১. বর্তমান সরকার জননিরাপত্তা, মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কথা সরকারপ্রধান বারবার উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র্যাবকে ঘিরে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তাতে দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠিত। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় তিনজন র্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে যে কথিত অভিযোগ উঠেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাদের এবং তাদের সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। ওই জেলার র্যাব সদস্য, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। ইতিমধ্যে হাইকোর্ট থেকে এফ আই আর-এ উলি্লখিত, বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর যে তিনজন সদস্য জড়িত ছিল তাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু আজ ১৫ মে বিকাল পর্যন্ত তারা গ্রেফতার হননি। এই গ্রেফতার হওয়া না হওয়া নিয়ে সিভিল সমাজ যথার্থভাবেই উচ্চকণ্ঠ, মিডিয়া সোচ্চার এবং সংবাদপত্রগুলোর একটা বড় অংশে তা স্থান পাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২. কথাটির ভেতরে যুক্তি আছে এবং এর তাৎপর্য বিশ্লেষণে র্যাবের জন্ম ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ জারি করে প্রকারান্তরে প্যারা-মিলিশিয়া গঠন করেন। ওই আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশে পাঁচটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল- ক) অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা খ) অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ বিস্ফোরক উদ্ধার গ) আর্ম ক্রিমিনাল চক্রকে ডিল করা ঘ) আইনশৃঙ্খলাকে বজায় রাখার জন্য পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করা ঙ) সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোনো ডিউটি পালন করা। ২০০৩ সালে সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও আনসার সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় র্যাব। ৯ জুলাই ২০০৩ সালে র্যাবকে অতিরিক্ত আরও দুটি দায়িত্ব দেওয়া হয় ক) অপরাধ এবং অপরাধীদের কার্যক্রম তদন্ত খ) সরকার কর্তৃক নির্দেশিত কতিপয় অপরাধ সম্পর্কে তদন্ত অনুষ্ঠান। শুধু তদন্তের ক্ষেত্রে র্যাব সরাসরি সরকারের নির্দেশে তদন্ত পালন করবে। কিন্তু সরকার র্যাবকে কী ধরনের অপরাধ অথবা কার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করবে তা স্পষ্ট করেনি। তখন থেকেই এই সুড়ঙ্গ পথে-রাজনীতির ‘ব্লেম-গেম’ ঢুকে পড়ে। এ তদন্ত কার্যে পেনাল কোড মহানগরী পুলিশ কমিশন রেগুলেশন এবং ক্রিমিনাল কোড অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।
৩. কিন্তু বাস্তবতা আইনের মতো এত সহজ
নয়। অল্প দিনেই র্যাব অনুধাবন করে দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব এবং সেক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রমের নাম হয় অপারেশন ক্লিনহার্ট। সহসা পরিলক্ষিত হয়, বাংলাদেশে আকস্মিকভাবে হার্টের রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। পরে হার্ট অ্যাটাক নিয়ে সমালোচনা হলে র্যাব কৌশল পরিবর্তন করে। প্রথমটির ছিল থিউরি অফ হার্ট অ্যাটাক এবং দ্বিতীয়টি হলো ক্রসফায়ার থিউরি। এর জন্য যেসব ঘটনা বলা হতো তা ছিল একই গল্পের পুনরাবৃত্তি, যা ছিল রহস্যজনক এবং জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।
৪. র্যাবের কার্যক্রম অপরাধী চক্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা র্যাবের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে সেভ প্লেস হিসেবে কারাগার বেছে নেয় এবং জামিন নিতে অসম্মতি জানায়। পিচ্চি হান্নান, পাগলা শহীদ, ইমন, মাগুরা রাজু, লেংড়া কালু এমনই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা নিহত হয়। জনগণ এ সময় র্যাবকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে। ২০০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর টেলিফোন জরিপে ৬৩ জনের মধ্যে ৩০ জন র্যাবের ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ডকে শক্তভাবে সমর্থন জানায়। কিন্তু আইনগত সাংবিধানিক ও নৈতিকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন পেতে পারে না। আমাদের দেশে আইন যেখানে অপরাধীদের নাগাল পায় না, যেখানে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা ধরা পড়লেও শাস্তি পায় না, কারাগার থেকে মুক্তি পায় রাজকীয়ভাবে, তখন সরকারের জরুরি কর্তব্য হচ্ছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান। সেক্ষেত্রে জনগণ র্যাব বাতিল বা তার বিরুদ্ধে কীভাবে দাঁড়ায়? ক্রিমিনালদের হত্যা অথবা তার প্রতি সমর্থন কীভাবে সমস্যার সমাধান করবে? বিষয়টি স্পর্শকাতর, ভয়ঙ্কর এবং অনেক সময় ডিজাস্টার। যেমন নারায়ণগঞ্জের ঘটনা।
