“মানবাধিকার হোক সকলের জন্য সমান”

by News Room

॥ মো: ফখরুল ইসলাম ॥

গ্যারিলিচ আমেরিকার একজন মুক্তমনা সাংবাদিক ও কলামিষ্ঠ। তিনি কানাডা ক্যাম্প ব্রিটন “বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক। তিনি আমেরিকার” কাউন্টার পাঞ্চ ম্যাগাজিন এর ২২ আগষ্ট ২০১৪ ইং সংখ্যায় একটি কলাম লিখেন যার শিরোনাম ছিল “আয়নায় নিজেদের মুখ ও দেখতে হবে” গ্যারিলিচ এর প্রকাশিত এ কলামটি গত ২৮ আগষ্ট ২০১৪ ইং দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
তিনি মূলত তার লেখনিতে আমেরিকান সাংবাদিক জেমস ফলিয়র-এর নৃশংস হত্যাকান্ডের জন্য শুধু ইসলামিক ষ্টেট অব ইরাক ও সিরিয়া (আই এস আই এস) কে দায়ী না করে পশ্চিমা মিডিয়া এবং শক্তিধর পশ্চিমাদেশগুলি অব্যাহত ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও বেসামরিক নারী পুরুষ শিশু হত্যাকে দায়ী করছেন। তিনি বলেছেন বিগত পাঁচ বছরে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সোমালিয়া, ইয়েমেন, ইরাকে ৩৫% হতে ৪০% বেসরকারী লোক মৃত্যু বরণ করেছে। বিগত তের বছরে ইরাকে ৩৫% হতে ৪০%বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে আর এর কিছুদিন পুর্বেও ইসরাইল ফিলিস্তিনের গাজায় স্থল ও বিমান হামলা চালিয়ে দুই হাজারের অধিক নিরস্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। যার মধ্যে নারী ও শিশু ছিল উল্লেখযোগ্য। নৃশংসযজ্ঞের পরিমান সম্পর্কে পশ্চিমা গবেষনা ও অনুসন্ধানী রিপোর্টে তা সত্য হিসাবেও প্রমানিত হয়েছে।
আমেরিকার বিখ্যাত লেখক  জিম ফ্রেডরিক তার বই“ ব্লেক হার্টস ওয়ান প্লাটুন ডিসেন্ট ইনটু মিডনেস ইন ইরাক ট্রায়াঙ্গেল অব ডেথ”-এ ২০০৬ সালে ইরাকে চার সদস্যের একটি পরিবারের উপর মার্কিন সেনাদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। সে সময় সেনা অফিসার পল কর্তেজ ও তার সেনা ইউনিট দণি বাগদাদে টহলরত ছিল। তখন তার সহকর্মী জেমস ব্রেকার তাকে বলে একজন ইরাকি তরুণীকে ধর্ষণ করার সুযোগ আছে। তারপর ঐ পরিবারের উপর অপারেশন চালাবার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের হিংস্র পশুত্ব চরিতার্থ করার সংকল্প ব্যাক্ত করে। পরিবারের সকলকে শোয়ার ঘরে একত্রিত করে ১৪ বছর বয়সী তরুনী আবিরকে সরিয়ে নেয়। সেনা সদস্য গ্রীন প্রথমেই পরিবারের প্রধান জানবিকে অতপর বাকিদের একে-৪৭ এর বুলেটে একে একে হত্যা করে। আর এদিকে নরপশু কর্তেজ আবিরের সম্মান হানি করে ব্রেকার কে সুযোগ দেয়।
গ্রীন পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যা করে কর্তেজ ও ব্রেকারকে জানালো। এরপর কর্তেজ আবিরকে জোর করে ধরে রাখে আর গ্রীন তৃতীয়বার ধর্ষণ করে পশুত্ব চরিতার্থ করে। অবশেষে কর্তেজ আবিরের মুখে বালিশ দিয়ে চেপে ধরে আর গ্রীন তার একে ৪৭ রাইফেলের বুলেটে আঘাতের পর আঘাত করে আবিরকে হত্যা করে। জিম ফ্রেডরিক এর লেখনি থেকে যে করুণ বর্বর নৃশংসতার চিত্র ফুটে  উঠেছে তা হয়তো ইরাক, আফগানিস্তানের আরো শত সহস্র পরিবারে এ নৃশংস বর্বরতার কাহিনী অজানাই থেকে গেছে।
বিশ্ব বিবেকের নিকট প্রশ্ন থেকে যায়? নিঃসন্দেহে ইরাকে মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলিয়র-এর শিরচ্ছেদ একটি নৃশংস হৃদয় বিদারক ঘটনা এতে কোন দ্বিধা নেই। তবে কি? ইরাকি অসহায় বালিকা আবিরের সম্ভ্রমহানি ও হত্যা অতঃপর পরিবারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে খুনের ঘটনা নৃশংস-বর্বর ও হৃদয় বিদারক নয়?
