স্বাধীনতা-সাম্য-ভ্রাতৃত্বঃ ফ্রান্সের বিপ্লবী ত্রি-মন্ত্রের করুণ চিত্র!

by News Room

মাসুদ রানা:ফ্রান্সের ১৭৮৯-৯৯ সালের তিন মন্ত্রের বিপ্লব সারা বিশ্বকে দিয়ে মুক্তির প্রেরণা দিয়েছিলো, যা আজও মুক্তিকামী মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। তিন মন্ত্রের প্রথমটি ছিলো ‘Liberté’ বা স্বধীনতা, দ্বিতীয়টি ছিলো ‘Egalité’ বা সাম্য, এবং তৃতীয়টি ছিলো ‘Fraternité’ বা ভ্রাতৃত্ব।

কিন্তু আজ আজ ফ্রান্সে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অবস্থা কী? প্রথমে স্বাধীনতার কথা বিবেচনা কর যাক – বিশেষতঃ বর্তমান সময়ের বহু-আলোচিত ‘ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন’ বা প্রকাশের স্বাধীনতা।
মানুষ নিজেকে শুধু শব্দে ও চিত্রে প্রকাশ করে না। সে তার পোশাকে-আশাকে, আচারে-সংস্কৃতিতেও প্রকাশ করে থাকে। ব্যক্তি-মানুষ শুধু নিজের ব্যক্তিত্বের নয়, নানা সামাজিক প্রকারের সদস্যত্বও তার পোশাকের মাধ্যমে প্রাকশ করে।
ফ্রান্সে ‘ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন’ বা প্রকাশের স্বাধীনতা এমনই যে, একজন মুসলিম নারী তাকে যেভাবে প্রকাশ করতে চায়, তা পারছে না। সেখানে গণস্থানে নারীদের নাক-মুখ ঢাকা নিকাব পরা নিষিদ্ধ – অর্থাৎ স্বাধীনতা নেই।
তবে, সেই মুসলমানদের পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গ করে কার্টুন প্রকাশ করে সমগ্র মুসলমান নর-নারীকে এক হাস্যকর জীব হিসেবে দেখানোর ‘ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন’ আছে, যা ফ্রান্স সরকারীভাবে সমর্থন করছে এবং যেকোনো মূল্য রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
ফ্রান্সে ‘শার্লি হেবদো’ নামের বিতর্কিত ম্যাগাজিনটি মুসলমানের নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কী ব্যঙ্গচিত্র করেছে, সেটি এখানে না-ই আনলাম। মুসলমানের পোশাক নিয়ে কী করেছে, সেটি বলছি।
শার্লি হেবদো ‘MUSULMANS’ নামে একটি ব্যঙ্গ পৌস্টার প্রকাশ করেছে, যেখানে এক নারী ও পুরুষের চিত্র আঁকা, যা মুসলমানের চিত্র। নীচে আমি আমার পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করছি।
চিত্রে দেখানো হচ্ছে এক নারী, যার মাথা হিজাবে ঢাকা; কিন্তু এ-ছাড়া তার দেহে আর কোনো বস্ত্র না থাকার ফলে ঊর্ধ্বঙ্গে তার পুরুষ্ট স্তন দু’টি উন্মুক্ত এবং নিম্নাঙ্গের যোনি কালো যৌনকেশে আবৃত। আর, পুরুষটির মাথা উড়ে যাচ্ছে একটি টুপি এবং মুখ থেকে হাঁটু পর্যন্ত আবৃত হয়ে আছে কালো দাড়িতে; আর সে-দাড়ি ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে তার লিঙ্গ। এই হচ্ছে MUSULMANS-এর চিত্র!
বুঝলাম, ফ্রান্সের মুসলামানকে ফ্রান্সের মাটিতে এভাবে চিত্রিত করা ‘ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন’এর মধ্যে পড়ে। কিন্তু এদেরকে এভাবে একটি ‘এ্যালিয়েন ক্যাটেগোরি’ হিসেবে চিত্রিত করা কি সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মধ্যে পড়ে? নিশ্চয় তা পড়ে না।
‘ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন’ যে সীমাহীন নয়, তার ওপর সবিশেষ জোরারোপ করে গত বছর নভেম্বর মাসে দেওয়া এক বক্তৃতায় ইউরোপের সর্বজ্যেষ্ঠ, অভিজ্ঞ ও সফল রাষ্ট্রপ্রধান জার্মান চেন্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল বলেছেনঃ
“Expressing an opinion does not come at zero cost. But freedom of expression has its limits. Those limits begin where hatred is spread. They begin where the dignity of others is violated.
This house must and will oppose extreme speech, otherwise our society will no longer be the free society it was.”
অর্থাৎ, “মতামত প্রকাশ বিনাখরচে আসে না। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা আছে। সেই সীমা শুরু হয় সেখানে, যেখান ঘৃণা ছাড়ানো হয়। এই সীমা শুরু হয় সেখানে, যেখানে অন্যের মর্য্যাদা লঙ্ঘন করা হয়। এই হাউসকে চরম বক্তব্যের বিরোধিতা করতে হবে, অন্যথায় আমাদের সমাজ আর মুক্ত সমাজ থাকবে না, যেমনটি ছিলো।“
মিসেস মার্কেল যথার্থই বলেছেন ‘ফ্রীডম অফ এক্সেপ্রশন’-এর সীমা আছে। বস্তুতঃ কোনো স্বাধীনতাই সীমাহীন নয়।
একজনের মত প্রকাশ করতে গিয়ে অন্যজনকে অপমান করার নাম স্বাধীনতা হতে পারে না। কারণ, সমান মানবিক মর্য্যাদা স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানবিক সমাজে মানুষকে যদি অমানুষের মতো ট্রীট করা হয়, এর প্রতিক্রিয়া কখনও মানবিক হয় না।
একটি ধর্মীয় বা জন-সম্প্রদায়ের সবাইকে যদি নির্বিচারে অমানবিকীকরণ (Dehumanisation) করা হয়, তখন তাদের সবাই না করলেও তাদের কেউ-কেউ আচরণকারীদের প্রতি নির্বিচারে অমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেই পারে। বিজ্ঞান বলে, প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।
আজ ধর্মের নামে নিসের চার্চে যে বর্বরতার সাথে ৭০ বছরের নারীর শিরোচ্ছেদ-সহ তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে, এটি যে মিসেস মার্কেল নির্দেশিত “অন্যের মর্য্যাদা লঙ্ঘন করা”র ফল, সে-বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে।
আমাদেরকে যেমন আল্লাহ্‌র নামে নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে অন্যের অপমান ও অমর্য্যাদা করার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে হবে।
লেখক:যুক্তরাজ্য প্রবাসী।লেখক,প্রাবন্ধিক ও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট।

You may also like

Leave a Comment