সাইফ হাদি : শুরুটা করেছিলেন অনেকটা ধূমকেতুর মত। ২১শে নভেম্বর ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খুলনায় সিরিজের ২য় টেস্টে বাংলাদেশের ৬৫তম টেস্ট খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক হয় তার। শুরুতেই পরেন খুব কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি। ১৯৩ রানে যখন ৮ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ধুকছিল অনেকটাই তখন ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে এসে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সাথে জুটি গড়েন। কে জানত সেদিন এক ইতিহাস তৈরি হবে? আপনি, আমি কিংবা আমাদের আশেপাশে যারা ছিল কেউ কি ভেবেছিল সেদিন এমন কিছু করবে বাংলাদেশের টেল এন্ডের কোন ব্যাটসম্যান!
সবাই যখন প্রমাদ গুণছিলাম ২০০ রান হবে কিনা তখন যেন অন্য কিছু করে দেখানোর মন্ত্র জপছিল মাঠে থাকা দুই ব্যাটসম্যান। তাই তো ৯ম উইকেট জুটিতে এই দুজন মিলে গড়ে তুলে বাংলাদেশের সেরা জুটি। ৩৭৭ রানে আউট হয়ে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেও তখনো যে মাঠে ছিলেন অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান। তবে ততক্ষণে বিশ্ববাসী দেখে ফেলে এক বিরল এক ঘটনা। ১০ নাম্বারে ব্যাটিং এ নেমে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করার সেই কীর্তি এর আগে করেছেন মাত্র একজন ব্যাটসম্যান। তাও ওই ঘটনার ১১০ বছর আগে। সেদিনের সেই ইনিংসটি যারা যারা দেখেছে তারা তাদের সারাজীবন ধরে এই দিনটির কথা মনে রাখবেন।
কি ছিল না সেদিন? সেদিনের তার ব্যাটিং দেখে কেউ ভাবেনি এখানে বাংলাদেশের কোন টেল এন্ডের ব্যাটসম্যান ব্যাটিং করছেন। মাঠের চারিদিকে করা তার শট গুলো অনেক ব্যাটসম্যানদের কাছে দেখা যায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের একরকম ছন্নছাড়া করে ছেড়েছেন তিনি। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হবার আগে ১৬৩ মিনিট ক্রিজে থেকে ১২৩ বলে ১৪টি চার ও ৩টি ছয়ের সাহায্যে ১১৩ রান করেন তিনি। আর সেই সাথে দলকে ২০০ রানে অল আউট হওয়া তো দূরের কথা, দলকে সম্মান জনক ৩৮৭ রানের স্কোর গড়তে ভূমিকা রাখেন এই ডানহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার।
জন্ম তার বাংলাদেশের সিলেট জেলার ছোট শহর কুলাউড়ায় ১৯৯২ সালের ৫ই আগস্ট। ছোটবেলা থেকেই তিনি পাড়ার ক্রিকেটে ব্যাটিং করতেন। ব্যাটিং এ খেলতেন ওপেনিং পজিশনে। করতেন মারকাটারি ব্যাটিং। বোলারদের পিটিয়ে ছাতু বানাতে খুব বেশি পছন্দ করতেন। এমনকি বয়স ভিত্তিক দলে অনুর্ধ্ব-১৫ পর্যন্ত খেলছেন ব্যাটসম্যান হিসেবে। ব্যাটিং এর পাশাপাশি করতেন ফাস্ট মিডিয়াম বোলিং। একদিন একটা ভাল স্পেলে বোলিং করতে দেখে বাংলাদেশের সাবেক খেলোয়াড় মিনহাজুল আবেদিন তাকে ফাস্ট বোলিং এ পুরোপুরি মনযোগী হতে বলে। সেই থেকেই ব্যাটিং ছেড়ে একজন পুরোদস্তুর বোলার হয়ে উঠেন তিনি।
২০১২ সানে অভিষেক হওয়ার পর টেস্ট খেলেছেন মোট ৩টি। তিন ম্যাচের ৫ ইনিংস ব্যাটিং এর সুযোগ পেয়েছেন। করেছেন মোট ১৬৫ রান যার ১১৩ রান সেই অভিষেক টেস্টেই। বোলিংয়ে ও ব্যাটিং এর মতই নিষ্প্রভ ছিলেন তিনি। ৩ ম্যাচের ৫ ইনিংসে বোলিং করেছেন ৫২৮ বল। যেখানে ৩৭১ রান দিয়ে পেয়েছেন মাত্র ৩ উইকেট। তাই ২০১৩ সালের ১৬ই মার্চ শ্রীলংকার বিপক্ষের টেস্টটি হয়ে যায় এখন পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট। টেস্ট অভিষেকের কিছুদিন পরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই বাংলাদেশের ১০২ তম খেলোয়াড় হিসেবে তার ওয়ানডে অভিষেক হয়। টেস্টে অভিষেক ম্যাচে আলো ছড়াতে পারলেও ওয়ানডে তে ছিলেন তার উলটো। খেলছেন ৬ ম্যাচ। ৬ ইনিংস বোলিং করে পাননি কোন উইকেট। টেস্ট, ওয়ানডের মত টি-২০ও খেলেছেন তিনি। সেখানে ৫ ম্যাচে বোলিং করে পেয়েছেন মাত্র ৪টি উইকেট।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেকটা ভালই করেছেন তিনি। ঘরোয়া লীগের ফার্স্ট ক্লাস, লিস্ট এ ও টি-২০ মিলিয়ে খেলেছেন মোট ১৬৪ টি ম্যাচ যেখানে নিজের ঝুলিতে পুরেছেন ১৯৩টি উইকেট।
এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম তিনি হলেন আবুল হাসান রাজু। ধূমকেতুর মত তিনি এসেছেন আবার হারিয়েও গেছেন অনেকটা। যা অবশ্য কারোরই কাম্য নয়। খুব করে চাইব ইতিহাসের ২য় ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকে ১০ নম্বর পজিশনে নেমে সেঞ্চুরি করা খেলোয়াড়টি ফিরে আসুক আবারও। অনেকেই হারিয়ে যান চিরতরে। কেউ কেউ হারিয়ে গিয়েও ফিনিক্স পাখির মত ফিরে আসেন Stronger Than Ever হয়ে। তাই আবুল হাসানরা ফিরে আসুক এই বাংলার ক্রিকেটের সোনালী দিনের যাত্রী হয়ে। মিটিয়ে দিক আমাদের একজন বোলিং অলরাউন্ডারের আক্ষেপ।