শুধু মাত্র চরিত্রহীন কতিপয় সেনা সদস্যের পশুত্বকে চরিতার্থ করার জন্য নিরপরাধ নির্দোষ একটি পরিবারের উপর ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরতা চালানো হলো। তার নূন্যতম কোন প্রতিক্রিয়াই মানবতাবাদী বিশ্বের নিকট পরিলতি হয়নি। একজন জেমস ফলিয়র-এর মৃত্যুতে পশ্চিমা মিডিয়া ও মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে যেরূপ হৈচৈই করতে দেখা যাচ্ছে এক আবির ও তার পরিবারের জন্যতো কোন রূপ হৈচৈই চোখে পড়েনি।
তাহলে কি মানবিক অধিকার একেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠির  জন্য একেক রকম? নিশ্চয় এমনটি হতে পারে না। এর পরও তাই হচ্ছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ফিলিস্তিন (সদ্য সমাপ্ত) দেশ গুলিতে বোমা মিসাইলে নির্মম ভাবে নিহত বেসামরিক জনগনের করুন অবস্থা কোন অংশেই কম নয়। অথচ তথাকথিত মানবতাবাদীরা ও পশ্চিমা মিডিয়া গুলির নিকট তার কোন গুরুত্বই নেই।
মার্কিন সাংবাদিক গ্যারিলিচ এর প্রতি অজস্র সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলতে হয় তিনি নিজে বিষয়টি উপলব্ধিতে নিয়ে যে কলামটি লিখেছেন এবং তার মূল্যায়নে তিনি বলেছেন, প্রত্যেক ধরণের উপনিবেশিক প্রতিরোধে আমরা নিষ্ঠুর প্রতিরোধ যুদ্ধ দেখি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বায়ন ও তাদের আগ্রাসী মনোভাব এই নিষ্ঠুরতা বা জেমস ফলিয়রের শিরচ্ছেদ ঘটনার জন্য দায়ী। এটা অবশ্যই সত্য যে, আমেরিকার ইরাক আক্রমনের পূর্বে কোন জঙ্গি গোষ্ঠির উত্থান হয়নি। ইরাক আক্রমনের পরই উপনিবেশিক শক্তির প্রতিরোধের কুৎসা ও ােভ থেকেই তার উত্থান। আর তার থেকে জন্ম নিয়েছে ইসলামিক ষ্টেইট অব ইরাক এন্ড সিরিয়া ( আই এস আই এস)। তাই নির্দিধায় বলা যায় নির্বিচারে গণহত্যা  ও অত্যাচার নির্যাতনের পরিবেশই জঙ্গি সংগঠনে সাধারনের অংশগ্রহনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় আই এস, আমেরিকার সৃষ্টি।
আফগানিস্তানে দীর্ঘ কয়েক বছর থেকে মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রন এবং অত্যাচার নির্যাতনে প্রতিরোধের মনোবৃত্তি থেকে তালেবান যুদ্ধাদের ঐ সমস্ত পথে ঠেলে দেয়। আলকায়েদা দমনের নামে আফগানিস্থান ও পাকিস্তানে সেনা অভিযান এবং ড্রোন হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক জনগনকে  নির্বিচারে হত্যার নিষ্ঠুরতা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিককালে মিশর ও ফিলিস্তিনে যে বর্বরতা হয়েছে তার  ধরন ও প্রকৃতি একই। এভাবে আর কত ল নিরিহ মানুষকে হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হবে তা কেউই জানেনা। আর কত মায়ের শিশুকে বোমা ও মিসাইলের আঘাতে ত-বিত হতে হবে তার হিসাব এখনো অজানা। কত মুসলিম কিশোরী ও নারীকে ইজ্জত হারাতে হবে ঐ সমস্ত নরপশু নায়ক পাপিষ্টদের কবলে তারও কোন পরিসখ্যান এখনোই দেখা যাবেনা। কিশোরী আবিরের আর্ত চিৎকারে দুনিয়া ও আল্লাহর আরশ কেপে উঠলেও তথাকথিত মানবতাবাদী পশ্চিমাদের হৃদয়ে ন্যূনতম করুনা তৈরি হয় না। তবে ধন্যবাদ জানাই বিবেক সম্পন্ন মার্কিন সাংবাদিক কলামিষ্ট গ্যারিলিচ ও জিম ফ্রেডারিককে। তারা তাদের লেখনির মাধ্যমে বিশ্বে এরূপ বিবেক সম্পন্ন মানুষের অন্তর চুকে খুলে দিয়েছেন।
বিশ্বে এরূপ সত্য উদঘাটনকারী সাহসী  কলম সৈনিকের বড়ই প্রয়োজন। ধর্মীয় ও প্রতিহিংসার দৃষ্টি পরিহার করে প্রকৃত সত্য প্রকাশে নির্ভিক লেখক যত বাড়বে বিশ্বের অস্থিরতা ও হিংস্রতা তত কমে আসবে। আমরা আরো হাজারো গ্যারিলিচ ও জিম ফ্রেডরিকের জন্ম কামনা করি। গ্যারিলিচ এর ভাষায় বলবো “আয়নায় নিজেদের মুখও যে দেখতে হবে।” আরো বলবো মানবাধিকার হোক সবার জন্য সমান।

You may also like

Leave a Comment