৫. র্যাবের বিরুদ্ধে শক্ত অভিযোগ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। যেমন : ২০০৪-০৬ ও তত্ত্বাবধায়ক আমলে ইন্কাউন্টারে নিহত হয়েছে ৩৪০ জন। বর্তমান সরকারের আমলে ২০১০-১১ সালে তা কমে ১১৭ জনে নেমে এসেছে। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? ২০১০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেকনিক্যাল টিম র্যাবকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে ইন্টারনাল ইনকোয়ারি জোরদার হয়েছে। ফলে কোনো অভিযুক্ত র্যাব সদস্য পার পেতে পারেন না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০-১১ সালে ১৪২৯ জন র্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে ১৩২৭ জনকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি প্রদান করা হয়। অভ্যন্তরীণ বিচারে ৩৯২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ৯০৪ জনকে বরখাস্ত বা লঘু শাস্তি দেওয়া হয়। সে জন্য বাহিনী হিসেবে র্যাব ফ্রাঙ্কক্যানস্টাইন হয়নি। আইন-কানুন, কোড অফ কন্ডাক্ট, পেনাল কোড, মহানগরী পুলিশ অধ্যাদেশ এসব জড়িয়ে রেখেছে র্যাবের কার্যক্রম ও তদন্ত। ফলে বোতলের ছিপি খুলে দৈত্য বের হতে পারছে না।
৬. প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান দায়মুক্তি দিয়েছিলেন আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়নকে, বেগম জিয়া দায়মুক্তি দিয়েছিলেন র্যাবকে, ফলে র্যাবের মাঝে মানসিকভাবে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ছিল যে তাদের জবাবদিহিতা নেই, যা ইচ্ছা করতে পারে। এ ধারণার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় রাজনৈতিক সংশ্লেষ তখন স্বাভাবিকভাবে সে বাহিনীর সদস্যরা আস্কারা পেয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
৭. র্যাবকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আজ বেগম জিয়া যে অভিযোগ করেছেন, এ অভিযোগ তখনই তুলেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। ২০০৪ সালের জুন মাসে র্যাব কাজ শুরু করার পরের ছয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে ৭৯টি, যার মধ্যে ৬৩টি ছিল ক্রসফায়ার। সেসব ক্রসফায়ারে অন্যদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ কর্মীরা মারা পড়েছিল বলে আওয়ামী লীগ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আওয়ামী লীগের বিরোধিতার জবাব দিতে গিয়ে ২০০৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘বিরোধী দল র্যাবের বিরোধিতা করছে, কারণ র্যাব বিরোধী দলের সন্ত্রাসীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে’। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের ফলে র্যাবের অর্জিত জঙ্গি দমন সাফল্য, অস্ত্র-গোলাবারুদ, বিস্ফোরক উদ্ধার ও ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯১ জন অ
পরাধী ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ঢাকা পড়ে গেছে। জনজীবনে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে র্যাবের এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
৮. র্যাব সম্পর্কে সমালোচনা আছে, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিবিশেষের ঘটনাবলি বড় হয়ে উঠতে পারে না। কোনো বাহিনীর কেউ অপরাধ করলে সে ব্যক্তি অপরাধী হতে পারে, কিন্তু পুরো বাহিনীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা শুভবুদ্ধির কাজ হতে পারে না। ব্যক্তির অপরাধ বাহিনীর অপরাধ হতে পারে না। র্যাবের কাঠামোগত দিক, আইনিক, স্বনিয়ন্ত্রিত জবাবদিহিতা, প্রশিক্ষণ সবকিছুকেই ঘষেমেজে নববিন্যাসে সাজানো প্রয়োজন। অন্যপক্ষ র্যাব তুলে দেওয়ার পক্ষে জোরালো অভিমত তুলে ধরেছে। র্যাব তুলে দিলে বা বাতিল করলে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ দেশ হবে নিয়ন্ত্রণহীন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য, যেমনটি চলছে নাইজেরিয়ায়। যদি ধরে নেই যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে র্যাবকে ভেঙে দেওয়ার পক্ষপাতী তারা সবাই ভালো মানুষ। তাদের জন্য আইন দরকার নেই। বাহিনী দরকার নেই। কিন্তু তাদের জীবনের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্বস্তির জন্য প্রয়োজন যোগ্য ‘নগর কোতোয়াল’-এর অধীনে একটি সুশীল রক্ষী বাহিনী, যা খ্রিস্টপূর্ব কয়েকশ বছর আগে দার্শনিক প্লেটো বলে গেছেন।
লেখক : সাবেক প্রতিমন্ত্রী
