সাহিত্যচর্চার জন্য ‘ফেসবুক’ বর্তমানে সর্বাধিক জনপ্রিয় মাধ্যম নিঃসন্দেহে। বিশেষ করে তরুণরা ফেসবুকমাধ্যমে ব্যাপক সাহিত্যচর্চা করছেন বর্তমানে। এমনকি এই ফেসবুকমাধ্যম থেকেই জন্ম হচ্ছে অনেক তরুণ সাহিত্যিকের যাদের কাগজে-কলমে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। একসময় কবি-সাহিত্যিকদের নিকট ‘আপনার প্রথম লেখা কোথায় প্রকাশিত হয়েছে’ জানতে চাইলে তারা বিভিন্ন পত্রিকার নাম বলতেন, কেউ বা কোনো লিটলম্যাগের উল্লেখ করতেন। নিদেনপক্ষে ‘স্কুল ম্যাগাজিন’ ছিল এ জাতীয় প্রশ্নের সবচেয়ে কমন উত্তর। কিন্তু বর্তমান সময়ে ‘ফেসবুক’ হচ্ছে এরকম প্রশ্নের অত্যন্ত কমন একটি উত্তর, যদিও এমন প্রশ্নের মুখোমুখি এখনও হয়তো বা কেউ হননি। প্রথম লেখা কেবল ফেসবুকেই প্রকাশিত হচ্ছে যে তা না, বরং অনেকের লেখাই উৎপাদিত হচ্ছে ফেসবুকে! তাও ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ দিয়ে নয় হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল ফোনে। সত্যি, কতো সহজ হয়ে গেছে এখনকার সাহিত্যচর্চা।
ফেসবুক মূলতঃ সাহিত্যচর্চার কোনো মাধ্যম ছিল না। সাহিত্যচর্চার প্রধান মাধ্যম ছিল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা বা সাময়িকী। অবশ্য দৈনিকের সাহিত্যপাতাগুলো সাহিত্যিকদের তৃপ্ত করতে পারেনি কোনোদিনই। তাই সাহিত্যচর্চার বিকল্প মাধ্যম ছিল সাহিত্যপত্রিকা বা ছোটকাগজ। একসময় লিটলম্যাগগুলোই নবীন তরুণদের সাহিত্যচর্চার প্রধান মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতো। তবে এসব লিটলম্যাগ প্রকাশের জন্য লেখক-প্রকাশকদের অর্থকষ্টে ভুগতে হতো প্রচুর। সাহিত্যের ছোটকাগজগুলোতে স্বাভাবিকভাবে কেউ বিজ্ঞাপন দিতে চান না। সাধারণতঃ কবি-সাহিত্যিকেরা দলবদ্ধভাবে নিজেরা চাঁদা তুলে এবং বিজ্ঞাপন বা অর্থ সংগ্রহ করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এসব লিটলম্যাগ প্রকাশ করতেন। এগুলোই ছিল সাহিত্যচর্চা বিশেষ করে কাব্যান্দোলনের প্রধান মাধ্যম। কারণ দৈনিকের সাহিত্যপাতায় নবীন ও তরুণদের লেখা প্রকাশ হতো না সহজে। আর পা-ুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে দেখা যেত লেখকদের ঠিকই, কিন্তু এসব পাণ্ডুলিপি প্রকাশের কোনো ঘটনা ঘটতো না। ফলে মান্না দে’র সেই বিখ্যাত গানের কলি ‘কবি কবি চেহারা/ কাঁধেতে ঝুলানো ব্যাগ/ মুছে যাবে অমলের নাম টা/ একটা কবিতা তার/ হলো না কোথাও ছাপা / পেল না সে প্রতিভার দাম টা’ গেয়েই কাব্যিক জীবনের অবসান ঘটাতেন অনেকে। আর এখন ফেসবুক এসব পুরনো ধ্যান-ধারণাকে একেবারেই উল্টে দিয়েছে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ফেসবুক যেমন সম্ভাবনার দ্বারকে উন্মেক্ত করে দিয়েছে তদ্রুপ সমস্যাও হচ্ছে অনেক। অনেকেই ‘রাতারাতি’ সাহিত্যিক বনে যাচ্ছেন ফেসবুকের কল্যাণে। জনসম্মুখে ‘কবি’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন মানহীন কবিতা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে। বিষয়টি ভেবে দেখার মতোই বটে।
এ শতাব্দী শুরুর পূর্বে সম্ভবত কেউ ভাবতেও পারেননি এত সহজ হয়ে যাবে সাহিত্যচর্চা। শতাব্দীর শুরুতেই ‘ইয়াহু’ গ্রুপের মাধ্যমে প্রথম অনলাইনে সাহিত্যচর্চার আলামত টের পাওয়া যায়। ফ্রি ইমেইল সেবাদানকারী এই ‘ইয়াহু’ ওয়েবসাইটে ‘কবিসভা’ নামে একটি গ্রুপ তৈরি করে বাংলাদেশে অনলাইনে সাহিত্যচর্চার কার্যক্রম শুরু হয় বলে জানা যায়। (সূত্র: প্রথম আলো- শিল্প ও সাহিত্য, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। অবশ্য ইয়াহুর উক্ত ‘কবিসভা’ গ্রুপটি ছিল সঞ্চালকনির্ভর। অর্থাৎ এক বা একাধিক পরিচালক’র অনুমোদন সাপেক্ষে লেখকগণ তাদের লেখালেখির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে সঞ্চালকবিহীন গ্রুপেরও সৃষ্টি অবশ্য হয়েছিল। তবে ইয়াহু সে সময় ব্যাপক ভূমিকা রাখলেও ওয়েবজগতে তারা জনপ্রিয়তার দিক থেকে ক্রমশঃ পিছিয়ে যেতে থাকে। উল্লেখ্য যে, এটা ওই সময়ের কথা যখন ওয়েবজগতের সঙ্গে অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিকেরই পরিচয় ঘটেনি। অনলাইনে সাহিত্যচর্চার কথা তো কল্পনাতীত। তখন ইন্টারনেটে বাংলা লেখারও কোনো সফটোয়্যার ছিল না। