আবদুল কাদের তাপাদার
দীর্ঘ একযুগের প্রতীক্ষার পর দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলে খ্যাত সিলেট নগরীতে আনজুমানে খেদমতে কোরআন আয়োজিত ৩৬ তম ঐতিহাসিক তাফসির মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।নগরীর সবচেয়ে বড় মাঠ এমসি কলেজ মাঠে ৯ জানুয়ারি ( বৃহস্পতিবার) থেকে
শুরু হচ্ছে এই ঐতিহাসিক মাহফিল। তিনদিন ব্যাপী এই মাহফিল চলবে ১০ জানুয়ারি জুমাবার ও ১১ জানুয়ারি শনিবার পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য এই মাহফিলে প্রধান মুফাসসির হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এসময়ের সবচেয়ে জননন্দিত ইসলামি স্কলার মিজানুর রহমান আজহারি।
১১ জানুয়ারি সকাল ১০ টায় তাফসির মাহফিলের মাঠে মহিলাদের উদ্দেশ্যে বয়ান পেশ করবেন আজহারি।
এছাড়াও মাহফিলে তাফসির পেশ করবেন
বর্ষীয়ান ও আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় সুপরিচিত ইসলামি চিন্তাবিদ শায়েখ সাইয়্যেদ কামালুদ্দিন জাফরী, পীরজাদা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী,মুফতি আমির হামজা,মাওলানা সাদিকুর রহমান আনসারী, মাওলানা আবদুল্লাহ আল আমিন,শায়েখ ইসহাক আল মাদানিসহ দেশ বরেণ্য উলামায়ে কেরাম।
মাহফিল সফল করতে গত পনের দিন থেকে সিলেট শহর ও শহরতলীতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সড়ক মহাসড়কের পয়েন্টে পয়েন্টে ডিজিটাল সাইনবোর্ড ও ব্যানার লাগানো হয়েছে। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। দিনরাত
শহরের রাজপথ ও অলি গলি জুড়ে মাইকিং চলছে।
মানুষের মুখে মুখে এখন মাহফিলের কথা। কেউ এই মাহফিলকে ‘সাঈদীর মাহফিল’ আবার কেউ ‘আজহারির মাহফিল’ বলে অভিহিত করছেন।
মাহফিলে সিলেট ছাড়াও দূর দূরান্তের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ শরীক হবেন বলে আশা করছেন আয়োজনকারীরা।
মাহফিল বাস্তবায়ন কমিটি,উপ কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর স্মৃতি বিজড়িত সিলেটে এই তাফসির মাহফিলের গোড়াপত্তন হয় ১৯৭৭ সাল থেকে।এর আগের বছর সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রচেষ্টায় গঠন করা হয় ‘আনজুমানে খেদমতে কোরআন’ নামক ইসলামি সমাজসেবামূলক সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্যােগে ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনদিন ব্যাপী, পাঁচদিন ব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।সিলেটের মাহফিলে ২০০৯ সালে সর্বশেষ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বয়ান পেশ করেন। এরপর ২০১০, ২০১১ সালে সাঈদী বিহীন সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।১৯৭৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ঐতিহাসিক মাহফিলে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী প্রতিবছর তাফসির পেশ করতেন। নগরের প্রাণকেন্দ্র সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে এসব তাফসির মাহফিলে লাখো মানুষের ঢল নামতো। শেষ দিনের মাহফিল শেষে বিশেষ মুনাজাতে সিলেটের প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী এমপিসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হতেন। সেই মুনাজাতে যেনো সিলেট শহর ভেঙে পড়তো আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে। এক বিরল দৃশ্য পরিলক্ষিত হতো সিলেটে।
১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের জরুরি অবস্থার সময়ও মাহফিল বন্ধ হয়নি।আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সিলেট এয়ারপোর্ট থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ফলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সিলেটের মানুষ। বিক্ষোভে উত্তাল সিলেটে সড়ক পথে ফিরিয়ে আনা হয় সাঈদীকে।যা এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে আজো সিলেটবাসীর স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।
সর্বশেষ ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে আনজুমানে খেদমত কোরআন আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে দুই দিন ব্যাপি তাফসির মাহফিলের আয়োজন করে। কিন্তু প্রথম দিনই সকাল বেলা পুলিশ মাঠের মঞ্চ ও প্যান্ডেল ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এরপর দীর্ঘ একযুগ সিলেটবাসী আর তাফসির মাহফিলের মুখ দেখেনি।
দীর্ঘ ১২ বছর পর বৃহস্পতিবার থেকে তিনদিনের এই ঐতিহাসিক মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পরিবর্তে কয়েকগুন বড় মাঠ এমসি কলেজ মাঠে।
এমসি কলেজ মাঠের এই ঐতিহাসিক তাফসির মাহফিলের প্রস্তুতি ঘিরে সিলেটে কয়েক দিন থেকে বেশ তোড়জোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নগর ও নগরের আশপাশের এলাকায় এবং বিভিন্ন জেলায় নানাভাবে প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে।
মাহফিল বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক ও আনজুমানে খেদমতে কোরআনের সহ-সভাপতি হাফিজ মাওলানা আবদুল হাই হারুন মাহফিল সম্পর্কে বলেন, এটা একটা ঐতিহাসিক মাহফিলের রূপ ধারণ করবে। দীর্ঘ একযুগ পরে
সিলেটের ইসলামপ্রিয় মানুষ মুক্ত পরিবেশে কোরআনের তাফসির মাহফিলে শরীক হতে পারবেন।
আমাদের ধারণা মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলের দিনে ৫ লক্ষাধিকেরও বেশি লোকের ঢল নামবে।
মাহফিল বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনীতিক মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন ,
সিলেটের মানুষ এই মাহফিলের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে কোরআনের তাফসির মাহফিলে দেশের বরেণ্য ইসলামি
স্কলাররা আসছেন। তারা কোরআনের তাফসির পেশ করবেন। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে
ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কাজ করতে আমরা নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হবো।
তিনি সিলেটবাসীকে মাহফিল সফল করতে এগিয়ে আসার আহবান জানান।
আনজুমানে খেদমতে কোরআনের সেক্রেটারি ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ হাফিজ মাওলানা মিফতাহ উদ্দিন সিলেটের এই ঐতিহাসিক তাফসির মাহফিলকে সফল করতে সিলেটের সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসায় আহবান জানিয়ে বলেন,
মাহফিলের শিক্ষা নিয়ে আগামীতে কোরআনের সমাজ গড়ার কাজে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
এদিকে, তাফসির মাহফিলকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটান পুলিশ এসএমপি।
এসএমপি কমিশনার রেজাউল করিম তাঁর দলবল নিয়ে ইতোমধ্যে মাঠ পরিদর্শন করে পুলিশ বাহিনীকে নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাফসির মাহফিলে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মাথায় নিয়ে কাজ করছে।
এ বিষয়ে এসএমপির এডিসি (মিডিয়া ) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে মঙ্গলবার জানান, আমরা তাফসির মাহফিলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে
নিরাপত্তার বিষয়টি দেখছি।
মাহফিলস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। যে কোনো ধরনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে বলে তিনি জানান।
