রলীগ করে কোনো অন্যায় করেছিল?’

এই প্রশ্নের উত্তরটা আমার জানা নেই।

লেখক : কবি, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত।

You may also like

Leave a Comment