দুই দশক ধরে নির্বাসিত বিশ্বজুড়ে আলোচিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন বলেছেন, স্বদেশে ফেরার অধিকার অর্জনের জন্য তার লড়াই থামবে না এবং বার বার প্রত্যাখ্যাত হলেও বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়েই যাবেন তিনি। সূত্র : বিবিসি। আর দিন কয়েকের মধ্যেই তার নির্বাসনের কুড়ি বছর পূর্ণ হতে চলেছে। তসলিমা অভিযোগ করেছেন, ‘ধর্মান্ধ একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভয়েই শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেউই তাকে এতদিন দেশে ফিরতে দেয়নি। তার ব্যাপারে দিলি্ল যাতে ঢাকার সঙ্গে কথা বলে, ভারতের নতুন সরকারের প্রতি তিনি সেই আর্জিও জানিয়েছেন। তসলিমা নাসরিনকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি, তারপর সুইডেন-আমেরিকা-ফ্রান্স-কলকাতা, নানা দেশ, নানা শহর ঘুরে প্রায় বছর-তিনেক হলো দিলি্লই তার ঠিকানা। চাইলেও বাংলাদেশে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তার যাওয়ার রাস্তা বন্ধ কিন্তু তসলিমা বলছেন, আজ ২০ বছর পরেও তিনি এতটুকু হাল ছাড়তে রাজি নন। তিনি বলেন, যতদিন বাঁচব ততদিন আমার দেশে ফেরার লড়াই চলবে। হয়তো সেখানে থাকব, হয়তো থাকব না কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্যই আমি আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে চাই, বাংলাদেশে ফিরতে চাই!
দূতাবাস থেকে খালি হাতে : দেশে ফেরার সেই অধিকার আদায় করার জন্যই এখনো নিয়ম করে কিছু দিন পর পরই মেয়াদ ফুরোনো পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হাজিরা দেন তিনি।
লড়াই চলবে : দূতাবাস তাকে বার বার ফিরিয়ে দেয়, লিখিতভাবে কখনো কিছু জানায়ও না কেন তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। তসলিমা বলেন, দূতাবাসের কর্মীরাও অনেকেই আমার প্রতি সহানুভূতিশীল, কিন্তু সরকারের নির্দেশের বাইরে যাওয়ার এক্তিয়ার তো তাদের নেই! ঠিক একই রকমভাবে, পশ্চিমবঙ্গেও মমতা ব্যানার্জি যদিও সিপিএমের সব বিষয়ে প্রতিবাদ জানান কিন্তু তসলিমা নাসরিনের প্রশ্নে সিপিএমের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই!
ধর্মান্ধদের ভয়ে হাসিনা-খালেদাও এক : বাংলাদেশে বা পশ্চিমবঙ্গেও কেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তার বিরোধিতায় এককাট্টা, তার নিজস্ব ব্যাখ্যাও আছে তসলিমা নাসরিনের। আর সেটা হলো, তিনি মুসলিম মৌলবাদীদের চটিয়েছেন, কাজেই তাকে তাড়িয়ে দিয়ে দলগুলো দুটো বাড়তি মুসলিম ভোট পেতে চায়-বলেন তিনি। তসলিমা বলেন, অথচ আমায় তাড়িয়ে মুসলিম ভোট মেলে, এমন কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে সিপিএম একটাও মুসলিম ভোট বেশি পায়নি- দাবি তসলিমার।বিদ্রোহী রুশ লেখক আলেকজান্ডার সলঝেনিৎসিনও দেশে ফিরতে পেরেছিলেন ১৬ বছর পর। -প্রতিদিন ডেস্ক
কিন্তু তসলিমা নাসরিন অতটা আশাবাদী নন, কারণ তার বিশ্বাস বাংলাদেশে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোর দাপট কমছে না, বাড়ছে।
কিন্তু এদের ভয়ে কেন সরকার তাকে দেশে ফিরতে দেবে না, এটাই তার বোধগম্য নয়। এরা দেশকে হাজার বছর পিছিয়ে দিতে চায়। আর শুধু এরা আমার চিন্তাভাবনা অপছন্দ করে বলে সরকার আমাকে তাড়িয়ে দেবে? প্রশ্ন তার।
মোদির সরকারের কাছে আর্জি : ভারতে যে নতুন সরকার বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তারা যাতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তার দেশে ফেরার বিষয়টি উত্থাপন করেন, বিবিসির মাধ্যমে সেই আবেদনও জানিয়েছেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, ভারত সরকার যদি আমার প্রসঙ্গ বাংলাদেশের কাছে তোলেন তাহলে আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকব। ভারত আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কিছুটা হলেও মর্যাদা দিচ্ছে, শুধু সেজন্যই তাদের বাংলাদেশকে আমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথাটা বলা দরকার!
বিগত কংগ্রেস জমানাতেও তিনি সরকারকে একই আর্জি জানিয়েছিলেন। তসলিমা বলেন, আমি তাদের বলেছিলাম বাংলাদেশ তো এত কিছুর জন্য আপনাদের ওপর নির্ভরশীল। তো মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বার্থেই আপনারা বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় (আমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার) শর্তটা জুড়ে দিন। কিন্তু কংগ্রেস আমলে সে ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি, আর ভারতে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরেও তসলিমার প্রসঙ্গ ওঠেনি।
তবে তসলিমা নাসরিন বলছেন, তিনি তিস্তা বা সীমান্ত চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ নন ঠিকই, কিন্তু বাকস্বাধীনতার অধিকারও কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, আর শুধু সে জন্যই ভারত একদিন তার হয়ে মুখ খুলবে বলে তার আশা!