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ওয়েবজগতে ঘটে গেল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ‘অভ্র’ নামক উন্মুক্ত বাংলা সফটোয়্যার চালু হলো। জন্ম নিল নানা রকম ব্লগসাইট। অনলাইনে ওয়েবম্যাগ তৈরি ও তা পাঠ করার মতো একটি গোষ্ঠীও পাওয়া গেল। শুরু হলো নতুন এক আনন্দময় পথযাত্রার। নস্টালজিয়া, জাতীয়তাবাদ, অভিজ্ঞতা শেয়ার এবং সাহিত্যচর্চাই ছিল এসময় বাংলা ব্লগে লেখালেখির কেন্দ্রীয় বিষয়। খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের অনেকেই যখন এসব চত্বরে সমবেত হওয়া শুরু করে দিলেন তখনই দৃশ্যপটে হাজির হলো বাংলা কমিউনিটি ব্লগ। ব্লগিং যে কতো মজাদার সাহিত্যিকদের জন্য তা ব্লগার-সাহিত্যিকগণ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ে যারা ফেসবুকে সাহিত্যচর্চা করছেন এমনকি ফেসবুকেই যেসকল সাহিত্যিকের জন্ম তাদের অবগতির জন্য কেবল এটুকুই বলা যায় বাংলা কমিউনিটি ব্লগ’র মাইক্রো সংস্করণ বলা যেতে পারে এখনকার ফেসবুকসাহিত্যকর্মকে।
আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় অবশ্য ব্লগ নিয়ে নয়, বরং ফেসবুকের সাহিত্যচর্চা নিয়ে। অতএব আমরা আবরো ফিরে যাচ্ছি মূল প্রসঙ্গে। যখন ‘ব্লগ’ এবং ‘ব্লগার’ শব্দদ্বয় সাধারণ মানুষের কানে পৌঁছে যেতে শুরু করলো তখনই ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে এলো। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাংলাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র ‘ফেসবুক’ শীর্ষস্থানটি দখল করে নিল। জনপ্রিয় কমিউনিটি ব্লগের ব্লগাররা পর্যন্ত ব্লগিং বাদ দিয়ে ফেসবুকিংয়ে মনোযোগী হয়ে যেতে লাগলেন। এর কারণ এখানে ব্লগের চেয়ে পাঠক-সমালোচক অনেক বেশি। কাউকে ডেকে আনা লাগে না, বরং প্রায় প্রত্যেকেরই একটি ফেসবুক আইডি রয়েছে এবং তারা প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে নিয়মিত ফেসবুকে সক্রিয় থাকেন। সুতরাং সাহিত্যচর্চার বিকল্প সবচেয়ে বড়ো মাধ্যমে পরিণত হলো ফেসবুক।
এখন সৃষ্টিশীল সাহিত্য ফেসবুকেই উৎপাদিত হচ্ছে নিয়মিত। খুব কমসংখ্যক লেখক-পাঠক এখনও ফেসবুকের জগতে প্রবেশ করতে পারেননি। পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী কিংবা বই প্রকাশ প্রভৃতি কার্যক্রম সমান তালে চললেও এগুলোর প্রচারে প্রধান ভূমিকাই রাখছে এ ফেসবুক। উদাহরণ স্বরূপ একটি জাতীয় দৈনিকের পাতায় যদি কারো গল্প বা কবিতা ছাপা হয় তাহলে সেটি তিনি ফেসবুকে আপলোড করে খবর দিয়ে দিচ্ছেন খুব সহজেই। ফেসবুক তাই সাহিত্যের সংবাদমাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরই মধ্যে অনলাইন গণমাধ্যম বা অনলাইন পোর্টালগুলোও এগিয়ে এসেছে দ্রুত গতিতে। এখন তাই সংবাদ, সাহিত্য ও বিনোদনের জন্য কাগজের পত্রিকার দিকে মানুষের দৃষ্টিপাত না করলেও চলে। যদিও কাগজ প্রকাশকদের ব্যবসাও আগের তুলনায় কমে যাওয়ার কোনো সংবাদ বেরোয়নি এখন পর্যন্ত। তবে লেখকদের জন্য ছাপা বইয়ের ‘ই-বুক’ সংস্করণ করাটা সহজ হয়ে যাওয়ায় বইয়ের বাজারে প্রভাব পড়েছে, এতে কোনোই সন্দেহ নেই।
লেখক:সম্পাদক-সোনার সিলেট ডটকম,স্বত্বাধিকারী-পাপড়ি।
